পদ্মায় তীব্র ভাঙন, বাঁধের ৫০ মিটার অংশ বিলীন
- Update Time : 11:41:54 am, Saturday, 3 October 2026
- / 9 Time View
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীতে তীব্র ভাঙনে উপজেলার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশ বিলীন হয়ে গেছে। শনিবার তোলা। ছবি : সংগৃহীত
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে এরই মধ্যে উপজেলার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় নদীর তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশ বিলীন হয়ে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধের ওই অংশ ধসে পড়ার পর শুক্রবার ভাঙনের আশঙ্কায় বাজারের অন্তত ২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার (৩ অক্টোবর)ও দোকানপাট সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় পুরো মাছবাজার হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় বাঁধের একটি অংশে ফাটল দেখা দেয়।
এতে বাজারের অন্তত ৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মুখে পড়ে। পরদিন বুধবার বাঁধসংলগ্ন পাঁচটি দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতি নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে।
এর পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দোকানপাট ও মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে শুরু করেন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জাজিরা উপজেলার বিলাসপুরের শফিকাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছঘাট পর্যন্ত পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় নেওয়া প্রকল্পটিতে ব্যয় হয় এক হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
২০২৩ সালে বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় এসে বাঁধের শেষ অংশ পড়েছে।
সেখানকার একটি বড় অংশ নদীতে বিলীন হওয়ায় এখন মাছ বাজার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় ৭০ বছর আগে সুরেশ্বর এলাকায় পদ্মার তীরে মাছ কেনাবেচা শুরু করেন স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গড়ে ওঠে বড় মাছবাজার। বর্তমানে বাজারটিতে প্রায় ৪০টি মাছের আড়ৎ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বরফ বিক্রির পাঁচটি দোকান এবং মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেদের প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিদিন ভোরে পদ্মা থেকে মাছ নিয়ে ঘাটে আসেন জেলেরা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক শ জেলে, ক্রেতা, বিক্রেতা ও আড়ৎশ্রমিকের ব্যস্ততায় মুখর থাকে বাজারটি। ২০১৮ সালে পদ্মার ভাঙনে সুরেশ্বর মাছবাজার হুমকির মুখে পড়লে তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
বাঁধ নির্মাণের পর কয়েক বছর ভাঙন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু এবার বাঁধের শেষ প্রান্তে ধস নামায় তাদের সেই স্বস্তি আবারও উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
সুরেশ্বর মাছবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও মাছ ব্যবসায়ী ইমরান শেখ জানান, বাঁধ নির্মাণের পর তারা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো নদীভাঙনের ভয় ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন। কয়েক বছর ভাঙন না থাকায় সেই বিশ্বাসও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু রাতারাতি নদী তার দোকান কেড়ে নিয়েছে। এখন নদীর পাড়ে বসে মাছ বিক্রি করতে হচ্ছে তাকে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো বাজার হারানোর আশঙ্কা করছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মান্নান ছৈয়াল (৬৫) বলেন, পদ্মার ভাঙনে বারবার ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে তাকে নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। ২০১৭ সালে সব হারানোর পর মাছ বাজারের কাছে আবার দোকান দিয়েছিলেন। এবার সেটিও সরিয়ে নিতে হয়েছে।
এই বয়সে নতুন করে কোথায় ব্যবসা শুরু করবেন এবং কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মান্নান। তার মতে, বাধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করা না হলে তার মতো আরো অনেক ব্যবসায়ী জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
এদিকে পাউবো কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই সুরেশ্বর এলাকায় পদ্মার বিভিন্ন অংশে গভীরতা বাড়তে দেখা যায়। নদীর তলদেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণে পরিচালিত সমীক্ষায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর
বাঁধসংলগ্ন নদীর গভীরতা ১০ থেকে ২২ মিটার পাওয়া যায়। অথচ ওই এলাকায় স্বাভাবিক গভীরতা তিন থেকে সাত মিটার থাকার কথা।
বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার পর বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পুনরায় সমীক্ষা চালানো হলে নদীর গভীরতা ১৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পাওয়া যায়।
প্রকৌশলীদের ধারণা, নদীর তলদেশের মাটি সরে গিয়ে গভীরতা বেড়ে গেছে। এতে ওই এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিলটন হোসেন বলেন, নদীর পানির স্তর কমার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি স্থানে তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে। এতে নদীর গভীরতা বেড়ে তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশে প্রথমে ফাটল দেখা দেয়। পরে ওই অংশের কিছুটা নদীতে ধসে পড়ে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরো বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। বর্ষা মৌসুম শেষে শুকনো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি স্থায়ীভাবে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
















