শীতলক্ষ্যায় ঐতিহ্যের উল্লাস, লাখো মানুষের ঢল
- Update Time : 12:40:37 pm, Saturday, 3 October 2026
- / 4 Time View
শীতলক্ষ্যার শান্ত জলরাশি যেন কোনো এক নতুন আবেগে আন্দোলিত। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর কাঁচনের বুকে নেমেছে সেই চিরচেনা সুর, বইঠার ছন্দ আর প্রাণের কলতান।
একসময় যা ছিল গ্রামবাংলার লোকায়ত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বহু বছরের নীরবতা ভেঙে আবার ফিরে এসেছে শীতলক্ষ্যার কোলজুড়ে। রোদের আলোয় ঝলমল করা নদীর বুকে যখন একসঙ্গে একের পর এক দীর্ঘ নৌকা ভেসে উঠল, তখন মনে হয় এ কেবল এক বিনোদন প্রতিযোগিতা নয়—এ যেন বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক মায়াবী উৎসব।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে কাঞ্চন পৌর বিএনপির আয়োজনে আয়োজিত রূপগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহাসিক এই নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১( রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
আয়োজনকে কেন্দ্র করে কাঞ্চন ও তার আশেপাশের নদীকেন্দ্রিক জনপদে ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের বাঁধভাঙা আনন্দ। নদীর দুই তীরে জমে উঠেছে উৎফুল্ল মানুষের ঢল। রূপগঞ্জের প্রতিটি গলিতে, চায়ের দোকানে কিংবা গৃহস্থের উঠোনে এখন একটাই আলোচনা—শীতলক্ষ্যায় বাইচের নৌকা নামার সেই রোমাঞ্চকর ক্ষণ। অনেকের স্বজনরা চলে এসেছেন এই নৌকাবাইচ দেখতে।
স্থানীয়দের উচ্ছ্বাস
দীর্ঘদিন পর নদীর বুকে নৌকাবাইচ ফিরতে দেখে উচ্ছ্বসিত নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ। শীতলক্ষ্যা তীরের এক জ্যেষ্ঠ বাসিন্দা কুদ্দুস মিয়া আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, দেড়টা দশক পার হয়ে গেল, শীতলক্ষ্যায় আর বাইচের নৌকা দেখি নাই। এই নদীর সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে আছে। আজকের এই বাইচ আমাদের পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। তরুণ প্রজন্ম তো এসব ভুলেই যাচ্ছিল, আজ তারা দেখুক আমাদের শিকড় কতটা সমৃদ্ধ ও আনন্দের ছিল।
উৎসবের এই ক্ষণে আরেকজন স্থানীয় তরুণ রিয়াজ হোসেন খান আনন্দ প্রকাশ করে জানান, এতদিন শুধু গল্পে শুনেছি শীতলক্ষ্যার বাইচের কথা। আজ নিজের চোখে ছন্দময় গান আর মাঝিদের বইঠার টান দেখার অভিজ্ঞতা সত্যি দারুণ। নদীর দুই পাড়ের মানুষের এই মিলনমেলা আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী এই বর্ণাঢ্য প্রতিযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। তিনি বলেন, আজকে ঈদের মতো লাগছে। রূপগঞ্জে, কাঞ্চনে ঈদ বইছে। ১৭ বছর পরে রূপগঞ্জে ঐতিহ্য ফেরত নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
তিনি আরো বলেন, আগামী দিনে হাডুডু থেকে শুরু করে সব ঐতিহ্যবাহী খেলা আমাদের মাঝে ফিরে আনব। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিনিয়ত এমন সাংস্কৃতিক আয়োজন রূপগঞ্জের সার্বিক লোকজ সংস্কৃতি রক্ষায় এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্বদেশের ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।
নৌকাগুলোর সারিবদ্ধ অবস্থান, মাঝিদের সম্মিলিত শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি সুসংহত দলগত সমন্বয় আর সুনির্দিষ্ট কৌশল নজর কেড়েছে উপস্থিত দর্শকদের। মাঝিদের সমবেত গানের সুরে সুর মিলিয়ে শীতলক্ষ্যার দুই তীরের মানুষ উদযাপনে মেতেছে।
কাঞ্চনের শীতলক্ষ্যা আবার প্রমাণ করে দিল—কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও বাংলার মাটি ও পানির সালাদে জমে থাকা এই উৎসবের রূপ কখনো মলিন হয় না। জল তরঙ্গে বইঠার ঝাপটা কেবল নদীকে জাগায়নি, জাগিয়ে তুলেছে রূপগঞ্জবাসীর সুপ্ত প্রাণের গভীর এক স্পন্দনকে।









