হাতি-গাধার মধ্যবর্তী লড়াইয়ে যেভাবে পাল্টাতে পারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি
- Update Time : 12:01:52 pm, Tuesday, 3 November 2026
- / 7 Time View
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আপাত দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ত দেশটির কেবলই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু এর বাইরেও এ নির্বাচনের প্রভাব যে আরও সুদূরপ্রসারী, তা স্বীকার করছেন সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে এ নির্বাচন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের অর্থনীতির মধ্যকার গভীর যোগসূত্রকেও যে জোরালভাবে সামনে এনেছে তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যে স্পষ্ট।
প্রশ্ন উঠেছে, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ব্যয়, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নানা বিতর্কিত মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্কে যে ক্ষতি হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচন সেসব ঠিকঠাক করতে কতটুকু ভূমিকা পালন করবে।
সাধারণত প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদকালের ঠিক মাঝপথে অর্থাৎ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট পদে থাকা না থাকা নির্ধারিত না হলেও, মার্কিন পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট) নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নির্ধারিত হয়। ফলে মধ্যবর্তী এ নির্বাচনকে বর্তমান প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর এক ধরনের গণভোট বা মূল্যায়নও বলা চলে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত ২৫ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে বলেছে, চিরাচরিতভাবে এবারও মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ‘হাতি’ ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের ‘গাধা’ প্রতিকের মধ্যে লড়াই হবে। এতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যারাই জিতুক, তা ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার ডেমোক্র্যাটদের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সেনেটেও জয়ী হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। আর তেমনটি হলে গত দুই বছর ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা একটু হলেও আলগা হয়ে ডেমোক্র্যাটদের কাছে ক্ষমতার কিছুটা অংশ এনে দেবে।
রয়টার্সের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ভবিষ্যতে বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যেমন-
ইরান যুদ্ধ লাগাম টানা : ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প; যা স্বাভাবিকভাবেই সেনেটর থেকে শুরু করে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
ট্রাম্প যেন অবিলম্বে লড়াই বন্ধ করেন সে জন্য ডেমোক্রেটরা বারবার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকানের সমর্থনে পাস হলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো করলে চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে ধারণা সবার। আর এ নির্বাচনকে তাই তেহরানও খুব গভীরভাবে পযর্বেক্ষণ করবে।
বলা হচ্ছে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমাতে পারেন : যাতে ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমতি নিতে বাধ্য হন। তারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতেও বাধ্য করতে পারেন।
ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা : রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করতে ইউক্রেনের প্রতি ব্যপক সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। অথচ ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইউক্রেনে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা স্থগিত রেখেছেন।
সম্প্রতি ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে এবং রাশিয়ান জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করেছেন; যা ক্ষুব্ধ করে তুলেছে কংগ্রেসের সদস্যদের; যাদের মধ্যে আবার অনেকেই তার দলেরও।
রয়টার্স বলছে, নভেম্বরে উভয় কক্ষে জয় লাভ করলে ডেমোক্র্যাটরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন কখন কোন বিষয়ে ভোট হবে। এটি তাদের ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদনের সুযোগ দিতে পারে। আর তেমনটি হলে, সম্ভবত কোনো সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা বাতিলের বিষয়টি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাস হয়ে যাবে। এছাড়া ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অন্যান্য কর্মকাণ্ডকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।
ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ : গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে কমেছে। ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা এবং রিপাবলিকানদের সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ জোটও এর কারণ ছিল। উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করতে পারে। চলমান অর্থবছরে ইসরায়েলে মার্কিন সহায়তা ছিল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। এটি অন্য যে কোনো দেশকে দেওয়া সহায়তার চেয়ে বেশি।
সামরিক ব্যয় সীমিত করা এবং বৈদেশিক সহায়তা পুনর্বহাল : ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সামরিক ব্যয় সীমিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ট্রাম্প এই বছর সামরিক বাজেট রেকর্ড ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে তার ব্যাপক কাটছাটের অজুহাত দেখিয়ে ডেমোক্রেটরা সিনেটে তা আটকে দেন।
ট্রাম্প কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তা আটকে রেখেছেন বা বাতিল করেছেন। অনেক ডেমোক্রেই এই ছাঁটাইয়ে ক্ষুব্ধ। স্বাভাবিকভাবেই তারা এই তহবিল পুনরায় চালু করার চেষ্টা করবেন।
এর ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটবে, যদি কংগ্রেস ও সেনেটে রিপাবলিকানরা আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে। তেমনটি হলে কি কি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে।
যেমন রিপাবলিকানরা পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে শক্তিশালী হলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমেই ট্রাম্প সামরিক বাজেট বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা শক্তি জোরদারে প্রতিরক্ষা বাজেট সর্বোচ্চ বৃদ্ধি করতে পারেন। কারণ রিপাবলিকানরা ঐতিহ্যগতভাবেই প্রতিরক্ষায় বেশি বরাদ্দের পক্ষে।
এছাড়া ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কঠোর অবস্থান ধরে রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কংগ্রেসে আইন অনুমোদন পাবে তারা।
একইভাবে ইউক্রেন ও অন্যান্য দেশে সংঘাতে মার্কিন অর্থায়নে কঠোর নজরদারি আসতে পারে। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় সরাসরি সরাসরি কাটছাট হতে পারে আর্থিক সাহায্য। কিং চরতে পারে কঠোর অডিট। কারণ রিপাবলিকানরা অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক বাজেটের তীব্র বিরোধী।
নিজস্ব করদাতাদের ওপর চাপ না ফেলে বাজেয়াপ্ত করা শত্রুপক্ষের সম্পত্তি (যেমন রাশিয়ান সম্পদ) থেকে অর্থ জোগানের নীতিও নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। আরও কঠোর হতে পারে অভিবাসন নীতি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও চীন সম্পর্কিত বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বহুপাক্ষিক বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় থাকা চুক্তির চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রাধাণ্য পাবে তাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। অর্থাৎ কঠোর হতে পারে সংরক্ষণবাদ ও নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা।




