শ্রমিকের কাজ করতে গেলেন রাশিয়ায়, দালালের খপ্পরে যুদ্ধে নিহত যুবক
- Update Time : 06:16:54 pm, Wednesday, 9 September 2026
- / 3 Time View
‘অহন আমি কিবায় চলবাম? এই অবুজ সন্তানরে কিবায় পালবাম? আমি আমার স্বামীর লাশটা ফেরত চাই। আর যারা আমার স্বামীরে ধোঁকা দিয়া এ যুদ্ধের মুখে পাডাইছে, আমি ওই অপরাধী দালালরার বিচার চাই!’—সাড়ে তিন বছর ও মাত্র ৫ মাস বয়সী দুই দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে বুকে জড়িয়ে এভাবেই বিলাপ করছেন ভাগ্যহত মহিমা আক্তার।
উচ্চ বেতনে ‘ইলেকট্রনিক শ্রমিক’ হিসেবে কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে সুদূর রাশিয়ায় গত প্রায় ৫ মাস আগে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁর স্বামী আল মামুন (২৫)। কিন্তু দালালের নির্মম প্রতারণায় শ্রমিকের বদলে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল মারণাস্ত্র। বাধ্য করা হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসমরে অংশ নিতে। অবশেষে ইউক্রেনীয় বাহিনীর এক বিধ্বংসী ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাতে হলো ময়মনসিংহের নান্দাইলের এ যুবককে।
একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন পুরোপুরি দিশেহারা তাঁর পুরো পরিবার।
আল মামুন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মামুন। ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য এজেন্সির সঙ্গে তাঁর ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল।
এ বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে ব্যাংক থেকে ঋণ এবং চড়া সুদে ধারদেনা করতে হয়েছিল পরিবারটিকে।
পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর ওই প্রতারক এজেন্সি এবং একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র মামুনসহ তাঁদের ৩০ জনের দলটিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদের কোনো কাজের সুযোগ না দিয়ে, জোরপূর্বক সামরিক পোশাক পরিয়ে ও হাতে অস্ত্র দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একেবারে প্রথম সারিতে (ফ্রন্টলাইন) পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মামুনের সঙ্গে থাকা ঝিনাইদহের সহকর্মী রাজন মিয়ার একটি ফোনকলে মামুনের মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার।
রাজন মিয়া জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি আকস্মিক ড্রোন হামলায় মামুন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
ওই একই হামলায় রাজন নিজেও গুরুতর আহত হন। পরে রাশিয়ার একটি হাসপাতাল থেকে কোনোমতে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
মামুনের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। বাগরুদ্ধ বৃদ্ধা মা রোকেয়া বেগম আর দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে স্ত্রী মহিমার কান্না থামছেই না। যে স্বপ্ন নিয়ে মামুন বিদেশ গিয়েছিলেন, তা এখন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চড়া সুদের ঋণের বোঝা আর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন মহিমা। এলাকাবাসীদের কথা অন্তত মামুনের মরদেহটি শেষবারের মতো দেশে ফিরিয়ে এনে নিজ মাটিতে দাফন করার ব্যবস্থা করা হয় এবং এই জঘন্য পাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারূর ইসলাম জানান, বিষয়টি কেউ থানায় জানাননি। পরিবার যদি অভিযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত করে অভিযুক্ত দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।