অযত্ন-অবহেলায় বেহাল উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র
- Update Time : 07:46:06 am, Monday, 28 September 2026
- / 9 Time View
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুর গ্রামে অবস্থিত উকিল মুন্সি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। সম্প্রতি তোলা। ছবি : সংগৃহীত
দেয়ালে ফাটল, ভাঙছে সিঁড়ি; প্রবেশপথ বিধ্বস্ত। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।
সংস্কৃতিচর্চাও হয় না নিয়মিত হয় না। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ। নির্মাণের কয়েক বছর না যেতেই অযত্ন-অবহেলায় বেহাল হয়ে পড়েছে উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র।
হাওর ও ভাটির গানের রচয়িতা মরমি সাধক উকিল মুন্সির নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্রটিতে একসময় বসতো বাউলদের মিলনমেলা।
আয়োজন করা হতো স্মরণোৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। এখন সেখানে নেমে এসেছে এক ধরনের নিস্তব্ধতা।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুর গ্রামে বেতাই নদীর তীরে ৫৩ শতাংশ জমির ওপর প্রায় চার কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত উকিল মুন্সি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির এমন চিত্র দেখা গেছে সরেজমিন গিয়ে। কেন্দ্র প্রাঙ্গণেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন উকিল মুন্সি।
২০২৩ সালের মার্চে কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে।
কেন্দ্রটিতে রয়েছে উকিল মুন্সির সমাধিসৌধ, মিলনায়তন, গ্রন্থাগার, একাডেমিক ভবন, সীমানাপ্রাচীর, সংগ্রহশালা এবং তার বসতবাড়ির আদলে নির্মিত স্থাপনা। তবে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই এসব স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট। দেয়াল ও সিঁড়ির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হচ্ছে।
বেহাল হয়ে পড়েছে প্রবেশপথও। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থাপনাগুলো।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় এই কেন্দ্র ঘিরে জমজমাট ছিল হাওরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। দেশের বিভিন্ন এলাকার গুণী বাউল শিল্পীদের নিয়ে সেখানে আয়োজন করা হতো সাংস্কৃতিক মেলা। উকিল মুন্সির স্মরণোৎসব, নাট্যচর্চা ও সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডা বসতো। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে চলতো গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
স্থানীয়রা আরো জানায়, প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কেন্দ্রটি কার্যত পরিত্যক্ত। বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে কোনো নিয়মিত অনুষ্ঠানও হয় না। ফলে যে উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তার অনেকটাই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উকিল মুন্সির সমাধি ঘিরে নির্মিত কেন্দ্রটিতে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন না থাকায় সাধকের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিও পড়ে আছে অনেকটা নিস্তব্ধ। কেন্দ্রটি দেখভালের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না।
স্মৃতিকেন্দ্রের এক পাশে বসবাস করেন উকিল মুন্সির নাতি বুলবুল আহমেদ। একসময় দাদার গান গেয়েই চলতো তার সংসার। বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো গান গাইতে পারেন না তিনি। অন্য কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহের সামর্থ্যও নেই। ফলে আর্থিক সংকটে দিন কাটছে তার পরিবারের।
বুলবুল আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর স্মৃতিকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে কেন্দ্রটির কার্যক্রম আরো অচল হয়ে পড়ে। স্মৃতিকেন্দ্রটি সংস্কার, বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং তার পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে জন্ম নেওয়া উকিল মুন্সি ছিলেন হাওর ও ভাটির গানের রচয়িতা এবং মরমি সাধক। গীতিকার ও বাউল সাধক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম। তার গানে উঠে এসেছে প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, হাওরের মানুষের জীবন-সংগ্রাম এবং আত্মার সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক।
‘সোয়াচান পাখি ও আষাঢ় মাইস্যা ভাষা পানির মতো কালজয়ী গান তাকে মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। হাওরের মানুষের জীবন, আবেগ ও অনুভূতিকে সুরে ধারণ করা এই সাধকের স্মৃতি সংরক্ষণে কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো বলে মনে করেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। কিন্তু এর বর্তমান অবস্থা ও সংস্কৃতি চর্চার অভাবে হতাশ তারা।
এলাকার সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই স্মৃতি সংরক্ষণ হয় না; উকিল মুন্সির গান এবং তার জীবন ও দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কেন্দ্রটিকে কার্যকর জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সঞ্জয় সরকার বলেন, উকিল মুন্সি ছিলেন বাউল সাধক; একই সঙ্গে মসজিদের ইমাম। তার জীবন ও গান অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য দৃষ্টান্ত। স্মৃতিকেন্দ্রটি সংস্কার করে সেখানে নিয়মিত গানের চর্চা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উকিল মুন্সির অপ্রকাশিত গানগুলো উদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, উকিল মুন্সির স্মৃতিকেন্দ্রকে জনসম্পৃক্ত ও সক্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চাওয়া হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান এবং দর্শনার্থী বাড়াতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য জানানো হবে।









