Dhaka 6:52 pm, Sunday, 27 September 2026

নেপালে বন্যার ১ মাস: এখনও নিখোঁজ বহু, শোকে কাতর স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 09:49:45 am, Saturday, 26 September 2026
  • / 12 Time View

সৌদি আরবে পাঁচ বছর কাজ করে জমানো টাকা নিয়ে নেপালে ফিরেছিলেন নারায়ণ প্রসান। সেই অর্থ দিয়ে নিজের বাড়ি তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে আবার বিদেশে গিয়ে কাজ করে বাড়ি পুনর্নির্মাণ করেন তিনি। 

পরিবারের সঙ্গে নতুন করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু গত মাসের ভয়াবহ বন্যা আবারও তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

বন্যায় বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এখন এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রসান। 

তার বাড়িটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হওয়ায় সেখানে আবার বসবাস করা সম্ভব কি না, সেটিও অনিশ্চিত। পরিবারকে কোথায় পুনর্বাসন করা হবে, সে বিষয়েও এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে আবারও বিদেশে গিয়ে কাজ করার কথা ভাবছেন তিনি।

  প্রসান বলেন, ‘এই বন্যা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি জানি না এখন কী করব।’ 

নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রসানের মতো হাজার হাজার মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ আরো হাজার হাজার মানুষের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

নিখোঁজদের মধ্যে অনেকেই ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপাল সরকারকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রিয়জন হারানোর পাশাপাশি বাড়িঘর ও জীবিকা হারানোর কষ্টও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে দেশটির সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে এবং নেপালের এই দুর্যোগ পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

শাহ বলেন, ‘এই দুর্যোগ শুধু একটি স্থানীয় বিপর্যয় নয়, বরং বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছি?’

নেপালের পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। শাহ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না। হিমবাহ ও বন্যা স্ট্যাম্প বা পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করে না।’

ডিএনএ পরীক্ষায় বিলম্বিত হচ্ছে মরদেহ হস্তান্তর

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের পর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে মাত্র ১১২টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় আরো ১ হাজার ৩৩২টি মরদেহ সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছে।

প্রতিবেশী চীনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মরদেহ শনাক্ত করতে কাঠমান্ডুর নেপাল পুলিশ হাসপাতালে একটি অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব নমুনা উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পরই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গোপনীয়তার কারণে পরীক্ষাগারের কর্মকর্তারা বিস্তারিত তথ্য দিতে চাননি। তবে তারা জানিয়েছেন, মরদেহ শনাক্তের কাজে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী রবি কুমার থাপা মাগার বন্যায় তার স্ত্রী, ভাই, ভাবি ও মাকে হারিয়েছেন।

তিনি জানান, একটি ছবি দেখে তিনি তাঁর স্ত্রীর মরদেহ শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের কেউ মরদেহ দেখার আগেই সেটি দাফন করে ফেলা হয়।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ স্বজনদের দেওয়া হবে না। এই পরীক্ষা শেষ হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে। পরে পরিবারটি একটি প্রতিমূর্তি দিয়ে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। বন্যায় সন্তান হারানো অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

৩২ বছর বয়সী পাসং মায়া তামাং বন্যায় তার ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনো স্বপ্নে ছেলেকে দেখতে পান। স্বপ্নে ছেলে যেন তাঁকে সাহায্যের জন্য ডাকছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোটের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে তামাং বলেন,‘আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু আমি তাকে শেষবার দেখতে পারিনি। এ জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। স্বপ্নে শুনি, সে বলছে—কেন আমি তাকে একা রেখে চলে গেলাম?’
বন্যার সময় তার ছেলে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিল। পরে খবর পাওয়ার আগেই স্কুলটি পানিতে ভেসে যায়। তিন দিন পর দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা থেকে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পারেননি।

গত ২৬ আগস্ট সকালে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে নেপালে। তখন অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল বা স্কুলের পথে ছিল। এতে অনেক শিশুও বন্যার পানিতে ভেসে যায়। নুয়াকোটের বাসিন্দা আস্তা মান ডাঙ্গোল বলেন, পরে কয়েকজন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের কারও কারও গায়ে তখনও স্কুলের লোগোযুক্ত টাই ছিল।

তিনি বলেন, ‘বড় শিক্ষার্থীরা দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠে যেতে পেরেছিল। কিন্তু ছোট শিশুরা দ্রুত দৌড়াতে পারেনি। তারা পানিতে ভেসে যায়।’ এদিকে, বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আবার চালু করতে কাজ করছেন কর্মীরা।

নেপাল সরকারের হিসাবে, বন্যার পর পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪৭৭ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। এতে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাড়িঘর।

বর্তমানে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সড়ক প্রকৌশলী ইশমিতা শাহ জানান, বন্যার দ্বিতীয় দিন থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাস্তা চালু করতে নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন তারা। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তবে আগামী কয়েক দিনে আরও খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় পুনরুদ্ধারের কাজ কঠিন হতে পারে বলে জানান তিনি।

ইশমিতা শাহ বলেন, ‘আবহাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দিন কঠিন হতে পারে। তবে আমরা এর জন্য প্রস্তুত আছি।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নেপালে বন্যার ১ মাস: এখনও নিখোঁজ বহু, শোকে কাতর স্বজনরা

Update Time : 09:49:45 am, Saturday, 26 September 2026

সৌদি আরবে পাঁচ বছর কাজ করে জমানো টাকা নিয়ে নেপালে ফিরেছিলেন নারায়ণ প্রসান। সেই অর্থ দিয়ে নিজের বাড়ি তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে আবার বিদেশে গিয়ে কাজ করে বাড়ি পুনর্নির্মাণ করেন তিনি। 

পরিবারের সঙ্গে নতুন করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু গত মাসের ভয়াবহ বন্যা আবারও তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

বন্যায় বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এখন এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রসান। 

তার বাড়িটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হওয়ায় সেখানে আবার বসবাস করা সম্ভব কি না, সেটিও অনিশ্চিত। পরিবারকে কোথায় পুনর্বাসন করা হবে, সে বিষয়েও এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে আবারও বিদেশে গিয়ে কাজ করার কথা ভাবছেন তিনি।

  প্রসান বলেন, ‘এই বন্যা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি জানি না এখন কী করব।’ 

নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রসানের মতো হাজার হাজার মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ আরো হাজার হাজার মানুষের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

নিখোঁজদের মধ্যে অনেকেই ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপাল সরকারকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রিয়জন হারানোর পাশাপাশি বাড়িঘর ও জীবিকা হারানোর কষ্টও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে দেশটির সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে এবং নেপালের এই দুর্যোগ পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

শাহ বলেন, ‘এই দুর্যোগ শুধু একটি স্থানীয় বিপর্যয় নয়, বরং বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছি?’

নেপালের পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। শাহ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না। হিমবাহ ও বন্যা স্ট্যাম্প বা পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করে না।’

ডিএনএ পরীক্ষায় বিলম্বিত হচ্ছে মরদেহ হস্তান্তর

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের পর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে মাত্র ১১২টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় আরো ১ হাজার ৩৩২টি মরদেহ সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছে।

প্রতিবেশী চীনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মরদেহ শনাক্ত করতে কাঠমান্ডুর নেপাল পুলিশ হাসপাতালে একটি অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব নমুনা উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পরই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গোপনীয়তার কারণে পরীক্ষাগারের কর্মকর্তারা বিস্তারিত তথ্য দিতে চাননি। তবে তারা জানিয়েছেন, মরদেহ শনাক্তের কাজে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী রবি কুমার থাপা মাগার বন্যায় তার স্ত্রী, ভাই, ভাবি ও মাকে হারিয়েছেন।

তিনি জানান, একটি ছবি দেখে তিনি তাঁর স্ত্রীর মরদেহ শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের কেউ মরদেহ দেখার আগেই সেটি দাফন করে ফেলা হয়।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ স্বজনদের দেওয়া হবে না। এই পরীক্ষা শেষ হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে। পরে পরিবারটি একটি প্রতিমূর্তি দিয়ে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। বন্যায় সন্তান হারানো অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

৩২ বছর বয়সী পাসং মায়া তামাং বন্যায় তার ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনো স্বপ্নে ছেলেকে দেখতে পান। স্বপ্নে ছেলে যেন তাঁকে সাহায্যের জন্য ডাকছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোটের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে তামাং বলেন,‘আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু আমি তাকে শেষবার দেখতে পারিনি। এ জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। স্বপ্নে শুনি, সে বলছে—কেন আমি তাকে একা রেখে চলে গেলাম?’
বন্যার সময় তার ছেলে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিল। পরে খবর পাওয়ার আগেই স্কুলটি পানিতে ভেসে যায়। তিন দিন পর দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা থেকে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পারেননি।

গত ২৬ আগস্ট সকালে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে নেপালে। তখন অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল বা স্কুলের পথে ছিল। এতে অনেক শিশুও বন্যার পানিতে ভেসে যায়। নুয়াকোটের বাসিন্দা আস্তা মান ডাঙ্গোল বলেন, পরে কয়েকজন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের কারও কারও গায়ে তখনও স্কুলের লোগোযুক্ত টাই ছিল।

তিনি বলেন, ‘বড় শিক্ষার্থীরা দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠে যেতে পেরেছিল। কিন্তু ছোট শিশুরা দ্রুত দৌড়াতে পারেনি। তারা পানিতে ভেসে যায়।’ এদিকে, বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আবার চালু করতে কাজ করছেন কর্মীরা।

নেপাল সরকারের হিসাবে, বন্যার পর পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪৭৭ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। এতে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাড়িঘর।

বর্তমানে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সড়ক প্রকৌশলী ইশমিতা শাহ জানান, বন্যার দ্বিতীয় দিন থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাস্তা চালু করতে নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন তারা। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তবে আগামী কয়েক দিনে আরও খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় পুনরুদ্ধারের কাজ কঠিন হতে পারে বলে জানান তিনি।

ইশমিতা শাহ বলেন, ‘আবহাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দিন কঠিন হতে পারে। তবে আমরা এর জন্য প্রস্তুত আছি।’