Dhaka 12:57 pm, Friday, 9 October 2026
সর্বশেষ
১০ টাকা কেজিতে ২৪ ঘণ্টায় পার্সেল পৌঁছে দিচ্ছে ডাক বিভাগ কপাল পুড়ল অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তীর জোনভিত্তিক রং ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটুকু কার্যকর নারায়ণগঞ্জে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ১২২ রাজধানীতে প্রতি রুটে চলবে নির্দিষ্ট এক কোম্পানির বাস পুলিশের গাড়িতে ইট পাটকেল নিক্ষেপে ওসিসহ আহত ৩শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক আটক ভুয়া তথ্য দিয়ে জন্ম নিবন্ধনের চেষ্টা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজনের কারাদণ্ড ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তির রপ্তানিকারক হতে হবে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী দুর্যোগ-সহনশীল আবাসনে ১০ কোটি ডলার ঋণ, উপকৃত হবে ৪০ হাজার পরিবার

জোনভিত্তিক রং ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটুকু কার্যকর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 05:47:43 am, Friday, 9 October 2026
  • / 3 Time View

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহরেই অটোরিকশার দাপট বেড়েছে। লাখ লাখ অটোরিকশা একরকম নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলাচল করছে বিভিন্ন সড়কে।

সম্প্রতি ঢাকায় অটোরিকশা চলাচল করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ার পর সড়ক আটকে আন্দোলন করেছেন এর চালক ও মালিকদের অনেকে। সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের জন্য বেশ জটিল সমস্যা হয়ে উঠেছে বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরাও। 

সরকারের পক্ষ থেকে অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই যানবাহন চলাচলে জোন ভিত্তিক রং ব্যবহার করাসহ নানা পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

এমনকি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে বিশেষ বৈঠকও করেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

তবে যে পরিকল্পনাই করা হোক না কেন তার সফলতা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের অনেক পরিকল্পনাই মাঠ পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। অতীতেও বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েছে, চলাচলও হয়েছে বেপরোয়া। আর এই বেপরোয়া চলাচলে সড়কে মৃত্যু, যানজট ও বিশৃঙ্খলা এখন নিত্যদিনের চিত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ খুব একটা এগোয়নি।

বরং ২০২৪ সালের মে মাসে অটোরিকশা ও ইজিবাইকচালকদের আন্দোলনের মুখে ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সে সময় বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে শুধু ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক, এমনকি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলা শহরে- ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট লক্ষ্য করা গেছে।

সম্প্রতি অটোরিকশা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতেই ঢাকায় আবারও সড়ক আটকে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদে গত সোমবার বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক ও মালিকদের একটি অংশ।

এর পরদিনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, এই যানবাহনের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এগুলো লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া হবে না।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার রাজধানীতে ইলেকট্রিক রিকশা ও ই-বাইক চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নীতিমালা তৈরির কথা জানালেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বা ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে একটি কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অটোরিকশা বা ই-রিকশা এবং ই-বাইকের জন্য সরকার একটি নীতিমালা তৈরি করছে। তখন তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘ই-রিকশা সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন হয়েছে। আমরা একটা বিধি এবং নীতিমালা তৈরি করছি।’

ডিএনসিসি প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে সরকারের পরিকল্পনাটি হলো জোন-ভিত্তিক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চারটি করে মোট আটটি জোনে অটোরিকশা ও ই-বাইকের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি জোনে এসব যানবাহনের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে।

শফিকুল ইসলাম খান বলছেন, ‘প্রতিটি জোনের অটোরিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একটি জোনে সবুজ রঙের রিকশা থাকবে, অন্য জোনে থাকবে কমলা রঙের। এভাবে চারটি জোনে ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করা হবে। এতে এক জোনের রিকশা অন্য জোনে গিয়ে চলাচল করতে পারবে না।’

এছাড়া নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে নতুন করে কোনো রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘যে কেউ ইচ্ছামতো অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে, অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে কেউ রাজধানীতে যানজট সৃষ্টি করে মানুষের চলাচলে বাধা তৈরি করতে না পারেন, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকায় অটোরিকশা চালকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। ডিএনসিসি প্রশাসক দাবি করেন, অটোরিকশা চালকদের আন্দোলন কেউ সমর্থন করেনি। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের চিহ্নিত অনেক নেতাকর্মী যুক্ত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তার প্রশ্ন, ‘এটা কি অটোরিকশার আন্দোলন? নাকি সরকারকে বিব্রত করার জন্য, সরকারকে চাপে ফেলার জন্য এই আন্দোলন?’

ঢাকায় বর্তমানে কত অটোরিকশা চলছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিআরটিএ বা সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখের কথা বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। 

জোন ভিত্তিক রং, নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং নীতিমালা – এই তিনটি পদক্ষেপ দিয়ে কি ঢাকার অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে পরিকল্পনা ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ। এর আগে সিটি কর্পোরেশন প্যাডেল রিকশার জন্যও জোন ভাগ করেছিল, শুরুতে কিছুটা তৎপরতা থাকলেও শেষমেশ তা মানা হয়নি।

যতক্ষণ পর্যন্ত বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলেই মত তাদের।

রাজধানীতে এই ধরনের যানবাহন বৈধ করার আলোচনা চললেও সেটি যৌক্তিক হবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের মতে, নিবন্ধন দেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণের উপায় নির্ধারণ করা জরুরি।

বুয়েটের শিক্ষক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলছেন, অতীতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন যে, এখন অবৈধ আছে তাদেরকে রেজিস্ট্রেশন দেই। কেউ কেউ বলেন জোন ভিত্তিক তারা চালাবে, এগুলো ভেরি লুকরেটিভ (খুবই আকর্ষণীয়) কথা। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই সক্ষমতা নাই।’

সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রসঙ্গও সামনে আনছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষ্য মতে, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির অদূরদর্শিতা, সময়মতো কাজ না করা, কী হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের পেশাদারী ধারণা না থাকা। কখনো কখনো অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই এই সিস্টেমের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে ফেলে।’

রাজধানীবাসীর কাছে নিয়মিত ভোগান্তির নাম যানজট। সব সরকারই ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনার কথা বললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্ভোগ বাড়ছে। এমনকি একের পর এক ফ্লাইওভার তৈরি কিংবা মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করেও সুফল মেলেনি খুব একটা। বরং মূল সড়কে ধীর গতির যানবাহন, যেখানে সেখানে যানবাহনের পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতা ঢাকার সড়ককে আরো অনিরাপদ করে তুলেছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় খুঁজে বের করতে এবার বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীসহ মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা বাসস বলছে, ঢাকায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং যানজট সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সভা।

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রাজধানীর গণপরিবহনের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা কিভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জোনভিত্তিক রং ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটুকু কার্যকর

Update Time : 05:47:43 am, Friday, 9 October 2026

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহরেই অটোরিকশার দাপট বেড়েছে। লাখ লাখ অটোরিকশা একরকম নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলাচল করছে বিভিন্ন সড়কে।

সম্প্রতি ঢাকায় অটোরিকশা চলাচল করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ার পর সড়ক আটকে আন্দোলন করেছেন এর চালক ও মালিকদের অনেকে। সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের জন্য বেশ জটিল সমস্যা হয়ে উঠেছে বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরাও। 

সরকারের পক্ষ থেকে অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই যানবাহন চলাচলে জোন ভিত্তিক রং ব্যবহার করাসহ নানা পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

এমনকি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে বিশেষ বৈঠকও করেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

তবে যে পরিকল্পনাই করা হোক না কেন তার সফলতা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের অনেক পরিকল্পনাই মাঠ পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। অতীতেও বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েছে, চলাচলও হয়েছে বেপরোয়া। আর এই বেপরোয়া চলাচলে সড়কে মৃত্যু, যানজট ও বিশৃঙ্খলা এখন নিত্যদিনের চিত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ খুব একটা এগোয়নি।

বরং ২০২৪ সালের মে মাসে অটোরিকশা ও ইজিবাইকচালকদের আন্দোলনের মুখে ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সে সময় বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে শুধু ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক, এমনকি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলা শহরে- ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট লক্ষ্য করা গেছে।

সম্প্রতি অটোরিকশা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতেই ঢাকায় আবারও সড়ক আটকে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদে গত সোমবার বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক ও মালিকদের একটি অংশ।

এর পরদিনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, এই যানবাহনের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এগুলো লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া হবে না।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার রাজধানীতে ইলেকট্রিক রিকশা ও ই-বাইক চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নীতিমালা তৈরির কথা জানালেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বা ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে একটি কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অটোরিকশা বা ই-রিকশা এবং ই-বাইকের জন্য সরকার একটি নীতিমালা তৈরি করছে। তখন তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘ই-রিকশা সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন হয়েছে। আমরা একটা বিধি এবং নীতিমালা তৈরি করছি।’

ডিএনসিসি প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে সরকারের পরিকল্পনাটি হলো জোন-ভিত্তিক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চারটি করে মোট আটটি জোনে অটোরিকশা ও ই-বাইকের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি জোনে এসব যানবাহনের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে।

শফিকুল ইসলাম খান বলছেন, ‘প্রতিটি জোনের অটোরিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একটি জোনে সবুজ রঙের রিকশা থাকবে, অন্য জোনে থাকবে কমলা রঙের। এভাবে চারটি জোনে ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করা হবে। এতে এক জোনের রিকশা অন্য জোনে গিয়ে চলাচল করতে পারবে না।’

এছাড়া নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে নতুন করে কোনো রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘যে কেউ ইচ্ছামতো অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে, অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে কেউ রাজধানীতে যানজট সৃষ্টি করে মানুষের চলাচলে বাধা তৈরি করতে না পারেন, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকায় অটোরিকশা চালকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। ডিএনসিসি প্রশাসক দাবি করেন, অটোরিকশা চালকদের আন্দোলন কেউ সমর্থন করেনি। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের চিহ্নিত অনেক নেতাকর্মী যুক্ত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তার প্রশ্ন, ‘এটা কি অটোরিকশার আন্দোলন? নাকি সরকারকে বিব্রত করার জন্য, সরকারকে চাপে ফেলার জন্য এই আন্দোলন?’

ঢাকায় বর্তমানে কত অটোরিকশা চলছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিআরটিএ বা সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখের কথা বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। 

জোন ভিত্তিক রং, নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং নীতিমালা – এই তিনটি পদক্ষেপ দিয়ে কি ঢাকার অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে পরিকল্পনা ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ। এর আগে সিটি কর্পোরেশন প্যাডেল রিকশার জন্যও জোন ভাগ করেছিল, শুরুতে কিছুটা তৎপরতা থাকলেও শেষমেশ তা মানা হয়নি।

যতক্ষণ পর্যন্ত বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলেই মত তাদের।

রাজধানীতে এই ধরনের যানবাহন বৈধ করার আলোচনা চললেও সেটি যৌক্তিক হবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের মতে, নিবন্ধন দেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণের উপায় নির্ধারণ করা জরুরি।

বুয়েটের শিক্ষক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলছেন, অতীতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন যে, এখন অবৈধ আছে তাদেরকে রেজিস্ট্রেশন দেই। কেউ কেউ বলেন জোন ভিত্তিক তারা চালাবে, এগুলো ভেরি লুকরেটিভ (খুবই আকর্ষণীয়) কথা। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই সক্ষমতা নাই।’

সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রসঙ্গও সামনে আনছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষ্য মতে, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির অদূরদর্শিতা, সময়মতো কাজ না করা, কী হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের পেশাদারী ধারণা না থাকা। কখনো কখনো অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই এই সিস্টেমের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে ফেলে।’

রাজধানীবাসীর কাছে নিয়মিত ভোগান্তির নাম যানজট। সব সরকারই ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনার কথা বললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্ভোগ বাড়ছে। এমনকি একের পর এক ফ্লাইওভার তৈরি কিংবা মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করেও সুফল মেলেনি খুব একটা। বরং মূল সড়কে ধীর গতির যানবাহন, যেখানে সেখানে যানবাহনের পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতা ঢাকার সড়ককে আরো অনিরাপদ করে তুলেছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় খুঁজে বের করতে এবার বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীসহ মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা বাসস বলছে, ঢাকায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং যানজট সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সভা।

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রাজধানীর গণপরিবহনের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা কিভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’