ইথিওপিয়ার ৩ বিমানবন্দর দখল, আবার বড় যুদ্ধের শঙ্কা
- Update Time : 08:48:02 am, Thursday, 24 September 2026
- / 5 Time View
ইথিওপিয়ার উত্তরের তিগ্রে অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার আঞ্চলিক বাহিনী তিনটি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
একই সময়ে কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনার পর এই ঘটনা বড় ধরনের সামরিক অভিযানের শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানায় রয়টার্স।
নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) ও ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীর মধ্যে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো শান্তিচুক্তি ভেঙে পড়তে পারে। ওই যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল।
তিগ্রেতে নতুন করে সংঘাতের পাশাপাশি ইথিওপিয়া ও প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সম্পর্কও খারাপ হয়েছে। পাশের দেশ সুদানে চলছে গৃহযুদ্ধ। লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিয়েও ইথিওপিয়ার সঙ্গে ইরিত্রিয়ার বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে পড়ছে।
ফলে তিগ্রের নতুন সংঘাত শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রেতে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী প্রিটোরিয়ায় হওয়া চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হয়। ওই চুক্তি ‘প্রিটোরিয়া চুক্তি’ নামে পরিচিত। তবে চুক্তির পরও দুই পক্ষের মধ্যে পুরোপুরি আস্থা তৈরি হয়নি।
গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় সরকার ও টিপিএলএফ একে অপরের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। এর মধ্যে টিপিএলএফের ভেতরেও বিভেদ দেখা দেয়। পরে দলটির কট্টরপন্থী একটি অংশ আবার তিগ্রের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে সরিয়ে দেয়। সর্বশেষ টিপিএলএফ ইথিওপিয়ার আরো ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট করেছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে এমন কয়েকটি সংগঠনও রয়েছে, যারা আগের যুদ্ধে টিপিএলএফের বিরুদ্ধে লড়েছিল।
নতুন এই জোটের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো বলে জানানো হয়েছে। তবে বুধবারের সংঘর্ষে জোটের কতজন যোদ্ধা অংশ নিয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইথিওপিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ফলে তিগ্রের সংঘাত অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া এই জোটের সদস্যদের অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। তবে ইরিত্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তিগ্রেতে নতুন করে সংঘাতের পর ইরিত্রিয়ার ভূমিকার দিকে নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকরা। দেশটির রাজধানী আসমারা ইথিওপিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে জড়িত। ১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময় খারাপ হয়েছে। তবে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার পর দুই দশকের শত্রুতার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের জন্য ২০১৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ২০২০ সালে তিগ্রেতে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। ওই যুদ্ধে ইরিত্রিয়ার সেনারা ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীকে সহায়তা করে।
পরে প্রিটোরিয়া চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হলেও ইরিত্রিয়া ওই শান্তিচুক্তির পক্ষ ছিল না। যুদ্ধের পর ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক আবার খারাপ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হলো সমুদ্রে প্রবেশাধিকার। ইথিওপিয়া বর্তমানে স্থলবেষ্টিত দেশ। তবে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার আগে ইথিওপিয়ার সমুদ্র উপকূল ছিল। ইথিওপিয়া দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়া দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইরিত্রিয়ার আসাব বন্দরে প্রবেশের বিষয়টি ইথিওপিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ইরিত্রিয়ার আশঙ্কা, ইথিওপিয়া সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আসাব বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ইরিত্রিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী ও আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টিকে কেউ কেউ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থান ও লোহিত সাগরের উপকূলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। একই সঙ্গে এটিকে ইথিওপিয়াকে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে না জড়ানোর সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তিগ্রেতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি শুধু ইথিওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকেরা।
হর্ন অব আফ্রিকা এরই মধ্যে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেশী সুদানে গৃহযুদ্ধ চলছে। সোমালিয়াতেও দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা রয়েছে। নীল নদের পানি নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। এসব ঘটনার প্রভাব হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলোর ওপরও পড়ছে। ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে। আরএসএফ বর্তমানে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী চলমান সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইথিওপিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইথিওপিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই অঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে সহায়তা করছে। তবে আবুধাবি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সুদানের সম্পর্ক তুলনামূলক ঘনিষ্ঠ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরিত্রিয়া মিসরের সঙ্গেও সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করেছে। মিসর দীর্ঘদিন ধরে ইথিওপিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধে রয়েছে।
মিসর ও সুদানের সঙ্গে ইথিওপিয়ার আরেকটি বড় বিরোধ হলো নীল নদের পানি। ইথিওপিয়া নীল নদের একটি শাখা নদীর ওপর গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম বা জিইআরডি নির্মাণ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই বাঁধকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আদ্দিস আবাবা। অন্যদিকে মিসর ও সুদান মনে করে, বাঁধটির পানি ব্যবস্থাপনা তাদের পানির সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মিসরের জন্য নীল নদের পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।








