Dhaka 4:28 am, Friday, 31 July 2026

ভালো প্রতিবেশী হতে চাইলে প্রয়োজন আস্থা, নয় সন্দেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 08:25:48 am, Thursday, 30 July 2026
  • / 15 Time View

কৃষকের জীবনের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—ভালো ফলনের জন্য শুধু পরিশ্রম নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা ও ধৈর্য। ধান কাটার মৌসুমে সফলতা আসে না; তার ভিত্তি তৈরি হয় অনেক আগেই। উন্নত বীজ নির্বাচন, জমির সঠিক পরিচর্যা এবং মাটির প্রতি যত্নশীল আচরণই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করে। আগাছায় ভরা জমি যেমন ভালো ফসল দেয় না, তেমনি অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাষ্ট্রের সম্পর্কও অনেকটা মানুষের সম্পর্কের মতো। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সময় লাগে। কখনো একটি প্রজন্ম, কখনো একাধিক প্রজন্মও লেগে যায়। কিন্তু একবার সেই বিশ্বাসে চিড় ধরলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে সন্দেহ ও অবিশ্বাস খুব দ্রুত জন্ম নেয় এবং ছড়িয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ ভারত ও বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বর্তমানের সিদ্ধান্তই দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণও জানান তিনি।

এসব পদক্ষেপকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো দুই দেশের মধ্যে নতুন আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না, যখন অতীতের জটিলতা অতিক্রম করে নতুন অধ্যায় শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বর্তমান সময়টি হয়তো তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার চেয়ে পরস্পরকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা ও অনুমানের মধ্যেই বেশি আবদ্ধ ছিল। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন, নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে অনেক সময় গুজব প্রকৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

দুই দেশেই এমন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, যারা অতীতের ক্ষতকে টিকিয়ে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। ফলে নেতাদের প্রতিটি বৈঠককে কখনো আত্মসমর্পণ, কখনো গোপন সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলে সেটিকে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আবার সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকেও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। এভাবে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসই যেন দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে প্রচলিত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এমন ভাষা হয়তো সংবাদ শিরোনাম তৈরি করতে পারে, সুস্থ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক নয়।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। এই স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। তাই অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির ওপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ভরশীল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বিশেষত্বও অনস্বীকার্য। অভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতা, অসংখ্য নদ-নদী, ভাষা-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতা, সাহিত্য এবং দীর্ঘ ইতিহাস দুই দেশকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। দেশভাগ বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করলেও স্মৃতি ও আত্মিক সম্পর্ক রয়ে গেছে অটুট। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে এই অঞ্চলের মানুষ বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যদি এক পক্ষ সারাক্ষণ অতীতের অবদান স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্য পক্ষ কেবল অভিযোগের তালিকা সামনে ধরে রাখে। ইতিহাস আমাদের আত্মবিশ্বাস দেয়, কিন্তু চিরস্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার দলিল নয়। অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের পথ দেখানোর জন্য, ভবিষ্যৎকে অতীতের বন্দিশালায় আটকে রাখার জন্য নয়।

বিশ্ব ইতিহাসে এমন পরিবর্তনের বহু উদাহরণ রয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যখন শার্ল দ্য গল ও কনরাড আদেনাউয়ার পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেন, তখন অনেকেই সেটিকে অবাস্তব মনে করেছিলেন। কিন্তু সেই সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

একইভাবে দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজে পেয়েছিল। তারা অতীতকে অস্বীকার করেনি, তবে ভবিষ্যৎকে অতীতের হাতে জিম্মিও হতে দেয়নি।

এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হওয়ার কারণেই সম্পর্ক উন্নত হয়নি; বরং নেতারা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও তেমন দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি সব বিষয়ে একমত হওয়ার মধ্যে নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতার মধ্যে নিহিত। এর অর্থ এই নয় যে, কঠিন কোনো বিষয় থাকবে না। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য কিংবা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নানা চ্যালেঞ্জ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ভবিষ্যতেও পরীক্ষা করবে। তবে পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয় সমস্যামুক্ত হওয়া নয়; বরং সমস্যা মোকাবিলায় তাদের প্রজ্ঞা, সংযম ও আত্মবিশ্বাসই প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনমতের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব হলো সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করা। যদি প্রতিটি সমঝোতাকে আত্মসমর্পণ এবং প্রতিটি সংলাপকে দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে কার্যকর কূটনীতির জন্য কোনো পরিসরই অবশিষ্ট থাকবে না।

বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের সামনে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। সেই ভিত্তি হবে না কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে; বরং সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে।

দুই দেশেরই এমন সম্পর্ক প্রয়োজন, যা কেবল আবেগনির্ভর নয়; বরং বাস্তবতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আজ ভারত ও বাংলাদেশের সামনে কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল সুযোগ উপস্থিত। এটি শুধু অতীতকে নতুনভাবে মূল্যায়নের নয়, বরং ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায় যৌথভাবে রচনারও সুযোগ। এর জন্য অতিরিক্ত আবেগ বা আত্মসমর্পণের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিজ নিজ সার্বভৌমত্বের প্রতি আস্থা, গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রতি বিশ্বাস এবং এই উপলব্ধি যে, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেও ভিন্ন অবস্থান থেকে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

বাংলার কৃষক জানেন, ফসল ঘরে তোলার অনেক আগেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বীজ বপনের মুহূর্তে। আজ ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও ঠিক সেই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

আজ যে বীজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সম্পর্ক তারই ফল বহন করবে। কারণ প্রাচীন প্রবাদটি আজও সমান সত্য—যেমন বুনবে, তেমনই ফল পাবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভালো প্রতিবেশী হতে চাইলে প্রয়োজন আস্থা, নয় সন্দেহ

Update Time : 08:25:48 am, Thursday, 30 July 2026

কৃষকের জীবনের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—ভালো ফলনের জন্য শুধু পরিশ্রম নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা ও ধৈর্য। ধান কাটার মৌসুমে সফলতা আসে না; তার ভিত্তি তৈরি হয় অনেক আগেই। উন্নত বীজ নির্বাচন, জমির সঠিক পরিচর্যা এবং মাটির প্রতি যত্নশীল আচরণই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করে। আগাছায় ভরা জমি যেমন ভালো ফসল দেয় না, তেমনি অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাষ্ট্রের সম্পর্কও অনেকটা মানুষের সম্পর্কের মতো। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সময় লাগে। কখনো একটি প্রজন্ম, কখনো একাধিক প্রজন্মও লেগে যায়। কিন্তু একবার সেই বিশ্বাসে চিড় ধরলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে সন্দেহ ও অবিশ্বাস খুব দ্রুত জন্ম নেয় এবং ছড়িয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ ভারত ও বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বর্তমানের সিদ্ধান্তই দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণও জানান তিনি।

এসব পদক্ষেপকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো দুই দেশের মধ্যে নতুন আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না, যখন অতীতের জটিলতা অতিক্রম করে নতুন অধ্যায় শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বর্তমান সময়টি হয়তো তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার চেয়ে পরস্পরকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা ও অনুমানের মধ্যেই বেশি আবদ্ধ ছিল। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন, নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে অনেক সময় গুজব প্রকৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

দুই দেশেই এমন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, যারা অতীতের ক্ষতকে টিকিয়ে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। ফলে নেতাদের প্রতিটি বৈঠককে কখনো আত্মসমর্পণ, কখনো গোপন সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলে সেটিকে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আবার সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকেও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। এভাবে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসই যেন দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে প্রচলিত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এমন ভাষা হয়তো সংবাদ শিরোনাম তৈরি করতে পারে, সুস্থ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক নয়।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। এই স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। তাই অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির ওপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ভরশীল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বিশেষত্বও অনস্বীকার্য। অভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতা, অসংখ্য নদ-নদী, ভাষা-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতা, সাহিত্য এবং দীর্ঘ ইতিহাস দুই দেশকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। দেশভাগ বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করলেও স্মৃতি ও আত্মিক সম্পর্ক রয়ে গেছে অটুট। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে এই অঞ্চলের মানুষ বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যদি এক পক্ষ সারাক্ষণ অতীতের অবদান স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্য পক্ষ কেবল অভিযোগের তালিকা সামনে ধরে রাখে। ইতিহাস আমাদের আত্মবিশ্বাস দেয়, কিন্তু চিরস্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার দলিল নয়। অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের পথ দেখানোর জন্য, ভবিষ্যৎকে অতীতের বন্দিশালায় আটকে রাখার জন্য নয়।

বিশ্ব ইতিহাসে এমন পরিবর্তনের বহু উদাহরণ রয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যখন শার্ল দ্য গল ও কনরাড আদেনাউয়ার পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেন, তখন অনেকেই সেটিকে অবাস্তব মনে করেছিলেন। কিন্তু সেই সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

একইভাবে দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজে পেয়েছিল। তারা অতীতকে অস্বীকার করেনি, তবে ভবিষ্যৎকে অতীতের হাতে জিম্মিও হতে দেয়নি।

এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হওয়ার কারণেই সম্পর্ক উন্নত হয়নি; বরং নেতারা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও তেমন দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি সব বিষয়ে একমত হওয়ার মধ্যে নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতার মধ্যে নিহিত। এর অর্থ এই নয় যে, কঠিন কোনো বিষয় থাকবে না। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য কিংবা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নানা চ্যালেঞ্জ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ভবিষ্যতেও পরীক্ষা করবে। তবে পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয় সমস্যামুক্ত হওয়া নয়; বরং সমস্যা মোকাবিলায় তাদের প্রজ্ঞা, সংযম ও আত্মবিশ্বাসই প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনমতের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব হলো সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করা। যদি প্রতিটি সমঝোতাকে আত্মসমর্পণ এবং প্রতিটি সংলাপকে দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে কার্যকর কূটনীতির জন্য কোনো পরিসরই অবশিষ্ট থাকবে না।

বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের সামনে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। সেই ভিত্তি হবে না কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে; বরং সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে।

দুই দেশেরই এমন সম্পর্ক প্রয়োজন, যা কেবল আবেগনির্ভর নয়; বরং বাস্তবতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আজ ভারত ও বাংলাদেশের সামনে কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি বিরল সুযোগ উপস্থিত। এটি শুধু অতীতকে নতুনভাবে মূল্যায়নের নয়, বরং ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায় যৌথভাবে রচনারও সুযোগ। এর জন্য অতিরিক্ত আবেগ বা আত্মসমর্পণের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিজ নিজ সার্বভৌমত্বের প্রতি আস্থা, গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রতি বিশ্বাস এবং এই উপলব্ধি যে, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেও ভিন্ন অবস্থান থেকে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

বাংলার কৃষক জানেন, ফসল ঘরে তোলার অনেক আগেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বীজ বপনের মুহূর্তে। আজ ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও ঠিক সেই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

আজ যে বীজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সম্পর্ক তারই ফল বহন করবে। কারণ প্রাচীন প্রবাদটি আজও সমান সত্য—যেমন বুনবে, তেমনই ফল পাবে।