Dhaka 7:40 pm, Thursday, 30 April 2026
সর্বশেষ
আবারও গাজা অভিমুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের হামলা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে আমরা ব্যবহার করতে চাই না: প্রধানমন্ত্রী ২৩৮৬৫টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে: সংসদে আইনমন্ত্রী ৯ অঞ্চলে দমকা হাওয়া ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, নদীবন্দরে সতর্কবার্তা সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ফ্যামিলি কার্ডে ৩৭৮১৪ পরিবারের ‘নারী প্রধানকে’ টাকা দেওয়া হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী মাথা নত করবে না হিজবুল্লাহ, সংঘাত নিরসনে নাইম কাশেমের ৫ দাবি ইসলামপুরে সুপেয় পানির স্বস্তি, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে সরকারি সরবরাহ জাতীয় নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো অভিযোগ পাইনি: ইইউ নির্বাচন মিশন ঈদুল আজহার ছুটি নিয়ে বড় সুখবর

মুক্ত চিন্তা না, ধর্মবিদ্বেষ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 09:45:59 am, Sunday, 9 November 2025
  • / 498 Time View

আশিক রিজভী:

বাঙালি সমাজে মুক্তচিন্তা একসময় ছিল এক গভীর ও পবিত্র ধারণা। চিন্তার মুক্তি মানে ছিল—অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত হওয়া, যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তোলা, আলোচনায় ভিন্ন মতকে স্থান দেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মুক্ত চিন্তার মুখোশের আড়ালে এমন এক চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে, যা আসলে মুক্ত নয়, বরং এক ধরনের বিদ্বেষের ফাঁদে আটকে গেছে। বিশেষত কিছু তথাকথিত নারী অধিকারকর্মী ও ব্লগারদের লেখায় ‘মুক্তচিন্তা’ এখন প্রায়শই ধর্মবিদ্বেষের আরেক নাম হয়ে উঠছে। এরমধ্যে তাবাসসুম জেরিন, তসলিমা নাসরিন, আসাদ নূর অন্যতম।

তাদের লেখায় দেখা যায়, ইসলাম বা ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ব্যঙ্গ ও অবমাননার সুর। তারা দাবি করেন—তারা নাকি সমাজে সমতা, মানবাধিকার, নারীর স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের কথাবার্তায় ফুটে ওঠে এমন এক তীব্র বিদ্বেষ, যা কোনো যুক্তির আলো নয়, বরং রাগ আর প্রতিশোধের অন্ধকার থেকে জন্ম নেওয়া। তারা মুক্তচিন্তার পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়ান, কিন্তু সেই পতাকা প্রায়ই অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে ওঠে।

একজন লেখক বা ব্লগার যখন নিজের কলমকে সমাজের সামনে তোলে, তখন তার দায়িত্ব থাকে—তার চিন্তায় যেন আলোক থাকে, আগুন নয়। কিন্তু আমরা আজ এমন এক প্রজন্মের সাক্ষী, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অজ্ঞতা ও আক্রোশকে জ্ঞানের আকারে প্রকাশ করছে। ধর্ম নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলা দোষ নয়, কিন্তু যখন প্রশ্নগুলো কৌতুক, ব্যঙ্গ, আর ঘৃণায় রূপ নেয়—তখন সেটি আর মুক্তচিন্তা থাকে না। সেটি পরিণত হয় বিকৃত চিন্তা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারে।

ব্লগার বা অনলাইন লেখকরা আজকাল বলেন—“আমি কেবল প্রশ্ন তুলেছি।” কিন্তু তাদের প্রশ্নগুলো কেমন? যেমন—প্রার্থনাকে “অন্ধ আনুগত্য” বলা, পর্দাকে “নারীর কারাগার” বলা, বা নবী-রাসুলদের জীবনকে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। এগুলো কোনো চিন্তার বিকাশ নয়; এগুলো সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এমন লেখালেখি মানুষকে ভাবতে শেখায় না, বরং ঘৃণা করতে শেখায়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্ম ও মানবতা পাশাপাশি চলে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এখানকার নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, ধনী-গরিব—সবাই একে অপরের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে বেঁচে এসেছে। সেই সহনশীল ঐতিহ্যের মাঝখানে যখন কেউ মুক্তচিন্তার নামে ধর্মকে অপমান করে, তখন সেটি মুক্তি নয়, বরং বিভাজন সৃষ্টি করে।

আজ যারা নিজেদের নারীবাদী বা মুক্তচিন্তক পরিচয় দেন, তাদের একাংশ এই ভুল পথে হাঁটছেন। তারা মনে করেন, ইসলাম মানেই নারী নিপীড়নের ধর্ম, আর ধর্মীয় মানুষ মানেই পশ্চাৎপদ। অথচ ইসলামের ইতিহাসে নারী শিক্ষা, উত্তরাধিকার, বিবাহ, এমনকি সামাজিক মর্যাদায় নারীর অধিকার—সবই সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। এই বাস্তবতাগুলো তারা দেখতে চান না, কারণ তাতে তাদের তৈরি করা “অন্ধকার ইসলাম”-এর গল্পটি ভেঙে যায়।

মুক্তচিন্তা মানে শুধু ধর্মকে প্রশ্ন করা নয়, বরং নিজের চিন্তাকেও প্রশ্ন করা। কিন্তু এই ব্লগারদের লেখায় দেখা যায় আত্মসমালোচনার ঘাটতি। তারা বিশ্বাস করেন, তারাই চূড়ান্ত সত্যের বাহক—আর যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তারা অশিক্ষিত বা ধর্মান্ধ। এই মানসিকতা মুক্ত নয়; এটি এক নতুন ধরণের একনায়কতন্ত্র, যেখানে শুধুমাত্র নিজের মতই সত্য। সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার শিক্ষা, নৈতিকতা, ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু যখন কেউ নারী স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে, তখন সে নিজেই নারীর মর্যাদাকে ছোট করে। কারণ, ধর্মবিশ্বাসী অসংখ্য নারী তাদের আস্থা ও বিশ্বাসে শক্তি খুঁজে পান। তাদের বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করা মানে তাদের অস্তিত্বকে অবমূল্যায়ন করা।

আজ প্রয়োজন মুক্ত চিন্তার নামে নতুন বিভাজন নয়, বরং যুক্তি ও শ্রদ্ধার সংলাপ। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু তাতে যদি অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করা হয়, তবে তা সভ্যতার নয়, বর্বরতার লক্ষণ। যাদের কলম সমাজে প্রভাব ফেলে, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। তারা যদি মুক্তচিন্তার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ায়, তবে সমাজে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারই ছড়াবে।

মুক্ত চিন্তার চর্চা মানে প্রশ্ন করা, কিন্তু সেই প্রশ্নে যেন করুণা থাকে, সম্মান থাকে, সত্যের সন্ধান থাকে। বিদ্বেষ থেকে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন কখনো আলোকিত সমাজ গড়তে পারে না। আজ যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন, তাদের মনে রাখা দরকার—প্রগতি মানে অন্যের বিশ্বাসকে ধ্বংস করা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। মুক্তচিন্তার পথে বিদ্বেষ ঢুকে গেলে, সেটি মুক্তি নয়, আত্মবিনাশের রাস্তা। শেষ পর্যন্ত, সত্যিকারের মুক্ত চিন্তাবিদ সে-ই, যে নিজের মত প্রকাশের পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করে। কারণ, চিন্তার স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগায়—বিদ্বেষ নয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মুক্ত চিন্তা না, ধর্মবিদ্বেষ?

Update Time : 09:45:59 am, Sunday, 9 November 2025

আশিক রিজভী:

বাঙালি সমাজে মুক্তচিন্তা একসময় ছিল এক গভীর ও পবিত্র ধারণা। চিন্তার মুক্তি মানে ছিল—অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত হওয়া, যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তোলা, আলোচনায় ভিন্ন মতকে স্থান দেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মুক্ত চিন্তার মুখোশের আড়ালে এমন এক চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে, যা আসলে মুক্ত নয়, বরং এক ধরনের বিদ্বেষের ফাঁদে আটকে গেছে। বিশেষত কিছু তথাকথিত নারী অধিকারকর্মী ও ব্লগারদের লেখায় ‘মুক্তচিন্তা’ এখন প্রায়শই ধর্মবিদ্বেষের আরেক নাম হয়ে উঠছে। এরমধ্যে তাবাসসুম জেরিন, তসলিমা নাসরিন, আসাদ নূর অন্যতম।

তাদের লেখায় দেখা যায়, ইসলাম বা ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ব্যঙ্গ ও অবমাননার সুর। তারা দাবি করেন—তারা নাকি সমাজে সমতা, মানবাধিকার, নারীর স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের কথাবার্তায় ফুটে ওঠে এমন এক তীব্র বিদ্বেষ, যা কোনো যুক্তির আলো নয়, বরং রাগ আর প্রতিশোধের অন্ধকার থেকে জন্ম নেওয়া। তারা মুক্তচিন্তার পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়ান, কিন্তু সেই পতাকা প্রায়ই অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে ওঠে।

একজন লেখক বা ব্লগার যখন নিজের কলমকে সমাজের সামনে তোলে, তখন তার দায়িত্ব থাকে—তার চিন্তায় যেন আলোক থাকে, আগুন নয়। কিন্তু আমরা আজ এমন এক প্রজন্মের সাক্ষী, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অজ্ঞতা ও আক্রোশকে জ্ঞানের আকারে প্রকাশ করছে। ধর্ম নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলা দোষ নয়, কিন্তু যখন প্রশ্নগুলো কৌতুক, ব্যঙ্গ, আর ঘৃণায় রূপ নেয়—তখন সেটি আর মুক্তচিন্তা থাকে না। সেটি পরিণত হয় বিকৃত চিন্তা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারে।

ব্লগার বা অনলাইন লেখকরা আজকাল বলেন—“আমি কেবল প্রশ্ন তুলেছি।” কিন্তু তাদের প্রশ্নগুলো কেমন? যেমন—প্রার্থনাকে “অন্ধ আনুগত্য” বলা, পর্দাকে “নারীর কারাগার” বলা, বা নবী-রাসুলদের জীবনকে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। এগুলো কোনো চিন্তার বিকাশ নয়; এগুলো সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এমন লেখালেখি মানুষকে ভাবতে শেখায় না, বরং ঘৃণা করতে শেখায়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্ম ও মানবতা পাশাপাশি চলে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এখানকার নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, ধনী-গরিব—সবাই একে অপরের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে বেঁচে এসেছে। সেই সহনশীল ঐতিহ্যের মাঝখানে যখন কেউ মুক্তচিন্তার নামে ধর্মকে অপমান করে, তখন সেটি মুক্তি নয়, বরং বিভাজন সৃষ্টি করে।

আজ যারা নিজেদের নারীবাদী বা মুক্তচিন্তক পরিচয় দেন, তাদের একাংশ এই ভুল পথে হাঁটছেন। তারা মনে করেন, ইসলাম মানেই নারী নিপীড়নের ধর্ম, আর ধর্মীয় মানুষ মানেই পশ্চাৎপদ। অথচ ইসলামের ইতিহাসে নারী শিক্ষা, উত্তরাধিকার, বিবাহ, এমনকি সামাজিক মর্যাদায় নারীর অধিকার—সবই সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। এই বাস্তবতাগুলো তারা দেখতে চান না, কারণ তাতে তাদের তৈরি করা “অন্ধকার ইসলাম”-এর গল্পটি ভেঙে যায়।

মুক্তচিন্তা মানে শুধু ধর্মকে প্রশ্ন করা নয়, বরং নিজের চিন্তাকেও প্রশ্ন করা। কিন্তু এই ব্লগারদের লেখায় দেখা যায় আত্মসমালোচনার ঘাটতি। তারা বিশ্বাস করেন, তারাই চূড়ান্ত সত্যের বাহক—আর যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তারা অশিক্ষিত বা ধর্মান্ধ। এই মানসিকতা মুক্ত নয়; এটি এক নতুন ধরণের একনায়কতন্ত্র, যেখানে শুধুমাত্র নিজের মতই সত্য। সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার শিক্ষা, নৈতিকতা, ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু যখন কেউ নারী স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে, তখন সে নিজেই নারীর মর্যাদাকে ছোট করে। কারণ, ধর্মবিশ্বাসী অসংখ্য নারী তাদের আস্থা ও বিশ্বাসে শক্তি খুঁজে পান। তাদের বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করা মানে তাদের অস্তিত্বকে অবমূল্যায়ন করা।

আজ প্রয়োজন মুক্ত চিন্তার নামে নতুন বিভাজন নয়, বরং যুক্তি ও শ্রদ্ধার সংলাপ। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু তাতে যদি অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করা হয়, তবে তা সভ্যতার নয়, বর্বরতার লক্ষণ। যাদের কলম সমাজে প্রভাব ফেলে, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। তারা যদি মুক্তচিন্তার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ায়, তবে সমাজে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারই ছড়াবে।

মুক্ত চিন্তার চর্চা মানে প্রশ্ন করা, কিন্তু সেই প্রশ্নে যেন করুণা থাকে, সম্মান থাকে, সত্যের সন্ধান থাকে। বিদ্বেষ থেকে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন কখনো আলোকিত সমাজ গড়তে পারে না। আজ যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন, তাদের মনে রাখা দরকার—প্রগতি মানে অন্যের বিশ্বাসকে ধ্বংস করা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। মুক্তচিন্তার পথে বিদ্বেষ ঢুকে গেলে, সেটি মুক্তি নয়, আত্মবিনাশের রাস্তা। শেষ পর্যন্ত, সত্যিকারের মুক্ত চিন্তাবিদ সে-ই, যে নিজের মত প্রকাশের পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করে। কারণ, চিন্তার স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগায়—বিদ্বেষ নয়।