Dhaka 4:08 am, Saturday, 1 August 2026

দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের পাশে বসুন্ধরা আই হসপিটাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 08:56:07 am, Friday, 31 July 2026
  • / 17 Time View

বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ঝাপসা দৃষ্টিতে জীবন কাটাচ্ছিলেন অনেক মানুষ। কারও কাছে প্রিয়জনের মুখও ছিল অস্পষ্ট, কেউ আবার প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলেন চোখের আলো। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পারা সেই অসহায় মানুষগুলোর জীবনেই আশার আলো জ্বালিয়েছে বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম।

সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত এই মানবিক উদ্যোগে ৩৬ জন রোগীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জনের ছানি এবং ছয়জনের টেরিজিয়াম (চোখের মাংসপিণ্ড) অপারেশন করা হয়। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া—সব ধরনের ব্যয় বহন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়েছেন চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরা। দীর্ঘদিন পর আবার পরিষ্কারভাবে পৃথিবী দেখতে পেরে অনেকের চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু, মুখে ছিল নতুন জীবনের হাসি।

বসুন্ধরা গ্রুপ ও ভিশনকেয়ার ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে উন্নতমানের চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার হাতুয়া গ্রামের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী শুক্কুর মিয়ার জীবনও বদলে দিয়েছে এই উদ্যোগ। প্রায় দুই বছর ধরে তার চোখের দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল। একসময় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালালেও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালে এলাকায় বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের প্রচারণা শুরু হলে তিনি চক্ষু চিকিৎসা শিবিরে অংশ নেন। পরীক্ষায় দুই চোখেই ছানি ধরা পড়ে। গত বছর তার ডান চোখে সফলভাবে অপারেশন করা হয়। এবার বাম চোখেও অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

চোখে আবার আলো ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত শুক্কুর মিয়া বলেন, “আল্লাহ উনাগোরে ভালো করুক। আমাগোর সব চিকিৎসা উনারাই করাইছে। খাওনদাওন সব ফ্রি। আইছি, এক টাকাও লাগে নাই।”

একইভাবে দীর্ঘ ৫২ বছর জুট মিলে কাজ করা আব্দুল মান্নান মিয়াও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করেন। পরে ছানি পড়ায় তার স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়। বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের সুযোগ পেয়ে এখন তিনি আবার পরিষ্কারভাবে পৃথিবী দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।

শুধু শুক্কুর মিয়া বা আব্দুল মান্নান মিয়াই নন, শহীদ মিয়া, শফিকুল মিয়াসহ আরও অনেক অসহায় মানুষ এই কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।

এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রামে গ্রামে মাইকিং ও প্রচারণার মাধ্যমে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের খবর জানানো হয়। পরে বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং কসবার মা আমেনা গফুর চ্যারিটেবল হসপিটালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত চিকিৎসা শিবিরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীদের পরীক্ষা করে অস্ত্রোপচারের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচন করেন।

গত ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই চিকিৎসা ক্যাম্পে রোগী বাছাই শেষে নির্বাচিত ৩৬ জনকে ২৯ জুলাই ঢাকায় আনা হয়। তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেয় বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

পরদিন ৩০ জুলাই বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ৩০ জনের ছানি এবং ছয়জনের টেরিজিয়াম অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মাসউদুর রহমান জানান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি কুমিল্লাতেও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব বয়স্ক রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে। আর যাদের অপারেশনের প্রয়োজন হয়নি, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ—পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন, ওষুধ, থাকা-খাওয়া—সবকিছুই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের পাশে বসুন্ধরা আই হসপিটাল

Update Time : 08:56:07 am, Friday, 31 July 2026

বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ঝাপসা দৃষ্টিতে জীবন কাটাচ্ছিলেন অনেক মানুষ। কারও কাছে প্রিয়জনের মুখও ছিল অস্পষ্ট, কেউ আবার প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলেন চোখের আলো। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পারা সেই অসহায় মানুষগুলোর জীবনেই আশার আলো জ্বালিয়েছে বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম।

সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত এই মানবিক উদ্যোগে ৩৬ জন রোগীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জনের ছানি এবং ছয়জনের টেরিজিয়াম (চোখের মাংসপিণ্ড) অপারেশন করা হয়। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া—সব ধরনের ব্যয় বহন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়েছেন চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরা। দীর্ঘদিন পর আবার পরিষ্কারভাবে পৃথিবী দেখতে পেরে অনেকের চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু, মুখে ছিল নতুন জীবনের হাসি।

বসুন্ধরা গ্রুপ ও ভিশনকেয়ার ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে উন্নতমানের চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার হাতুয়া গ্রামের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী শুক্কুর মিয়ার জীবনও বদলে দিয়েছে এই উদ্যোগ। প্রায় দুই বছর ধরে তার চোখের দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল। একসময় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালালেও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালে এলাকায় বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের প্রচারণা শুরু হলে তিনি চক্ষু চিকিৎসা শিবিরে অংশ নেন। পরীক্ষায় দুই চোখেই ছানি ধরা পড়ে। গত বছর তার ডান চোখে সফলভাবে অপারেশন করা হয়। এবার বাম চোখেও অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

চোখে আবার আলো ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত শুক্কুর মিয়া বলেন, “আল্লাহ উনাগোরে ভালো করুক। আমাগোর সব চিকিৎসা উনারাই করাইছে। খাওনদাওন সব ফ্রি। আইছি, এক টাকাও লাগে নাই।”

একইভাবে দীর্ঘ ৫২ বছর জুট মিলে কাজ করা আব্দুল মান্নান মিয়াও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করেন। পরে ছানি পড়ায় তার স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়। বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের সুযোগ পেয়ে এখন তিনি আবার পরিষ্কারভাবে পৃথিবী দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।

শুধু শুক্কুর মিয়া বা আব্দুল মান্নান মিয়াই নন, শহীদ মিয়া, শফিকুল মিয়াসহ আরও অনেক অসহায় মানুষ এই কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।

এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রামে গ্রামে মাইকিং ও প্রচারণার মাধ্যমে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের খবর জানানো হয়। পরে বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং কসবার মা আমেনা গফুর চ্যারিটেবল হসপিটালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত চিকিৎসা শিবিরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীদের পরীক্ষা করে অস্ত্রোপচারের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচন করেন।

গত ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই চিকিৎসা ক্যাম্পে রোগী বাছাই শেষে নির্বাচিত ৩৬ জনকে ২৯ জুলাই ঢাকায় আনা হয়। তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেয় বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

পরদিন ৩০ জুলাই বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ৩০ জনের ছানি এবং ছয়জনের টেরিজিয়াম অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

বসুন্ধরা আই হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মাসউদুর রহমান জানান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি কুমিল্লাতেও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব বয়স্ক রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে। আর যাদের অপারেশনের প্রয়োজন হয়নি, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ—পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন, ওষুধ, থাকা-খাওয়া—সবকিছুই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।