হুতিদের হামলা বাড়ার পর প্রথমবার সৌদিতে বিমান হামলার সতর্কতা
- Update Time : 11:07:19 am, Saturday, 19 September 2026
- / 5 Time View
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর পাওয়া গেছে।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বাসিন্দাদের নিরাপদে থাকার এবং ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে এবং শনিবার সকালে রিয়াদসহ সৌদি আরবের আরো কয়েকটি অঞ্চলে সতর্কতা জারি করে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ।
রয়টার্স ও এএফপির সাংবাদিকেরা রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন।
তবে বিস্ফোরণের কারণ বা এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। জুলাইয়ে ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর রিয়াদে এটাই প্রথম বিমান হামলার সতর্কতা জারির ঘটনা বলে জানায় বিবিসি। হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে আরো বেড়েছে। এর মধ্যে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সমুদ্র অবরোধ’ ঘোষণা করেছে।
সম্প্রতি হুতিরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকা এবং পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
পেরিম দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে অবস্থিত। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরে সৌদি আরবের অবরোধের জবাব হিসেবে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের এই নৌপথের গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
এর মধ্যে গত সপ্তাহে হুতিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। হামলার পর কয়েকটি স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। এতে সেগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির তেল স্থাপনায় হামলার প্রভাব তাই শুধু সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন দেশে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছিল। সৌদি তেল স্থাপনায় নতুন হামলা সেই চাপ আরো বাড়িয়েছে।
সৌদি আরবের কার্যত শাসক ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন বলে জানিয়েছে সিবিএস নিউজ। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সরাসরি মার্কিন সেনাবাহিনীকে এই সংঘাতে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেননি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া চলতি সপ্তাহের শুরুতে দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে ৪৫০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, এসব হামলার জবাবে হুতিরা সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে হুতিদের দেওয়া এই হামলার সংখ্যা যাচাই করা যায়নি। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই দুই পক্ষের সংঘাত আরো বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকে ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা একমত হন যে, বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা সমস্যা থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইয়েমেনে বর্তমান সংঘাতের শুরু ২০১৪ সালে। ওই সময় হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর ২০১৫ সালে সংঘাত আরো বড় আকার ধারণ করে। ইয়েমেনের সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে ওই বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে কয়েকটি আরব দেশ সামরিক জোট গঠন করে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ চলে। সংঘাতে বিভিন্ন পক্ষের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, আর হুতিদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে ইরানকে দেখা হয়।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, রোগ এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ইয়েমেনে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের কোনো না কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।






