Dhaka 7:32 pm, Tuesday, 15 September 2026
সর্বশেষ
অবৈধভাবে দখল করা সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করা হবে : গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সূচি চূড়ান্ত কিছু নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার : গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আ. লীগের সাবেক এমপি আজিজুল আটক যুদ্ধ, সংকট আর ভোট : পুতিনের সামনে নতুন পরীক্ষা এক দিনের সফরে সিলেটের পথে রাষ্ট্রপতি শহীদ ২ সেনা সদস্যের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন সালমান এফ রহমান ইসি ঘোষিত ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকার জানে না : প্রতিমন্ত্রী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বিপিসির ১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আমদানিতে প্রভাবের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 08:08:55 am, Monday, 14 September 2026
  • / 11 Time View

সরকার বদলেছে, বদলেছে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামোও। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশও গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতা, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব দীর্ঘদিনের—এমন অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়িক যোগাযোগ সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

বিপিসির নথি, দরপত্র ও কার্যাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড।

সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ একই ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মোট প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানি এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হিসাব অনুযায়ী, এটি মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

তবে শুধু কার্যাদেশের পরিমাণ দিয়ে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম, গুণগত মান, সরবরাহের সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দরপত্রের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রশ্নটি মূলত প্রতিযোগিতার সুযোগ ও সরবরাহের ঝুঁকি নিয়ে।

জুন-আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।

পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

এই চার প্যাকেজের মধ্যে তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল ডিজেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার।

পরবর্তী জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এ সময়ে প্রিমিয়াম বাড়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি সরবরাহকারীর সংখ্যা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতাও কি প্রিমিয়াম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে একই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারদর এবং বিপিসির ক্রয়মূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিপিসির নথিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছিল। বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতাও সংকটের সময় সমস্যা বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ বা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন।

যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় যে ভবনে, একই ভবনে এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগের দায়িত্ব, তাঁদের বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং বিপিসির সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে।

তবে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সে বিষয়ে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল।

সরকার জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত আছে কি না তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রের প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে এতে জ্বালানি সরবরাহে দেশের ঝুঁকি কতটা কমছে বা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিপিসির ১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আমদানিতে প্রভাবের অভিযোগ

Update Time : 08:08:55 am, Monday, 14 September 2026

সরকার বদলেছে, বদলেছে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামোও। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশও গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতা, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব দীর্ঘদিনের—এমন অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়িক যোগাযোগ সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

বিপিসির নথি, দরপত্র ও কার্যাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড।

সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ একই ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মোট প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানি এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হিসাব অনুযায়ী, এটি মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

তবে শুধু কার্যাদেশের পরিমাণ দিয়ে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম, গুণগত মান, সরবরাহের সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দরপত্রের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রশ্নটি মূলত প্রতিযোগিতার সুযোগ ও সরবরাহের ঝুঁকি নিয়ে।

জুন-আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।

পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

এই চার প্যাকেজের মধ্যে তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল ডিজেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার।

পরবর্তী জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এ সময়ে প্রিমিয়াম বাড়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি সরবরাহকারীর সংখ্যা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতাও কি প্রিমিয়াম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে একই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারদর এবং বিপিসির ক্রয়মূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিপিসির নথিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছিল। বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতাও সংকটের সময় সমস্যা বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ বা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন।

যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় যে ভবনে, একই ভবনে এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগের দায়িত্ব, তাঁদের বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং বিপিসির সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে।

তবে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সে বিষয়ে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল।

সরকার জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত আছে কি না তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রের প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে এতে জ্বালানি সরবরাহে দেশের ঝুঁকি কতটা কমছে বা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।