ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাক্কা; মার্কিন শেয়ার বাজারে সূচকের লাফ
- Update Time : 08:49:43 am, Thursday, 5 November 2026
- / 6 Time View
ওয়াল স্ট্রিট এমন একটি ফলাফল উদযাপন করছে যা প্রথম নজরে কিছুটা অবিশ্বাস্য বা বিপরীতমুখী মনে হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে কর কর্তন, নিয়মকানুন শিথিলকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বাজারের জন্য অনুকূল প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।
তারপরও, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতি বড় ধরনের অনাস্থা জানিয়ে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মার্কিন শেয়ার বাজারে ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ উত্থান দেখা গেছে।
তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে এবং ট্রেজারি বন্ডের বাজার চাঙা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বাজি ধরছেন যে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্পের কিছু খামখেয়ালি বা অনাকাঙ্ক্ষিত নীতি যেমন— শুল্ক আরোপ, ঘাটতি বাজেট তৈরি এবং ইরান সংঘাতের ওপর লাগাম টানতে পারে। অন্য কথায়, বাজার বামপন্থার দিকে কোনো পরিবর্তনের কারণে খুশি হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কমার সম্ভাবনাকেই স্বাগত জানাচ্ছে।
নির্বাচনের পর বুধবার ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দেড় হাজার পয়েন্টের বেশি লাফিয়ে বেড়েছে।
অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক কম্পোজিট যথাক্রমে ১.৫৮ শতাংশ এবং ১.৪৪ শতাংশ বেড়েছে। ভোটের পর প্রাথমিকভাবে শেয়ার বিক্রির কিছুটা চাপ তৈরি হলেও, পরবর্তীতে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডার ওপর ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের প্রভাব কী হতে পারে তা বিনিয়োগকারীরা নতুন করে মূল্যায়ন করায় এই উত্থান ঘটে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত তিন মাসের মধ্যে তার সবচেয়ে শক্তিশালী দৈনিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে।
আর ডাও জোন্স প্রায় ৩ শতাংশ এগিয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন যে একটি বিভক্ত সরকার নীতিগত ধাক্কাগুলোকে সীমিত করতে পারে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বাজারে চেপে বসা কিছু অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে পারে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের কারণে ট্রাম্পের পক্ষে বড় ধরনের কর, ব্যয় এবং নীতিগত পরিবর্তন সহজে পাস করানো কঠিন হতে পারে। এই সম্ভাবনাটি সেইসব বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেছে যারা প্রশাসনের খামখেয়ালি নীতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তবে এর প্রভাব মোটেও সহজ-সরল নয়।
ডেমোক্র্যাটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি কম্পানি এবং ডিজিটাল সম্পদের ওপর কঠোর নজরদারির জন্য চাপ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে— যা এআই অবকাঠামোতে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া এই নির্বাচন ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ইরান সংঘাতের ভবিষ্যতের ওপরও প্রশ্ন তুলেছে। হোয়াইট হাউস এই রাজনৈতিক ধাক্কায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কংগ্রেস প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, তা বিনিয়োগকারীরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখনো ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম বড় বিনিয়োগের খাত।
কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় এই শিল্পের ডেটা-সেন্টারগুলোর বিশাল খরচের ওপর নতুন করে নজরদারির চাপ তৈরি করেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা যে আরও কঠোর নিয়মকানুন, ডাটা-সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ বা জ্বালানি ব্যবহারের ওপর কড়া নজরদারি এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণকে মন্থর করে দিতে পারে। এর প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র ছিল। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট (গুগল) এবং মেটার মত শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা ভাবছেন যে অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি ধীর হলে তা প্রতিষ্ঠিত ক্লাউড-কম্পিউটিং ব্যবসাগুলোর জন্য উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে, ‘হাট ৮’, ‘আইআরইএন’, ‘কোর সায়েন্টিফিক’ এবং ‘অ্যাপ্লাইড ডিজিটাল’-এর মতো ডাটা-সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে। সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩.১ শতাংশ কমে ৬ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। টেসলার শেয়ারের দামও কমেছে। আর প্রতিরক্ষা খাতের ঠিকাদারেরা এই আশঙ্কায় পড়েছেন যে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে বাধার বাধার মুখে পড়তে পারে। নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তেলের বাজারে।
বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৫ ডলারে নেমে আসে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দামেও বড় পতন রেকর্ড করা হয়েছে। তেলের এই বড় পতন মূলত এই আশাকে প্রতিফলিত করে যে, ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় ট্রাম্পের ওপর ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চাপ বাড়াতে পারে। এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম চড়া ছিল এবং তা মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছিল। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে এই যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তেলের দাম কমলে তা সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেবে। সস্তা জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে পারে, পরিবহন খরচ কমাতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমানোর বিষয়ে ভাবার সুযোগ দেবে। তবে তেল-সংবেদনশীল বাজারগুলোর এই চাঙ্গা ভাব আংশিকভাবে ভূ-রাজনৈতিক সমঝোতার আশার ওপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের সংঘাত বাড়লে এই লাভগুলো দ্রুত হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।






