উপকূলের সংকট সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আহ্বান
- Update Time : 12:26:29 pm, Sunday, 1 November 2026
- / 4 Time View
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতি ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ ঝুঁকি আরো বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি উপকূলের সংকট সমাধানে সব রাজনৈতিক দলকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
তারা বলেছেন, উপকূলের সমস্যা কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। জাতীয় স্বার্থে এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিন্ন অবস্থান থাকা জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে।
রবিবার (১ নভেম্বর) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত ‘কোস্টাল ক্লাইমেট ডায়ালগ’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ উপকূলীয় জনগণের নীতিগত প্রস্তাবনা ‘উপকূল ঘোষণা’ তুলে ধরার দাবিতে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আব্দুল লতিফ।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল সীমাহীন সংকটে রয়েছে।
দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। উপকূলের সংকট সমাধানে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, উপকূলের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে পরিবেশের বিদ্যমান সংকটগুলোর সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উপকূলের সমস্যা সমাধানে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কাজ করার জন্য উপকূলবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠনের প্রস্তাব দেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াই ও গণ-অভ্যুত্থানের পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উপকূলের মানুষের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষার কথা বলে বনের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে স্ববিরোধী। উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাসপাতাল নির্মাণ বেশি জরুরি, নাকি উড়োজাহাজ কেনা—তা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করা উচিত।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) নির্বাহী প্রধান মো. শামসুদ্দোহা বলেন, উপকূল ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের অভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। শুধু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, দেশের ভেতরেও অনেক কিছু করার আছে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ এসব ইস্যুতে প্রায়ই পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে। কার্বন শোষণের মাধ্যমেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩২ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও সুপেয় পানির সংকট সমাধান করা না গেলে এসব এলাকার মানুষ জীবিকা ও বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হবেন।
তিনি উপকূলীয় সংকট মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুন্দরবন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে আমিনুর রসুল কপ-৩১ সম্মেলনে উপকূলের দাবিগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সুমন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন, সিডিপির চেয়ারম্যান মিহির বিশ্বাস, চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল পারভেজ, কাপের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, রি-ওয়েটের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আসিফ মইনুর চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
