যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন সমর্থনের অভিযোগে কানাডার কড়া সমালোচনায় ইরান
- Update Time : 03:40:27 am, Tuesday, 8 September 2026
- / 5 Time View
ইরান ও কানাডার মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরো বেড়েছে। কানাডার বিরুদ্ধে ‘কৌশলগত বিভ্রান্তি’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে দেশটির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
তিনি অভিযোগ করেছেন, কানাডা একদিকে শান্তি, নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে। সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বাঘাই এসব কথা বলেন।
এএনআইয়ের প্রতিবেদন জানায়, এর আগে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ ও অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে দেশটির হুমকির নিন্দা জানান। এর পরই ইরানের পক্ষ থেকে কানাডার বিরুদ্ধে এই কঠোর প্রতিক্রিয়া আসে।
বাঘাই বলেন, উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানানোর বদলে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে। তার ভাষায়, কানাডা ‘তাদের দাদাগিরি করা প্রতিবেশীকে তুষ্ট করার’ পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, কানাডা একই সঙ্গে শান্তি ও নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে থাকার দাবি করতে পারে না। আবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডকেও সমর্থন করতে পারে না।
বাঘাই কানাডার পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডার নেতারা পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি সঠিকভাবে তুলে ধরছেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি নৌ চলাচলের স্বাধীনতাই কানাডার প্রধান উদ্বেগ হয়, তাহলে দেশটি কেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখার ক্ষেত্রেও কানাডার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বাঘাই বলেন, কানাডা অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অসততা’ দেখেছে।
তাই কানাডার উচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ, অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ বন্ধের আহ্বান জানানো। ইরানের এই মুখপাত্র আরো বলেন, কানাডার বর্তমান অবস্থানকে কূটনীতি বা দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনা বলা যায় না। তার মতে, এটি ‘কৌশলগত বিভ্রান্তি’ এবং ভয়ভীতির কাছে আত্মসমর্পণের প্রকাশ। এ ধরনের নীতি কানাডাকে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও আগ্রাসন থেকেও রক্ষা করতে পারবে না।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরির জন্য ইরানকে দায়ী করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন বাঘাই। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে হরমুজ প্রণালি খোলা ও নিরাপদ ছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর আগে পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ইরানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ইরানের বক্তব্যের আগে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ ও অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন যৌথ বিবৃতিতে তেহরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান। তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে চাওয়া জাহাজগুলোর প্রতি ইরানের হুমকি, ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগও তুলে ধরেন তারা। কানাডার দুই মন্ত্রী বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। বিবৃতিতে কানাডা জানায়, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো আবার নিরাপদ ও সচল করতে এবং ইরানের আর্থিক উৎসের ওপর চাপ বাড়াতে তারা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। বিশেষ করে জি-৭সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট ও অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেছে কানাডা। দেশটি হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে বলেও জানানো হয়।
কানাডা আরো জানিয়েছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপের উদ্যোগের অংশ হিসেবেও কানাডা কাজ করছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়। কানাডার দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। কানাডার দুই মন্ত্রী জানান, ২০১০ সাল থেকে দেশটি বিভিন্ন আইনের আওতায় ইরানের ৪৯২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং ইরানকে তার কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে চাপ দিতে কানাডা ভবিষ্যতেও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেবে। ইরান ও কানাডার মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের আগে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনাও বেড়েছে।
স্থানীয় সময় শনিবার ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী জানায়, তারা হরমুজ প্রণালিতে ‘অনুমোদনহীন পথে’ চলাচল করা তিনটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো তিনটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার কথাও জানায় তারা। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায় বলে দাবি করে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ে প্রচারিত এক বিবৃতিতে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলায় ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি বাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলা চালিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও সতর্ক করেছে। তারা জাহাজগুলোকে ইরানের ভাষায় ‘অনুমোদনহীন জলপথ’ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। ইরান ও কানাডার মধ্যে এই নতুন করে উত্তেজনা এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন চলছে। দুই দীর্ঘদিনের মিত্র দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার সরকার। একই সঙ্গে কানাডার শ্রমিক, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘সবচেয়ে বেশি সুযোগ নেওয়া দেশগুলোর একটি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। শুল্কের প্রভাব এড়াতে কানাডার কম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন ট্রাম্প।