Dhaka 9:38 am, Thursday, 16 April 2026

সরকার হোক নদী ও প্রকৃতিবান্ধব নদীকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 05:08:38 pm, Saturday, 21 February 2026
  • / 92 Time View

মুহাম্মদ মনির হোসেন:

নদী গবেষক ও পরিব্রাজক এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন।

বাংলাদেশ হলো এমন একটি ‘এক্টিভ ডেল্টা’ বা সক্রিয় বদ্বীপ, যেখানে প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ স্থপতি। বলা হয়, বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ড যার প্রতিটি ধূলিকণা নদীর পলি দিয়ে গঠিত। কারণ এ দেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে শত শত নদ-নদীর অবদান। হিমালয় থেকে নেমে আসা বিভিন্ন জলধারা এই সমতল ভূমিকে করেছে সজল, শস্য সুফলা ও উর্বর। তাই তো নদী এখানে কেবল ভূপ্রকৃতির অংশ নয়, এটি এ দেশের মানুষের জীবনপ্রবাহ।

এখানে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল বিশাল সব নদী আমাদের মানচিত্রের প্রধান কারিগর। নদীগুলোর জালিকা বিন্যাস এই ভূখণ্ডকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে আলাদা করেছে।
নদীর কাজ হলো পলি বহন করা এবং মাটিকে নতুন করে প্রাণদান করা। বর্ষায় নদী প্লাবন ভূমিকে যে পলির পুষ্টি দেয়, তা আমাদের কৃষির প্রধান শক্তি। এখানে কৃষকের লাঙল আর নদীর জল মিলেমিশেই অন্নের সংস্থান হয় কোটি কোটি মানুষের। আবার নদীর জোয়ার-ভাটা উপকূলীয় অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে নিরন্তর। সেইসঙ্গে নদীই আমাদের দিয়েছে জলপথের এমন এক সুবিধা, যা ব্যবহার করে প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে চলছে স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন। সে জন্যই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ দেশের বড় বড় শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র।

মাছ এ দেশের মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস, যা নদী থেকে আসে। হাজার হাজার জেলে পরিবার সরাসরি এই নদীমাতৃক প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে নদী এখানকার মানুষের সংস্কৃতি, গান এবং জীবনদর্শনের গভীরে মিশে আছে। ভাটিয়ালি আর মুর্শিদি গান নদীর ঢেউয়ের ছন্দেই প্রাণ খুঁজে পায়।

কিন্তু বর্তমান সময়ে নদীর এই বিশাল অবদান আমরা যেন অস্বীকার করতে শুরু করেছি। অপরিকল্পিত নগরায়ন আর শিল্পায়নের নামে নদীকে কাযত শ্বাসরোধ করে মারা হচ্ছে। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীর পানিকে তুলছে ব্যবহারের অযোগ্য। নদীর বুক দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা ও কলকারখানা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। নদী তার নাব্যতা হারাচ্ছে, ফলে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানির সংকট। আবার বর্ষাকালে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা তথা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। আর এই নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও নিঃস্ব হচ্ছে। পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা আরও ত্বরান্বিত করছে জলবায়ু পরিবর্তনকে। অথচ রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব রোধ করা সম্ভব। আবার দেশের মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নির্মল নদীপ্রাণ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ দাবি উঠেছে একটি ‘নদী ও প্রকৃতিবান্ধব’ সরকারের, যারা শাসনযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক অসতততা আর অস্বচ্ছতা মিলে গত ১৭ বছরে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি এক কঠিন প্রতিকূল অবস্থা পার করেছে। অবশেষে একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান আর নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ফের রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মতো একজন পরিবেশ কর্মী হিসেবেও এ সরকারের প্রতি প্রত্যাশা অনেক। তাহলে প্রশ্ন আসে, কেমন সরকার আমরা চাই। তার উত্তর দেওয়া যায় এক লাইনেই- চাই নদী ও প্রকৃতিবান্ধব সরকার।

নদীকে বাঁচাতে চাইলে সত্যিই একে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করতে হবে। দেশের স্বার্থ রক্ষা যেমন সরকারের প্রধান কর্তব্য। ফলে নদীকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করা হলে এটি রক্ষায় সরকারের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। যে কোন দখল, দূষণ তখন পরিগণিত হবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে।

এ প্রস্তাবকে অনেকে হঠকারী কিংবা অতিউৎসাহী মনে করতে পারেন। কিন্তু মাঠ পর্ায়ের বাস্তবতা অনুধাবন করলে বোঝা যায়, এর গুরুত্ব কতখানি। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’-এর স্বীকৃতি দিয়েছিল। অথচ আমরা দেখেছি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ক্ষীণ। একটি সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করা। কেবল অবকাঠামো নির্মাণই উন্নয়ন নয়; বরং সেই উন্নয়ন যদি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। বলা যায় প্রকৃতিবান্ধব সরকারের অভাবই আজ আমাদের নদীগুলোকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

তবু আমরা আশা হারাইনি। বাংলাদেশের প্রাণভোমরা নদীগুলোকে বাঁচাতে এখনো তাই দাবি করছি সমন্বিত সরকারি পরিকল্পনা এবং সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের। এখানে সরকারের নীতিগত অবস্থান থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ নদী যদি তার নাব্যতা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারায়, তবে এই ভূখণ্ডের কৃষি ও শিল্প উভয়ই মুখ থুবড়ে পড়বে। সে জন্য সরকারকে সবার আগে নদী রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো দেশের প্রতিটি নদীর ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা। নদীর সীমানা নির্ধারণে কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রভাব বা আপস কাম্য নয়। দখলদাররা যত শক্তিশালীই হোক, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। সময়ের দাবি মেনে প্রতিটি বাজেটে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় রাখতে হবে বিশেষ বরাদ্দ।

নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের নামে যেন কেবল বালু লুট না হয়, তা তদারকি করতে হবে কঠোরভাবে। প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে একটি ফোটা বিষাক্ত বর্জ্যও যেন নদীতে না মেশে। নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা প্রয়োজন। নদীর পাড়ে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে তৈরি করে জনগণকে নদীর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

নদী কমিশনকে শুধু সুপারিশকারী সংস্থা নয়, বরং বিচারিক ক্ষমতা সম্পন্ন সংস্থা করতে হবে। আন্তঃদেশীয় নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরকষাকষি করতে হবে জোরালোভাবে। উজান থেকে আসা পলি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব। ড্রেজিং থেকে প্রাপ্ত বালু ও মাটি দিয়ে নতুন ভূমি গঠনের পরিকল্পনাও নিতে হবে। গ্রাম ও শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন নদীকে দূষিত না করে, চাই সে মহাপরিকল্পনা। নৌপথ পুনরুজ্জীবিত করে পণ্য পরিবহনে খরচ কমিয়ে আনা এবং পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব। মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে নদীভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গঠন করা যেতে পারে। নদী ভাঙন কবলিত মানুষের পুনর্বাসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে। সরকারকে প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের সব জলাশয় ও খালগুলোকে নদীর সাথে পুনরায় সংযুক্ত করতে নিতে হবে বিশেষ পরিকল্পনা। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব কঠোরভাবে যাচাইও সরকারের কর্তব্য।

নদী রক্ষায় নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করাও একান্ত জরুরি। জনগণকে সচেতন করতে নিয়মিত নদী ও প্রকৃতি রক্ষার প্রচারণা চালাতে হবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে। সরকারের প্রতিটি স্তরে পরিবেশ ক্যাডার বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ভাবনায় জোর দিতে হবে সুনীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ ওপর। নদী শাসন নয় বরং নদীর স্বাভাবিক গতির সাথে সংগতি রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নদী দখলদারদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কেবল কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য এক বাস্তব ও চরম হুমকি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং হিমালয়ের বরফ গলার প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর অসময়ে বন্যা আমাদের উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে। এই মহাসংকট মোকাবিলায় একটি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে জয় করে একটি টেকসই ও স্থিতিস্থাপক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

একজন পরিবেশ কর্মী হিসেবে বলতে পারি, একটি নদী ও প্রকৃতিবান্ধব সরকারের প্রধান কাজ হবে জলবায়ু অর্থায়নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসা জলবায়ু তহবিলের অর্থ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মাঠপর্যায়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও বনায়নে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী ও আধুনিক বেষ্টনী তৈরি করাও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি কৃষি গবেষণায় জোর দিয়ে লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ফসল উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

নদীগুলোকে কেন্দ্র করে একটি মহাপরিকল্পনা বা ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ এর সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। নদী খনন ও নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যার প্রকোপ কমানো সম্ভব। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে। সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি গ্রহণ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্প দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে আমাদের বাস্তুসংস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করাও জরুরি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু উদ্বাস্তু বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে। নতুন সরকারকে এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী আবাসন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা এবং উন্নয়নকে একে অপরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।

নদীহীন উন্নয়ন টেকসই নয়। উন্নয়ন মানে অনেকেই কেবল ইট-পাথরের অট্টালিকা বা বিশাল চওড়া পিচঢালা রাস্তা বোঝেন হয়তো। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, যা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে নদীর স্পন্দনই হলো এ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই নদীকে মেরে ফেলে বা তার গতিপথ রুদ্ধ করে যে অবকাঠামো গড়া হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা দেখেছি, বিগত সরকারের সময়ে অনেক জায়গায় নদী ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বা কলকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

মনে রাখতে হবে, নদী না থাকলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যা ভবিষ্যতে তীব্র পানির সংকট তৈরি করে। আবার পানির অভাব দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শিল্পকারখানাও অচল হয়ে পড়ে। নদীহীন উন্নয়নে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। শহরাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া নদী ও খাল দখলেরই একটি অশুভ ফল। সে কারণেই উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি নদীকে পাশ কাটিয়ে করা হয়, তবে তা প্রকৃতির প্রতিশোধের মুখে পড়ে।

আধুনিক বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন, সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে নৌপথকে শক্তিশালী করাই হলো টেকসই উন্নয়নের লক্ষণ। বাংলাদেশ সরকারকেও এই সত্য অনুধাবন করতে হবে। তার মানে এই নয় যে সড়ক খাত উন্নত হবে না। কিন্তু সেটিও যেন করা হয় নিয়ম মেনে, পরিবেশগত সমীক্ষা শেষে। মনে রাখতে হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে নদী ও জলাশয় রক্ষা করা একটি প্রধান শর্ত। একটি নদীনির্ভর উন্নয়ন মডেলই পারে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধিশালী করে তুলতে।

পরিশেষে এতটুকুই বলতে পারি, বর্তমান প্রজন্মের দাবি অনুধাবন করুন। তারা সবাই বলছে, সরকার হোক প্রকৃতির পাহারাদার। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন। নদী দখলমুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা এবং পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প থেকে সরে আসাই হবে একটি কল্যাণকামী সরকারের পরিচয়। কারণ, নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, আর প্রকৃতি শান্ত থাকলে আমরাও শান্তিতে থাকতে পারব। আগামীর বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ, যেখানে উন্নয়ন আর পরিবেশ একে অপরের পরিপূরক হবে, প্রতিপক্ষ নয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সরকার হোক নদী ও প্রকৃতিবান্ধব নদীকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করুন

Update Time : 05:08:38 pm, Saturday, 21 February 2026

মুহাম্মদ মনির হোসেন:

নদী গবেষক ও পরিব্রাজক এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন।

বাংলাদেশ হলো এমন একটি ‘এক্টিভ ডেল্টা’ বা সক্রিয় বদ্বীপ, যেখানে প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ স্থপতি। বলা হয়, বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ড যার প্রতিটি ধূলিকণা নদীর পলি দিয়ে গঠিত। কারণ এ দেশের জন্ম ও বেড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে শত শত নদ-নদীর অবদান। হিমালয় থেকে নেমে আসা বিভিন্ন জলধারা এই সমতল ভূমিকে করেছে সজল, শস্য সুফলা ও উর্বর। তাই তো নদী এখানে কেবল ভূপ্রকৃতির অংশ নয়, এটি এ দেশের মানুষের জীবনপ্রবাহ।

এখানে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল বিশাল সব নদী আমাদের মানচিত্রের প্রধান কারিগর। নদীগুলোর জালিকা বিন্যাস এই ভূখণ্ডকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে আলাদা করেছে।
নদীর কাজ হলো পলি বহন করা এবং মাটিকে নতুন করে প্রাণদান করা। বর্ষায় নদী প্লাবন ভূমিকে যে পলির পুষ্টি দেয়, তা আমাদের কৃষির প্রধান শক্তি। এখানে কৃষকের লাঙল আর নদীর জল মিলেমিশেই অন্নের সংস্থান হয় কোটি কোটি মানুষের। আবার নদীর জোয়ার-ভাটা উপকূলীয় অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে নিরন্তর। সেইসঙ্গে নদীই আমাদের দিয়েছে জলপথের এমন এক সুবিধা, যা ব্যবহার করে প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে চলছে স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন। সে জন্যই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ দেশের বড় বড় শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র।

মাছ এ দেশের মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস, যা নদী থেকে আসে। হাজার হাজার জেলে পরিবার সরাসরি এই নদীমাতৃক প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে নদী এখানকার মানুষের সংস্কৃতি, গান এবং জীবনদর্শনের গভীরে মিশে আছে। ভাটিয়ালি আর মুর্শিদি গান নদীর ঢেউয়ের ছন্দেই প্রাণ খুঁজে পায়।

কিন্তু বর্তমান সময়ে নদীর এই বিশাল অবদান আমরা যেন অস্বীকার করতে শুরু করেছি। অপরিকল্পিত নগরায়ন আর শিল্পায়নের নামে নদীকে কাযত শ্বাসরোধ করে মারা হচ্ছে। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীর পানিকে তুলছে ব্যবহারের অযোগ্য। নদীর বুক দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা ও কলকারখানা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। নদী তার নাব্যতা হারাচ্ছে, ফলে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানির সংকট। আবার বর্ষাকালে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা তথা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। আর এই নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও নিঃস্ব হচ্ছে। পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতা আরও ত্বরান্বিত করছে জলবায়ু পরিবর্তনকে। অথচ রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব রোধ করা সম্ভব। আবার দেশের মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নির্মল নদীপ্রাণ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ দাবি উঠেছে একটি ‘নদী ও প্রকৃতিবান্ধব’ সরকারের, যারা শাসনযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক অসতততা আর অস্বচ্ছতা মিলে গত ১৭ বছরে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি এক কঠিন প্রতিকূল অবস্থা পার করেছে। অবশেষে একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান আর নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ফের রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মতো একজন পরিবেশ কর্মী হিসেবেও এ সরকারের প্রতি প্রত্যাশা অনেক। তাহলে প্রশ্ন আসে, কেমন সরকার আমরা চাই। তার উত্তর দেওয়া যায় এক লাইনেই- চাই নদী ও প্রকৃতিবান্ধব সরকার।

নদীকে বাঁচাতে চাইলে সত্যিই একে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করতে হবে। দেশের স্বার্থ রক্ষা যেমন সরকারের প্রধান কর্তব্য। ফলে নদীকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করা হলে এটি রক্ষায় সরকারের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। যে কোন দখল, দূষণ তখন পরিগণিত হবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে।

এ প্রস্তাবকে অনেকে হঠকারী কিংবা অতিউৎসাহী মনে করতে পারেন। কিন্তু মাঠ পর্ায়ের বাস্তবতা অনুধাবন করলে বোঝা যায়, এর গুরুত্ব কতখানি। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’-এর স্বীকৃতি দিয়েছিল। অথচ আমরা দেখেছি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ক্ষীণ। একটি সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করা। কেবল অবকাঠামো নির্মাণই উন্নয়ন নয়; বরং সেই উন্নয়ন যদি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। বলা যায় প্রকৃতিবান্ধব সরকারের অভাবই আজ আমাদের নদীগুলোকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

তবু আমরা আশা হারাইনি। বাংলাদেশের প্রাণভোমরা নদীগুলোকে বাঁচাতে এখনো তাই দাবি করছি সমন্বিত সরকারি পরিকল্পনা এবং সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের। এখানে সরকারের নীতিগত অবস্থান থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ নদী যদি তার নাব্যতা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারায়, তবে এই ভূখণ্ডের কৃষি ও শিল্প উভয়ই মুখ থুবড়ে পড়বে। সে জন্য সরকারকে সবার আগে নদী রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো দেশের প্রতিটি নদীর ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা। নদীর সীমানা নির্ধারণে কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রভাব বা আপস কাম্য নয়। দখলদাররা যত শক্তিশালীই হোক, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। সময়ের দাবি মেনে প্রতিটি বাজেটে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় রাখতে হবে বিশেষ বরাদ্দ।

নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের নামে যেন কেবল বালু লুট না হয়, তা তদারকি করতে হবে কঠোরভাবে। প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে একটি ফোটা বিষাক্ত বর্জ্যও যেন নদীতে না মেশে। নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা প্রয়োজন। নদীর পাড়ে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে তৈরি করে জনগণকে নদীর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

নদী কমিশনকে শুধু সুপারিশকারী সংস্থা নয়, বরং বিচারিক ক্ষমতা সম্পন্ন সংস্থা করতে হবে। আন্তঃদেশীয় নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরকষাকষি করতে হবে জোরালোভাবে। উজান থেকে আসা পলি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব। ড্রেজিং থেকে প্রাপ্ত বালু ও মাটি দিয়ে নতুন ভূমি গঠনের পরিকল্পনাও নিতে হবে। গ্রাম ও শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন নদীকে দূষিত না করে, চাই সে মহাপরিকল্পনা। নৌপথ পুনরুজ্জীবিত করে পণ্য পরিবহনে খরচ কমিয়ে আনা এবং পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব। মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে নদীভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গঠন করা যেতে পারে। নদী ভাঙন কবলিত মানুষের পুনর্বাসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে। সরকারকে প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের সব জলাশয় ও খালগুলোকে নদীর সাথে পুনরায় সংযুক্ত করতে নিতে হবে বিশেষ পরিকল্পনা। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব কঠোরভাবে যাচাইও সরকারের কর্তব্য।

নদী রক্ষায় নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করাও একান্ত জরুরি। জনগণকে সচেতন করতে নিয়মিত নদী ও প্রকৃতি রক্ষার প্রচারণা চালাতে হবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে। সরকারের প্রতিটি স্তরে পরিবেশ ক্যাডার বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ভাবনায় জোর দিতে হবে সুনীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ ওপর। নদী শাসন নয় বরং নদীর স্বাভাবিক গতির সাথে সংগতি রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নদী দখলদারদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কেবল কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য এক বাস্তব ও চরম হুমকি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং হিমালয়ের বরফ গলার প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর অসময়ে বন্যা আমাদের উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে। এই মহাসংকট মোকাবিলায় একটি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে জয় করে একটি টেকসই ও স্থিতিস্থাপক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

একজন পরিবেশ কর্মী হিসেবে বলতে পারি, একটি নদী ও প্রকৃতিবান্ধব সরকারের প্রধান কাজ হবে জলবায়ু অর্থায়নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসা জলবায়ু তহবিলের অর্থ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মাঠপর্যায়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও বনায়নে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী ও আধুনিক বেষ্টনী তৈরি করাও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি কৃষি গবেষণায় জোর দিয়ে লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ফসল উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

নদীগুলোকে কেন্দ্র করে একটি মহাপরিকল্পনা বা ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ এর সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। নদী খনন ও নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যার প্রকোপ কমানো সম্ভব। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে। সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি গ্রহণ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্প দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে আমাদের বাস্তুসংস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করাও জরুরি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু উদ্বাস্তু বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে। নতুন সরকারকে এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী আবাসন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা এবং উন্নয়নকে একে অপরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।

নদীহীন উন্নয়ন টেকসই নয়। উন্নয়ন মানে অনেকেই কেবল ইট-পাথরের অট্টালিকা বা বিশাল চওড়া পিচঢালা রাস্তা বোঝেন হয়তো। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, যা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে নদীর স্পন্দনই হলো এ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই নদীকে মেরে ফেলে বা তার গতিপথ রুদ্ধ করে যে অবকাঠামো গড়া হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা দেখেছি, বিগত সরকারের সময়ে অনেক জায়গায় নদী ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বা কলকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

মনে রাখতে হবে, নদী না থাকলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যা ভবিষ্যতে তীব্র পানির সংকট তৈরি করে। আবার পানির অভাব দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শিল্পকারখানাও অচল হয়ে পড়ে। নদীহীন উন্নয়নে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। শহরাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া নদী ও খাল দখলেরই একটি অশুভ ফল। সে কারণেই উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি নদীকে পাশ কাটিয়ে করা হয়, তবে তা প্রকৃতির প্রতিশোধের মুখে পড়ে।

আধুনিক বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন, সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে নৌপথকে শক্তিশালী করাই হলো টেকসই উন্নয়নের লক্ষণ। বাংলাদেশ সরকারকেও এই সত্য অনুধাবন করতে হবে। তার মানে এই নয় যে সড়ক খাত উন্নত হবে না। কিন্তু সেটিও যেন করা হয় নিয়ম মেনে, পরিবেশগত সমীক্ষা শেষে। মনে রাখতে হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে নদী ও জলাশয় রক্ষা করা একটি প্রধান শর্ত। একটি নদীনির্ভর উন্নয়ন মডেলই পারে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধিশালী করে তুলতে।

পরিশেষে এতটুকুই বলতে পারি, বর্তমান প্রজন্মের দাবি অনুধাবন করুন। তারা সবাই বলছে, সরকার হোক প্রকৃতির পাহারাদার। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন। নদী দখলমুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা এবং পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প থেকে সরে আসাই হবে একটি কল্যাণকামী সরকারের পরিচয়। কারণ, নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, আর প্রকৃতি শান্ত থাকলে আমরাও শান্তিতে থাকতে পারব। আগামীর বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ, যেখানে উন্নয়ন আর পরিবেশ একে অপরের পরিপূরক হবে, প্রতিপক্ষ নয়।