Dhaka 5:50 pm, Wednesday, 28 October 2026
সর্বশেষ
ডেঙ্গুতে আরো ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯৮২ সত্যিই কি ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ গলছে দেশি মাছ নিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার : কৃষিমন্ত্রী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু : প্রতিমন্ত্রী নুর শ্বাশুড়িকে হত্যার দায়ে জামাইয়ের যাবজ্জীবন ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, আশা প্রধানমন্ত্রীর ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে এখন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার অভিযোগে আট বাংলাদেশি আটক হরিনারায়ণপুরে দুই ভাইয়ের নির্বাচনী লড়াই নিয়ে তুমুল আলোচনা জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশের

সত্যিই কি ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ গলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 10:35:44 am, Wednesday, 28 October 2026
  • / 8 Time View

গত এক বছর ধরে ভারত ও চীনের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি যতটা মনে হচ্ছিল, বাস্তবে তা ততটা স্থিতিশীল নয়।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই ভারত ও চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলের বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বারবার বিরোধ দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের পর সম্পর্কের যে উন্নতি শুরু হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ এই উদ্বেগের সূত্রপাত হয় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে।

তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে চীনা সেনারা হিমালয় সীমান্তের বিতর্কিত এলাকাগুলোতে আবারও বিপুলসংখ্যায় অবস্থান নেয়। ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে তারা তাঁবু গেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের এই মন্তব্য দিল্লিতে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কারণ, দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্য সচরাচর শোনা যায় না।

সীমান্তের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো সাধারণত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করে। 

রাজস্থান রাজ্যে সম্প্রতি কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে কাপুর বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি স্থানে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তিনি জানান, এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল জুলাই মাসে। তবে শুরুতে দুই পক্ষের সেনারাই ওই স্থানগুলো থেকে সরে গিয়েছিলেন। তিনি আরো জানান, কয়েক দিন পর চীনা সেনারা বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে এবং ভারতের দাবি অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাবু খাটায়।

ভারত ও চীনের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্তটি প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা দুই দেশের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে আলাদা করলেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। চীন অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে। তবে ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে রাজ্যটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এই সীমান্ত বিরোধ ভারতের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ১৯৬২ সালে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়, যাতে ভারত পরাজিত হয়। ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সীমান্তের বড় অংশ এখনো চিহ্নিত হয়নি। দুর্গম পাহাড়, তুষারঢাকা চূড়া, হ্রদ ও নদীর পরিবর্তনশীল গতিপথের কারণে সুনির্দিষ্ট সীমান্ত নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কারণে সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান থেকে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হয়, যা কখনো কখনো সংঘর্ষ ও কূটনৈতিক বিরোধের জন্ম দেয়। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।

ভারতের বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, সরকার চীনের কাছে ভূখণ্ড হারিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বারবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। এতে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণেও প্রভাব পড়ে। কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৪ সালে সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয় দুই দেশ।

এরপর দুই দেশ সরাসরি ফ্লাইট চালু করা এবং সংঘর্ষের পর আরোপিত ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ভারত সফর করেন। সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল তার প্রথম ভারত সফর। এসব পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সীমান্তে নতুন করে অচলাবস্থার খবর প্রকাশের পর সম্পর্কের উন্নতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান কাপুরের মন্তব্যের পর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস আবারও মোদির বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ তুলেছে।

কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই গুরুতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পুরো প্রশাসন নীরব রয়েছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে বলেন, ‘চীনা সেনারা যখন তাদের নির্ধারিত টহল পদ্ধতি থেকে সরে আসে, তখন সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি সময়ে সময়ে বিঘ্নিত হয়।’ তিনি আরো বলেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে দুই দেশ সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, বেইজিং ভারতের সঙ্গে করা সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে ও কঠোরভাবে মেনে চলছে। তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন সীমান্ত এলাকায় স্বাভাবিক টহল ও ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাপুরের মন্তব্য ভারত-চীন বিতর্কিত সীমান্তে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক তৎপরতার একটি বিরল চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, এই ঘটনা সীমান্ত পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীনের সঙ্গে কয়েক দফা সীমান্ত আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চীনের এ ধরনের তৎপরতা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে না। তবে এর মাধ্যমে বাস্তবে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব।’

ভারতের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, চীন লাদাখ ও অরুণাচল প্রদেশে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্নেল ঝো বো বলেন, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ থেকে দুই দেশেরই শিক্ষা নেওয়া উচিত।

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে উভয় পক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অরুণাচল প্রদেশের সাম্প্রতিক সীমান্ত অচলাবস্থা নিয়ে চীনা গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি বলেও জানান তিনি।

সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যন্ত্রপাতি, বিরল মৃত্তিকার চুম্বক, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও ওষুধের মতো পণ্যের জন্য ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল।

গত সপ্তাহে চীন মেট্রোরেল ও মহাসড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত টানেল খননের যন্ত্র রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। বেইজিংয়ের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শুধু ভারতের জন্য না হলেও দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নে এর প্রভাব পড়তে পারে।

নিউইয়র্কের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারির মতে, ভারতের উত্থান এবং উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে দেশটির সক্ষমতা অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করাই চীনের নীতির অন্যতম লক্ষ্য। এর আগে চীন বিরল মৃত্তিকার চুম্বক রপ্তানি সীমিত করায় ভারতের বিভিন্ন শিল্পে সাময়িক সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছিল।

বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন ও চিকিৎসার স্ক্যানার তৈরিতে এসব চুম্বক ব্যবহৃত হয়। এখন ভারত নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে এ জন্য সময় ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনেও বিরোধের প্রভাব পড়ছে। অরুণাচল টাইমসের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টংগাম রিনা জানান, চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ ও জমি দখলের কারণে কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা চারণভূমিতে যেতে পারছেন না। শিকার ও ইয়াক পালনের জন্য ব্যবহৃত এসব এলাকায় তারা কবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়ায় ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কতটা সমর্থন করবে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। চীন ভারতের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘায়িত করে কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে। 

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সত্যিই কি ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ গলছে

Update Time : 10:35:44 am, Wednesday, 28 October 2026

গত এক বছর ধরে ভারত ও চীনের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি যতটা মনে হচ্ছিল, বাস্তবে তা ততটা স্থিতিশীল নয়।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই ভারত ও চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলের বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বারবার বিরোধ দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের পর সম্পর্কের যে উন্নতি শুরু হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ এই উদ্বেগের সূত্রপাত হয় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে।

তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে চীনা সেনারা হিমালয় সীমান্তের বিতর্কিত এলাকাগুলোতে আবারও বিপুলসংখ্যায় অবস্থান নেয়। ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে তারা তাঁবু গেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের এই মন্তব্য দিল্লিতে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কারণ, দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্য সচরাচর শোনা যায় না।

সীমান্তের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো সাধারণত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করে। 

রাজস্থান রাজ্যে সম্প্রতি কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে কাপুর বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি স্থানে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তিনি জানান, এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল জুলাই মাসে। তবে শুরুতে দুই পক্ষের সেনারাই ওই স্থানগুলো থেকে সরে গিয়েছিলেন। তিনি আরো জানান, কয়েক দিন পর চীনা সেনারা বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে এবং ভারতের দাবি অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাবু খাটায়।

ভারত ও চীনের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্তটি প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা দুই দেশের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে আলাদা করলেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। চীন অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে। তবে ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে রাজ্যটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এই সীমান্ত বিরোধ ভারতের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ১৯৬২ সালে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়, যাতে ভারত পরাজিত হয়। ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সীমান্তের বড় অংশ এখনো চিহ্নিত হয়নি। দুর্গম পাহাড়, তুষারঢাকা চূড়া, হ্রদ ও নদীর পরিবর্তনশীল গতিপথের কারণে সুনির্দিষ্ট সীমান্ত নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কারণে সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান থেকে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হয়, যা কখনো কখনো সংঘর্ষ ও কূটনৈতিক বিরোধের জন্ম দেয়। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন। ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।

ভারতের বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, সরকার চীনের কাছে ভূখণ্ড হারিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বারবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। এতে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণেও প্রভাব পড়ে। কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৪ সালে সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয় দুই দেশ।

এরপর দুই দেশ সরাসরি ফ্লাইট চালু করা এবং সংঘর্ষের পর আরোপিত ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ভারত সফর করেন। সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল তার প্রথম ভারত সফর। এসব পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সীমান্তে নতুন করে অচলাবস্থার খবর প্রকাশের পর সম্পর্কের উন্নতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান কাপুরের মন্তব্যের পর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস আবারও মোদির বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ তুলেছে।

কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই গুরুতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পুরো প্রশাসন নীরব রয়েছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে বলেন, ‘চীনা সেনারা যখন তাদের নির্ধারিত টহল পদ্ধতি থেকে সরে আসে, তখন সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি সময়ে সময়ে বিঘ্নিত হয়।’ তিনি আরো বলেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে দুই দেশ সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, বেইজিং ভারতের সঙ্গে করা সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে ও কঠোরভাবে মেনে চলছে। তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন সীমান্ত এলাকায় স্বাভাবিক টহল ও ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাপুরের মন্তব্য ভারত-চীন বিতর্কিত সীমান্তে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক তৎপরতার একটি বিরল চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, এই ঘটনা সীমান্ত পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীনের সঙ্গে কয়েক দফা সীমান্ত আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চীনের এ ধরনের তৎপরতা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে না। তবে এর মাধ্যমে বাস্তবে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব।’

ভারতের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, চীন লাদাখ ও অরুণাচল প্রদেশে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্নেল ঝো বো বলেন, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ থেকে দুই দেশেরই শিক্ষা নেওয়া উচিত।

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে উভয় পক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অরুণাচল প্রদেশের সাম্প্রতিক সীমান্ত অচলাবস্থা নিয়ে চীনা গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি বলেও জানান তিনি।

সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যন্ত্রপাতি, বিরল মৃত্তিকার চুম্বক, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও ওষুধের মতো পণ্যের জন্য ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল।

গত সপ্তাহে চীন মেট্রোরেল ও মহাসড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত টানেল খননের যন্ত্র রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। বেইজিংয়ের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শুধু ভারতের জন্য না হলেও দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নে এর প্রভাব পড়তে পারে।

নিউইয়র্কের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারির মতে, ভারতের উত্থান এবং উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে দেশটির সক্ষমতা অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করাই চীনের নীতির অন্যতম লক্ষ্য। এর আগে চীন বিরল মৃত্তিকার চুম্বক রপ্তানি সীমিত করায় ভারতের বিভিন্ন শিল্পে সাময়িক সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছিল।

বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন ও চিকিৎসার স্ক্যানার তৈরিতে এসব চুম্বক ব্যবহৃত হয়। এখন ভারত নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে এ জন্য সময় ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনেও বিরোধের প্রভাব পড়ছে। অরুণাচল টাইমসের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টংগাম রিনা জানান, চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ ও জমি দখলের কারণে কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা চারণভূমিতে যেতে পারছেন না। শিকার ও ইয়াক পালনের জন্য ব্যবহৃত এসব এলাকায় তারা কবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়ায় ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কতটা সমর্থন করবে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। চীন ভারতের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘায়িত করে কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে।