Dhaka 5:29 pm, Wednesday, 22 April 2026

সরকারি ঘোষণার আগেই বরিশালে লঞ্চভাড়া বাড়ল ২০০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 07:54:41 am, Wednesday, 22 April 2026
  • / 7 Time View

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। তারা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গত রবিবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে (বিআইডব্লিওটিএ) চিঠি পাঠিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তার মধ্যেই বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করছেন তারা।

লঞ্চ মালিক, কর্মচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার আগে লঞ্চের ডেকের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, গত সোমবার থেকে ৩৫০ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা, তা ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছেন। ডাবল কেবিনের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এভাবে ফ্যামিলি ও সৌখিন কেবিন থেকে শুরু করে সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনের ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগে এভাবে ভাড়া আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।

বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন লঞ্চের ডেকের যাত্রী আব্দুস সবুর বলেন, ‘এটা তো এদেশের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ৩৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। রাজনৈতিক নেতা বলেন আর সরকার, কেউ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। একসঙ্গে এত টাকা তেলের লিটারে বাড়িয়ে দিলো, যার পুরো চাপ পড়ছে মানুষের ওপর। আগে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা নেওয়া হতো, তাতেও লঞ্চ মালিকদের লাভ হতো। এখন তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মাথায় অতিরিক্ত ভাড়া তুলে দিলো। এসব কথা বলেও কোনও লাভ নেই। কারণ ভাড়া তো আর কমাতে পারবে না সরকার।’

একই কষ্টের কথা বললেন ডেকের যাত্রী রহিম শেখ, রাজ্জাক মৃধা, মনোজসহ একাধিক যাত্রী। তারা জানিয়েছেন, ডেকে আমাদের মতো সাধারণ লোকজন যাতায়াত করে। ৫০ টাকা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে।

লঞ্চের কেবিনের যাত্রী ঢাকার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কের চেয়ে নিরাপদ যাত্রা হওয়ায় লঞ্চে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করে থাকি। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর এক হাজার টাকা করে সিঙ্গেল এবং দুই হাজার টাকায় ডাবল কেবিনে যাতায়াত করতাম। মঙ্গলবার রাতে ফ্যামিলিসহ ঢাকায় যেতে ডাবল কেবিনের ভাড়া নিয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। কারণ জানতে চাইনি। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বেশি গুনতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। বাড়তি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর। কারণ সব কিছুরই দাম বেড়ে গেছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুরভী লঞ্চের মালিক এবং কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি রেজিন উল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পূর্ব নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম নেওয়া হচ্ছে। ডেকের ভাড়া ৫০ আর কেবিনে যে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম। গত রবিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়াতে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন লঞ্চমালিকরা। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে মালিকপক্ষের। ওই বৈঠকে পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও আরও বাড়বে। তা অবশ্যই ডেকে ৫০ ও কেবিনে ২০০ টাকার বেশি হবে।’

প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চাপ পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্লেট, এল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ফুয়েলিং রড, গ্যাস, রং ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

লঞ্চমালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, যাত্রীভাড়া ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ২৯ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।

ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চে আগের ভাড়াই

চাঁদপুর থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ভাড়া আগেরটাই নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত না আসায় এখনও ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে জানালেন যাত্রী, মালিক ও বিআইডব্লিওটিএ।

ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথে যাতায়াতকারী চাকরিজীবী আহমাদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। শুনতেছি লঞ্চের ভাড়াও বাড়বে। মাসে দুবার ঢাকা থেকে চাঁদপুরে বাড়ি আসি। ভাড়া বাড়লে হয়তো আসা-যাওয়া কমাতে হবে। এভাবে সব কিছুতে খরচ বাড়লে কীভাবে চলবো আমরা।’

ঈগল ও ময়ূর লঞ্চের মালিকের প্রতিনিধি আলী আজগর বলেন, ‘তেলের দাম যেহেতু বেড়েছে সেহেতু লঞ্চের ভাড়া বাড়বে। তবে কত টাকা বাড়বে আর কবে থেকে কার্যকর হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। এ বিষয়ে লঞ্চমালিক সমিতির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের আলোচনা চলছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসবে।’

বিআইডব্লিওটিএর চাঁদপুরের উপপরিচালক বাবুলাল বৈদ্য বলেন, ‘চাঁদপুর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া এখনও বাড়েনি। আগের ভাড়ায় চলছে। ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত হলে সেটি আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জানাবো। সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করে দেবে, তাই আদায় করবে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।’

তিনি জানান, বর্তমানে ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চের ডেকের ভাড়া ১৮০ টাকা, সাধারণ চেয়ার ২৫০, প্রথম শ্রেণি ৩৫০, সিঙ্গেল কেবিন ৭০০ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথে যাত্রী সংকটের কারণে কিছু লঞ্চ চলাচল করছে না।

নারায়ণগঞ্জ নৌপথেও আগের ভাড়া

বিআইডব্লিওটিএ, যাত্রী ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি নৌপথে ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করে। এখন পর্যন্ত এসব লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়নি।

মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌপথের লঞ্চের যাত্রী রফিক মিয়া বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করি। কারণ অফিস শেষে ধুলাবালু ও যানজটবিহীন যাতায়াতের জন্য লঞ্চ বেছে নিয়েছি। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত লঞ্চে ভাড়া বাড়েনি। আগের ভাড়ায় চলাচল করেছি। হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে ভাড়া বেড়ে যাবে।’

একই নৌপথে যাতায়াত করেন মেরিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এখনও এই নৌপথের লঞ্চে আগের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে দুই-একদিনের মধ্যে ভাড়া বেড়ে যাবে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম যেহেতু বেড়েছে, সেহেতু ভাড়াও বাড়বে। আর আমাদেরও বেশি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হবে। আমরা নিরুপায়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ মালিক সমিতির সহসভাপতি মনিরুজ্জামান রাজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে নৌপথে ভাড়া বাড়নোর বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত আসেনি। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এমনিতে লঞ্চের যাত্রী সংকট। তার ওপরে ভাড়া বাড়লে যাত্রী আরও কমে যাবে। ফলে এ নিয়ে উভয় সংকটের মধ্যে আছি আমরা। এমনিতে লঞ্চ ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। তার কারণে বিভিন্ন নৌপথের যাত্রীরা এখন সড়কপথে চলাচল করছে। এতে লঞ্চের যাত্রী অনেক কমে গেছে।’

বিআইডব্লিওটিএর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের পরিদর্শক মো. সেলিম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয়টি নৌপথে ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করে। তবে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। এজন্য লঞ্চের ভাড়া এখনও বাড়েনি। কবে নাগাদ বাড়বে সেটি মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের জানানো হবে।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সরকারি ঘোষণার আগেই বরিশালে লঞ্চভাড়া বাড়ল ২০০ টাকা

Update Time : 07:54:41 am, Wednesday, 22 April 2026

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। তারা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গত রবিবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে (বিআইডব্লিওটিএ) চিঠি পাঠিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তার মধ্যেই বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করছেন তারা।

লঞ্চ মালিক, কর্মচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার আগে লঞ্চের ডেকের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, গত সোমবার থেকে ৩৫০ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা, তা ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছেন। ডাবল কেবিনের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এভাবে ফ্যামিলি ও সৌখিন কেবিন থেকে শুরু করে সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনের ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগে এভাবে ভাড়া আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।

বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন লঞ্চের ডেকের যাত্রী আব্দুস সবুর বলেন, ‘এটা তো এদেশের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ৩৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। রাজনৈতিক নেতা বলেন আর সরকার, কেউ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। একসঙ্গে এত টাকা তেলের লিটারে বাড়িয়ে দিলো, যার পুরো চাপ পড়ছে মানুষের ওপর। আগে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা নেওয়া হতো, তাতেও লঞ্চ মালিকদের লাভ হতো। এখন তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মাথায় অতিরিক্ত ভাড়া তুলে দিলো। এসব কথা বলেও কোনও লাভ নেই। কারণ ভাড়া তো আর কমাতে পারবে না সরকার।’

একই কষ্টের কথা বললেন ডেকের যাত্রী রহিম শেখ, রাজ্জাক মৃধা, মনোজসহ একাধিক যাত্রী। তারা জানিয়েছেন, ডেকে আমাদের মতো সাধারণ লোকজন যাতায়াত করে। ৫০ টাকা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে।

লঞ্চের কেবিনের যাত্রী ঢাকার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কের চেয়ে নিরাপদ যাত্রা হওয়ায় লঞ্চে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করে থাকি। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর এক হাজার টাকা করে সিঙ্গেল এবং দুই হাজার টাকায় ডাবল কেবিনে যাতায়াত করতাম। মঙ্গলবার রাতে ফ্যামিলিসহ ঢাকায় যেতে ডাবল কেবিনের ভাড়া নিয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। কারণ জানতে চাইনি। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বেশি গুনতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। বাড়তি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর। কারণ সব কিছুরই দাম বেড়ে গেছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুরভী লঞ্চের মালিক এবং কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি রেজিন উল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পূর্ব নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম নেওয়া হচ্ছে। ডেকের ভাড়া ৫০ আর কেবিনে যে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম। গত রবিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়াতে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন লঞ্চমালিকরা। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে মালিকপক্ষের। ওই বৈঠকে পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও আরও বাড়বে। তা অবশ্যই ডেকে ৫০ ও কেবিনে ২০০ টাকার বেশি হবে।’

প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চাপ পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্লেট, এল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ফুয়েলিং রড, গ্যাস, রং ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

লঞ্চমালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, যাত্রীভাড়া ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ২৯ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।

ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চে আগের ভাড়াই

চাঁদপুর থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ভাড়া আগেরটাই নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত না আসায় এখনও ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে জানালেন যাত্রী, মালিক ও বিআইডব্লিওটিএ।

ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথে যাতায়াতকারী চাকরিজীবী আহমাদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। শুনতেছি লঞ্চের ভাড়াও বাড়বে। মাসে দুবার ঢাকা থেকে চাঁদপুরে বাড়ি আসি। ভাড়া বাড়লে হয়তো আসা-যাওয়া কমাতে হবে। এভাবে সব কিছুতে খরচ বাড়লে কীভাবে চলবো আমরা।’

ঈগল ও ময়ূর লঞ্চের মালিকের প্রতিনিধি আলী আজগর বলেন, ‘তেলের দাম যেহেতু বেড়েছে সেহেতু লঞ্চের ভাড়া বাড়বে। তবে কত টাকা বাড়বে আর কবে থেকে কার্যকর হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। এ বিষয়ে লঞ্চমালিক সমিতির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের আলোচনা চলছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসবে।’

বিআইডব্লিওটিএর চাঁদপুরের উপপরিচালক বাবুলাল বৈদ্য বলেন, ‘চাঁদপুর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া এখনও বাড়েনি। আগের ভাড়ায় চলছে। ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত হলে সেটি আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জানাবো। সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করে দেবে, তাই আদায় করবে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।’

তিনি জানান, বর্তমানে ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চের ডেকের ভাড়া ১৮০ টাকা, সাধারণ চেয়ার ২৫০, প্রথম শ্রেণি ৩৫০, সিঙ্গেল কেবিন ৭০০ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথে যাত্রী সংকটের কারণে কিছু লঞ্চ চলাচল করছে না।

নারায়ণগঞ্জ নৌপথেও আগের ভাড়া

বিআইডব্লিওটিএ, যাত্রী ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি নৌপথে ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করে। এখন পর্যন্ত এসব লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়নি।

মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌপথের লঞ্চের যাত্রী রফিক মিয়া বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করি। কারণ অফিস শেষে ধুলাবালু ও যানজটবিহীন যাতায়াতের জন্য লঞ্চ বেছে নিয়েছি। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত লঞ্চে ভাড়া বাড়েনি। আগের ভাড়ায় চলাচল করেছি। হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে ভাড়া বেড়ে যাবে।’

একই নৌপথে যাতায়াত করেন মেরিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এখনও এই নৌপথের লঞ্চে আগের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে দুই-একদিনের মধ্যে ভাড়া বেড়ে যাবে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম যেহেতু বেড়েছে, সেহেতু ভাড়াও বাড়বে। আর আমাদেরও বেশি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হবে। আমরা নিরুপায়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ মালিক সমিতির সহসভাপতি মনিরুজ্জামান রাজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে নৌপথে ভাড়া বাড়নোর বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত আসেনি। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এমনিতে লঞ্চের যাত্রী সংকট। তার ওপরে ভাড়া বাড়লে যাত্রী আরও কমে যাবে। ফলে এ নিয়ে উভয় সংকটের মধ্যে আছি আমরা। এমনিতে লঞ্চ ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। তার কারণে বিভিন্ন নৌপথের যাত্রীরা এখন সড়কপথে চলাচল করছে। এতে লঞ্চের যাত্রী অনেক কমে গেছে।’

বিআইডব্লিওটিএর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের পরিদর্শক মো. সেলিম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয়টি নৌপথে ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করে। তবে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। এজন্য লঞ্চের ভাড়া এখনও বাড়েনি। কবে নাগাদ বাড়বে সেটি মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের জানানো হবে।’