Dhaka 8:03 pm, Sunday, 25 October 2026
সর্বশেষ
স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি ও নজরদারি ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয় চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি বই অনুমোদন খুতবায় মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি তুলে ধরতে ইমামদের আহ্বান ইফার ডিজির ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে : ডিএনসিসি প্রশাসক দেশ গঠনে তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি : চিফ হুইফ ইবির সুপারিশপ্রাপ্ত সিভিল জজদের সংবর্ধনা টেক্সটাইল খাতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কমনওয়েলথ বৈঠকে যাবেন হুমায়ুন কবির আগামী নির্বাচন ‘অবশ্যই’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে কাউকে মনোনয়ন দিইনি : মীর শাহে আলম

সমঝোতা থেকে বাস্তবায়ন: তারেক রহমানের সফরে ঢাকা-টোকিওর নতুন প্রত্যাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 12:37:56 pm, Sunday, 25 October 2026
  • / 4 Time View

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় দীর্ঘদিনের অংশীদার জাপান। অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটির সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দুই দেশের এই অংশীদারত্বের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টোকিওর প্রত্যাশা, এ সফরের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদারে কার্যকর অগ্রগতি হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে সরকারি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২০ অক্টোবর দুই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সফরের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর। সফরটিকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে জাপান।

সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা আশাবাদী। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

জাপানের প্রত্যাশা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং জাপানি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের উন্নতি হচ্ছে। এ ধারাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে। এসব বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও গতিশীল করা এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সময় থেকেই দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জাপান সফর করেন জিয়াউর রহমান। ওই সফরের ৮ এপ্রিল তিনি জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর সঙ্গে বৈঠক করেন।

এরপর ১৯৮০ সালের ৮ জুলাই আবারও জাপান সফর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময়ের সফরের উদ্দেশ্য ছিল জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাসায়োশি ওহিরার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরেও দুই দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা এবং মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানের সহায়তা চাওয়ার প্রসঙ্গ তাঁর সরকারের সময়ের উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন অবকাঠামো সম্প্রসারণে জাপানের সহযোগিতা পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের সফরকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সফরটি দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও গভীর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসূচিতে জাপানের শিল্প ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্ভাব্য কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।

এ ছাড়া জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং আধুনিক কারখানা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও এ সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)। চুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উপায় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি এবং জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং নতুন জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক সই কিংবা সহযোগিতা বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাংলাদেশে জাপানি কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সহযোগিতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সফরের আলোচনায় স্থান পেতে পারে। দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোও দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বে গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফর বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত ও দূর করা, ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

তবে শুধু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সমঝোতা যথেষ্ট নয়; আলোচনায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নকেও গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও। জাপানের মতে, দুই দেশের অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি সেসব বিষয়ে বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।

চলমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এবং ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে বলেও মনে করছে দেশটি।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন ঢাকা ও টোকিওর।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সমঝোতা থেকে বাস্তবায়ন: তারেক রহমানের সফরে ঢাকা-টোকিওর নতুন প্রত্যাশা

Update Time : 12:37:56 pm, Sunday, 25 October 2026

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় দীর্ঘদিনের অংশীদার জাপান। অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটির সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দুই দেশের এই অংশীদারত্বের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টোকিওর প্রত্যাশা, এ সফরের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদারে কার্যকর অগ্রগতি হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে সরকারি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২০ অক্টোবর দুই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সফরের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর। সফরটিকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে জাপান।

সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা আশাবাদী। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

জাপানের প্রত্যাশা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং জাপানি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের উন্নতি হচ্ছে। এ ধারাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে। এসব বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও গতিশীল করা এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সময় থেকেই দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জাপান সফর করেন জিয়াউর রহমান। ওই সফরের ৮ এপ্রিল তিনি জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর সঙ্গে বৈঠক করেন।

এরপর ১৯৮০ সালের ৮ জুলাই আবারও জাপান সফর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময়ের সফরের উদ্দেশ্য ছিল জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাসায়োশি ওহিরার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরেও দুই দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা এবং মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানের সহায়তা চাওয়ার প্রসঙ্গ তাঁর সরকারের সময়ের উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন অবকাঠামো সম্প্রসারণে জাপানের সহযোগিতা পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের সফরকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সফরটি দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও গভীর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসূচিতে জাপানের শিল্প ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্ভাব্য কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।

এ ছাড়া জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং আধুনিক কারখানা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও এ সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)। চুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উপায় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি এবং জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং নতুন জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক সই কিংবা সহযোগিতা বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাংলাদেশে জাপানি কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সহযোগিতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সফরের আলোচনায় স্থান পেতে পারে। দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোও দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বে গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফর বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত ও দূর করা, ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

তবে শুধু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সমঝোতা যথেষ্ট নয়; আলোচনায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নকেও গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও। জাপানের মতে, দুই দেশের অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি সেসব বিষয়ে বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।

চলমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এবং ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে বলেও মনে করছে দেশটি।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন ঢাকা ও টোকিওর।