শ্রমিক রপ্তানি থেকে কৌশলগত অংশীদারিতে যেতে চায় বাংলাদেশ-সৌদি আরব
- Update Time : 08:49:54 am, Saturday, 10 October 2026
- / 3 Time View
শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্সনির্ভর সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও ব্যাবসায়িক অংশীদারি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণে শিগগিরই দেশটি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে ‘কর্মশক্তি থেকে কৌশলগত অংশীদারি : বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের নতুন ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং ফরেন সার্ভিস একাডেমি যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক কেবল প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস, ইতিহাস, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কয়েক দশকে এই সম্পর্ক আরো বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের লাখ লাখ কর্মী সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখছেন।
তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি তাদের অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সম্পর্ক আরো গভীর করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে এখন বড় বিষয় হলো—এটিকে কত দূর এগিয়ে নেওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সম্ভাবনা আরো বিস্তৃত।
তাই শ্রমিকনির্ভর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে।
বিনিয়োগ তহবিল গঠনে আলোচনা
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। অন্যদিকে বাংলাদেশও অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ফলে দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ-সৌদি আরব সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় এসব খাতকে সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করতে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
বিনিয়োগ আকর্ষণে আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
তিনি আরো বলেন, বহু বছর পর বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট দিয়েছে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য শুধু পুঁজি আনা নয়; এমন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা করবে এবং দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াবে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের সুনাম রয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ভবিষ্যতে এই বাজারে আরো উন্নত ও বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন হবে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা, প্রকৌশল, সরবরাহব্যবস্থা, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত এবং সনদপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়বে।
তাই শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ ও পেশাদার কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য দুই দেশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সনদ সৌদি আরবের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে কর্মী, নিয়োগকর্তা ও উভয় দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।
প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ে সহযোগিতা
প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়কে দুই দেশের অংশীদারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌদি আরব প্রযুক্তি ও নতুন শিল্প খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কর্মশক্তি। এই দুই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে শুধু পণ্য ও শ্রমিক বিনিময় নয়, জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উদ্ভাবনেরও আদান-প্রদান বাড়াতে হবে।
যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। বন্দর, নৌপরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, বিমান চলাচল ও পণ্য সরবরাহের শৃঙ্খলে সহযোগিতার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ এই সম্ভাবনার ব্যাপ্তি তুলে ধরছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে কীভাবে সহযোগিতা বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা অগ্রাধিকার
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, শ্রমিক নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সৌদি আরবের সহযোগিতাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি কর্মীদের শুধু শ্রমের উৎস হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুই দেশের স্বার্থের মিল বাড়ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের অগ্রগতি শুধু কর্মী বা বাণিজ্যের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে। বেশি কর্মী পাঠানোর সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বও শক্তিশালী করতে হবে।
প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক বাংলাদেশ
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শক্তিশালী অংশীদারত্ব রয়েছে। প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে এবং দুই দেশের স্বার্থের মিল থাকলে বাংলাদেশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখবে। মুসলিম দেশগুলোর সেবা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিগগিরই সৌদি আরব সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরো উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের যুবরাজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশটি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তিনি শিগগিরই কোনো এক সময়ে সৌদি আরব সফরে যেতে পারেন।
একইভাবে সৌদি যুবরাজেরও বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, যুবরাজের সুবিধাজনক সময়ে তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না কিংবা সহায়তার ওপর নির্ভর করে এগোতে চায় না। বরং বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চায় দেশটি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, যে দেশ বিশ্বের কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে এখন দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিকনির্ভর সম্পর্ক থেকে মানবসম্পদ, রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগ এবং প্রচলিত সহযোগিতা থেকে উদ্ভাবননির্ভর অংশীদারত্বে যেতে হবে। দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর ও বিশেষ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে রূপ দিতে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে কাজ করবে বলেও জানান তিনি।









