Dhaka 9:20 pm, Monday, 28 September 2026
সর্বশেষ
বায়ুদূষণ ও তামাক নিয়ন্ত্রণে জোর দিলেন বিশেষজ্ঞরা বিমানবাহিনীর ৫৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা বাড়াতে অধ্যাদেশ সংশোধন জামায়াতের ১০০ কোটি টাকা পরিশোধে ভিক্ষা করতে হচ্ছে এনসিপিকে বাণিজ্য ও জলবায়ু কার্যক্রমে সরকারকে সহযোগিতার অঙ্গীকার ইইউ রাষ্ট্রদূতদের স্ত্রীসহ বেস্টওয়ে গ্রুপের এমডি মিজানুর রহমানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বটগাছের নিচে পরিত্যক্ত বস্তায় মিলল ১৫ রাউন্ড গুলি, দেশীয় অস্ত্র থানার সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে নাশকতার চেষ্টা, গ্রেপ্তার ৪ মসজিদের পাশের কক্ষে ইমামের লাশ, একই কক্ষে আহত বন্ধু চাঁদাবাজির সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয় : নজরুল ইসলাম খান

পান রপ্তানিতে হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 07:41:47 am, Monday, 28 September 2026
  • / 5 Time View

দুই যুগের বিরোধের অবসান ক্রমেই বাড়ছে পান রপ্তানি। কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতসহ বিশ্বের ৩৩ দেশে যাচ্ছে পান।

নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি পান ও পানজাত পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। 

এক প্রতিবেদনে আজকের পত্রিকা জানায়, পান বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পানের পরিচয় নিয়ে বিরোধ ছিল। এক পক্ষের অভিযোগ, সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পান রপ্তানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও হুন্ডিতে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্য পক্ষের দাবি,পানকে আলাদা পণ্য হিসেবে দেখিয়ে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এ বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে এক ডজনের বেশি মামলা হয়েছে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের শ্রেণিবিন্যাসে পান উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের (হর্টিকালচার) অন্তর্ভুক্ত। ব্যবহারিকভাবে এটি মসলাজাতীয় ফসল বা চিবানোর উপযোগী অর্থকরী পাতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আশির দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পান রপ্তানি শুরু হয়।

তখন ফল ও সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠনের আওতায় সবজির উপজাত পণ্য হিসেবে পান রপ্তানি করা হতো। ২০০৩ সাল থেকে ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’র মাধ্যমে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে পান রপ্তানি শুরু হয়। 

পান রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে বাংলাদেশ থেকে মাত্র চার কোটি টাকার পান রপ্তানি হয়েছিল। পরের বছর সমিতির কার্যক্রম শুরু হলে রপ্তানি আয় বেড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর পানকে সবজি হিসেবে নয়, ‘পান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি করা হয়।

একই বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পান রপ্তানির ক্ষেত্রে সমিতির সদস্যপদ ও প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে। 

পান রপ্তানিকারক সমিতির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পানের দাম ৫ থেকে সাড়ে ৬ ডলার হলেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কাস্টমসে ১ দশমিক ২০ ডলারের সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পান রপ্তানি করতেন। এতে রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বপন সরকার। তিনি বলেন, পান রপ্তানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র কাস্টমসের কাজে লাগে না। এটি প্রতি বাক্সে ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা ‘চাঁদা আদায়ের বাহানা’ বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাই তপন সরকার কলকাতায় পান রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হলেও বাংলাদেশের পান রপ্তানির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন স্বপন।

২০০৩ সালে ‘বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ পানকে নিজেদের আওতাভুক্ত দাবি করে মামলা করে। এরপর প্রায় ২৪ বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আইনি লড়াই চলে।

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ ও ‘সবজি সমিতি’ দুটি পৃথক সত্তা। সবজি সমিতি পান সমিতির অভ্যন্তরীণ ও প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

পান রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘গত দুই যুগ মামলা-মোকদ্দমায় হয়রানি করায় আমরা রপ্তানিতে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারিনি। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর আবার কাজ শুরু করেছি।’

অন্যদিকে ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনসুর বলেন, ‘দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তাদের পক্ষে রায় হয়েছে। আমরা চাই পান রপ্তানিকারকেরা অবাধে ব্যবসা করার সুযোগ পাক।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চার হাজার ৩৮৮ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন পান রপ্তানি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল তিন হাজার ৬৫৯ দশমিক ৭১২ মেট্রিক টন। গত তিন বছরে প্রতি বছর রপ্তানি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি পান যাচ্ছে সৌদি আরবে। কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতেও রপ্তানি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, পান উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া উন্নত হওয়ায় রপ্তানি বাড়ছে। পানের গুণগত মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে ২০০ কোটি টাকা এবং পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার বাংলাদেশি পানের বাজার রয়েছে। মালয়েশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও লেবাননসহ ৩৩টি দেশেও চাহিদা রয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পান রপ্তানিতে হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা

Update Time : 07:41:47 am, Monday, 28 September 2026

দুই যুগের বিরোধের অবসান ক্রমেই বাড়ছে পান রপ্তানি। কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতসহ বিশ্বের ৩৩ দেশে যাচ্ছে পান।

নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি পান ও পানজাত পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। 

এক প্রতিবেদনে আজকের পত্রিকা জানায়, পান বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পানের পরিচয় নিয়ে বিরোধ ছিল। এক পক্ষের অভিযোগ, সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পান রপ্তানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও হুন্ডিতে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্য পক্ষের দাবি,পানকে আলাদা পণ্য হিসেবে দেখিয়ে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এ বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে এক ডজনের বেশি মামলা হয়েছে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের শ্রেণিবিন্যাসে পান উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের (হর্টিকালচার) অন্তর্ভুক্ত। ব্যবহারিকভাবে এটি মসলাজাতীয় ফসল বা চিবানোর উপযোগী অর্থকরী পাতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আশির দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পান রপ্তানি শুরু হয়।

তখন ফল ও সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠনের আওতায় সবজির উপজাত পণ্য হিসেবে পান রপ্তানি করা হতো। ২০০৩ সাল থেকে ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’র মাধ্যমে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে পান রপ্তানি শুরু হয়। 

পান রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে বাংলাদেশ থেকে মাত্র চার কোটি টাকার পান রপ্তানি হয়েছিল। পরের বছর সমিতির কার্যক্রম শুরু হলে রপ্তানি আয় বেড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর পানকে সবজি হিসেবে নয়, ‘পান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি করা হয়।

একই বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পান রপ্তানির ক্ষেত্রে সমিতির সদস্যপদ ও প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে। 

পান রপ্তানিকারক সমিতির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পানের দাম ৫ থেকে সাড়ে ৬ ডলার হলেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কাস্টমসে ১ দশমিক ২০ ডলারের সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পান রপ্তানি করতেন। এতে রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বপন সরকার। তিনি বলেন, পান রপ্তানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র কাস্টমসের কাজে লাগে না। এটি প্রতি বাক্সে ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা ‘চাঁদা আদায়ের বাহানা’ বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাই তপন সরকার কলকাতায় পান রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হলেও বাংলাদেশের পান রপ্তানির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন স্বপন।

২০০৩ সালে ‘বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ পানকে নিজেদের আওতাভুক্ত দাবি করে মামলা করে। এরপর প্রায় ২৪ বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আইনি লড়াই চলে।

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ ও ‘সবজি সমিতি’ দুটি পৃথক সত্তা। সবজি সমিতি পান সমিতির অভ্যন্তরীণ ও প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

পান রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘গত দুই যুগ মামলা-মোকদ্দমায় হয়রানি করায় আমরা রপ্তানিতে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারিনি। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর আবার কাজ শুরু করেছি।’

অন্যদিকে ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনসুর বলেন, ‘দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তাদের পক্ষে রায় হয়েছে। আমরা চাই পান রপ্তানিকারকেরা অবাধে ব্যবসা করার সুযোগ পাক।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চার হাজার ৩৮৮ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন পান রপ্তানি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল তিন হাজার ৬৫৯ দশমিক ৭১২ মেট্রিক টন। গত তিন বছরে প্রতি বছর রপ্তানি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি পান যাচ্ছে সৌদি আরবে। কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতেও রপ্তানি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, পান উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া উন্নত হওয়ায় রপ্তানি বাড়ছে। পানের গুণগত মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে ২০০ কোটি টাকা এবং পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার বাংলাদেশি পানের বাজার রয়েছে। মালয়েশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও লেবাননসহ ৩৩টি দেশেও চাহিদা রয়েছে।