Dhaka 3:16 am, Friday, 30 October 2026
সর্বশেষ

ভুয়া কাজিদের কব্জায় বিয়ে নিবন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 02:52:14 pm, Thursday, 29 October 2026
  • / 5 Time View

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাড়ছে অনিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি)-এর সংখ্যা। সরকারি বিধিমালার তোয়াক্কা না করে শতাধিক ভুয়া কাজি উপজেলায় বিয়ে নিবন্ধনের নামে প্রতারণা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১২ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় মোট ১৩ জন নিবন্ধিত কাজি থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১০ জন। উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নসহ তিন ইউনিয়নে প্রায় ২০ বছর ধরে নিবন্ধিত কাজি নেই। 

এদিকে, নিবন্ধিত কাজি না থাকার সুযোগে উপজেলায় বাড়ছে ভুয়া কাজি। ফলে বিয়ের আসরে যে নিবন্ধন হচ্ছে, তা আদৌ সরকারি খাতায় উঠছে কিনা, তা অজানা অনেক বর-কনে বা তাদের অভিভাবকদের।

১০ কাজির আটজনই শিক্ষক 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নান্দাইলের ১০ জন নিবন্ধিত কাজির মধ্যে মাত্র দুজন ছাড়া বাকি আটজনই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তাদের মধ্যে মাদরাসাপ্রধানও (সুপার বা অধ্যক্ষ) রয়েছেন। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে তারা  নিয়মিত বেতন-ভাতা বা আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন, একইসঙ্গে কাজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

যা রয়েছে আইনে 

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা  ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে  লাভজনক পদে কর্মরত থাকলে তিনি কাজি হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য নন।

এমনকি কেউ কাজি পদে থাকাকালে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে তার লাইসেন্স বাতিলযোগ্য।  

টাকা দিলেই মেলে ভলিউম বই

উপজেলার বৈধ কাজিদের একেকজনের অধীনে অন্তত ‘সাব-কাজি’ পরিচয়ে অন্তত ১০ জন করে মাঠে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন রয়েছে এসব ‘সাব-কাজি’র শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইনি কিংবা ধর্মীয় জ্ঞান। 

‘সাব-কাজি’ পরিচয় দেওয়া আবুল খায়ের নামের  একজনের ভাষ্য, ‘কোনো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে একজন মূল কাজির কাছ থেকে একটা বই (ভলিউম) নিয়েছি। সেই বইয়ের জন্য প্রতি বিয়েতে মূল কাজিকে ৮০০ টাকা করে দিতে হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ‘সিটিজেন চার্ট  অনুযায়ী বিয়ের খরচের তোয়াক্কা না করে বর-কনে বা তাদের পরিবারের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ফি আদায় করছেন এই ‘সাব-কাজিরা’। তাছাড়া আদায় করা ফির সিংহভাগই যাচ্ছে বৈধ  কাজিদের পকেটে। সেখান থেকে কোনো টাকা সরকারের খাতায় আদৌ টাকা জমা হচ্ছে কিনা, তা দেখার কেউ নেই।

এক ইউনিয়নেই ১২ ভুয়া কাজি 

নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কাজি আনোয়ার কাদিরের দাবি, তার ইউনিয়নেই অন্তত ১২ জন ভুয়া কাজি সক্রিয়। 

আতিকুল্লাহ, শাহ আলম ও হেদায়েত উল্লাহ নামে তিনজনের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার কাদির বলেন, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অজ্ঞাত স্থান থেকে জাল বই বা ভলিউম এনে দেদারসে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করছে ভুয়া কাজিরা। এতে বৈধ কাজিরা যেমন বেকায়দায় পড়ছেন, তেমনি হুমকিতে পড়ছে বর-কনের ভবিষ্যৎ। 

নান্দাইল পৌরসভার নিকাহ নিবন্ধক (কাজি) গোলাপ মওলা ‘সাব-কাজি’ (প্রকৃতপক্ষে সহকারী) রাখার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘একদিনে একাধিক বিয়ে হলে একার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয় না। তাই লোক রাখতে হয়। তবে এখন ভুয়া বই ছাপিয়ে ভুয়া কাজি সেজে অসংখ্য প্রতারক মাঠে নামায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।’

আইনি অধিকার অরক্ষিত, ফাঁদে দুই পক্ষ 

বিয়ের আসরে হুট করে অজ্ঞাত বই নিয়ে হাজির হওয়া ‘সাব-কাজি’ ও ভুয়া কাজিদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া অধিকাংশ সময়ই সরকারি মূল ভলিউমে বা ডাটাবেজে ওঠে না। ফলে বিয়ের পর দম্পতির মধ্যে কোনো ঝামেলা দেখা দিলে কাবিননামার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেটি জাল। 

কাবিননামা বৈধ না থাকায় একদিকে নারীরা যেমন দেনমোহর ও খোরপোশের আইনি দাবি তুলতে পারছেন না, অন্যদিকে পুরুষরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। 

আইনে ‘সাব-কাজি’ বলে কিছু নেই 

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, সরকার নির্দিষ্ট এলাকার জন্য কেবল একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজি নিয়োগ করে। এই লাইসেন্স অন্য কাউকে ভাড়া বা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈধ কাজি ছাড়া অন্য কারো বিয়ে নিবন্ধন করার বিন্দুমাত্র আইনি ক্ষমতা নেই। ‘সাব-কাজি’ বলতে আইনের চোখে কোনো পদের অস্তিত্বই নেই। আর  ফিও সরকার নির্ধারিত।’ তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া বা ‘সাব-কাজিদের’ বিরুদ্ধে অচিরেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভুয়া কাজিদের কব্জায় বিয়ে নিবন্ধন

Update Time : 02:52:14 pm, Thursday, 29 October 2026

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাড়ছে অনিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি)-এর সংখ্যা। সরকারি বিধিমালার তোয়াক্কা না করে শতাধিক ভুয়া কাজি উপজেলায় বিয়ে নিবন্ধনের নামে প্রতারণা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১২ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় মোট ১৩ জন নিবন্ধিত কাজি থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১০ জন। উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নসহ তিন ইউনিয়নে প্রায় ২০ বছর ধরে নিবন্ধিত কাজি নেই। 

এদিকে, নিবন্ধিত কাজি না থাকার সুযোগে উপজেলায় বাড়ছে ভুয়া কাজি। ফলে বিয়ের আসরে যে নিবন্ধন হচ্ছে, তা আদৌ সরকারি খাতায় উঠছে কিনা, তা অজানা অনেক বর-কনে বা তাদের অভিভাবকদের।

১০ কাজির আটজনই শিক্ষক 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নান্দাইলের ১০ জন নিবন্ধিত কাজির মধ্যে মাত্র দুজন ছাড়া বাকি আটজনই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তাদের মধ্যে মাদরাসাপ্রধানও (সুপার বা অধ্যক্ষ) রয়েছেন। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে তারা  নিয়মিত বেতন-ভাতা বা আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন, একইসঙ্গে কাজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

যা রয়েছে আইনে 

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা  ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে  লাভজনক পদে কর্মরত থাকলে তিনি কাজি হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য নন।

এমনকি কেউ কাজি পদে থাকাকালে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে তার লাইসেন্স বাতিলযোগ্য।  

টাকা দিলেই মেলে ভলিউম বই

উপজেলার বৈধ কাজিদের একেকজনের অধীনে অন্তত ‘সাব-কাজি’ পরিচয়ে অন্তত ১০ জন করে মাঠে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন রয়েছে এসব ‘সাব-কাজি’র শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইনি কিংবা ধর্মীয় জ্ঞান। 

‘সাব-কাজি’ পরিচয় দেওয়া আবুল খায়ের নামের  একজনের ভাষ্য, ‘কোনো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে একজন মূল কাজির কাছ থেকে একটা বই (ভলিউম) নিয়েছি। সেই বইয়ের জন্য প্রতি বিয়েতে মূল কাজিকে ৮০০ টাকা করে দিতে হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ‘সিটিজেন চার্ট  অনুযায়ী বিয়ের খরচের তোয়াক্কা না করে বর-কনে বা তাদের পরিবারের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ফি আদায় করছেন এই ‘সাব-কাজিরা’। তাছাড়া আদায় করা ফির সিংহভাগই যাচ্ছে বৈধ  কাজিদের পকেটে। সেখান থেকে কোনো টাকা সরকারের খাতায় আদৌ টাকা জমা হচ্ছে কিনা, তা দেখার কেউ নেই।

এক ইউনিয়নেই ১২ ভুয়া কাজি 

নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কাজি আনোয়ার কাদিরের দাবি, তার ইউনিয়নেই অন্তত ১২ জন ভুয়া কাজি সক্রিয়। 

আতিকুল্লাহ, শাহ আলম ও হেদায়েত উল্লাহ নামে তিনজনের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার কাদির বলেন, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অজ্ঞাত স্থান থেকে জাল বই বা ভলিউম এনে দেদারসে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করছে ভুয়া কাজিরা। এতে বৈধ কাজিরা যেমন বেকায়দায় পড়ছেন, তেমনি হুমকিতে পড়ছে বর-কনের ভবিষ্যৎ। 

নান্দাইল পৌরসভার নিকাহ নিবন্ধক (কাজি) গোলাপ মওলা ‘সাব-কাজি’ (প্রকৃতপক্ষে সহকারী) রাখার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘একদিনে একাধিক বিয়ে হলে একার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয় না। তাই লোক রাখতে হয়। তবে এখন ভুয়া বই ছাপিয়ে ভুয়া কাজি সেজে অসংখ্য প্রতারক মাঠে নামায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।’

আইনি অধিকার অরক্ষিত, ফাঁদে দুই পক্ষ 

বিয়ের আসরে হুট করে অজ্ঞাত বই নিয়ে হাজির হওয়া ‘সাব-কাজি’ ও ভুয়া কাজিদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া অধিকাংশ সময়ই সরকারি মূল ভলিউমে বা ডাটাবেজে ওঠে না। ফলে বিয়ের পর দম্পতির মধ্যে কোনো ঝামেলা দেখা দিলে কাবিননামার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেটি জাল। 

কাবিননামা বৈধ না থাকায় একদিকে নারীরা যেমন দেনমোহর ও খোরপোশের আইনি দাবি তুলতে পারছেন না, অন্যদিকে পুরুষরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। 

আইনে ‘সাব-কাজি’ বলে কিছু নেই 

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, সরকার নির্দিষ্ট এলাকার জন্য কেবল একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজি নিয়োগ করে। এই লাইসেন্স অন্য কাউকে ভাড়া বা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈধ কাজি ছাড়া অন্য কারো বিয়ে নিবন্ধন করার বিন্দুমাত্র আইনি ক্ষমতা নেই। ‘সাব-কাজি’ বলতে আইনের চোখে কোনো পদের অস্তিত্বই নেই। আর  ফিও সরকার নির্ধারিত।’ তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া বা ‘সাব-কাজিদের’ বিরুদ্ধে অচিরেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।