Dhaka 3:09 pm, Tuesday, 22 September 2026
সর্বশেষ
যেখানে জিয়া বলেছিলেন ‘আমরা নিশ্চিহ্ন হব না’, সেখানে এবার তারেক চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান গ্রেপ্তার এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন, সুষ্ঠু তদন্ত দাবি সুশান্তের সাবেক ম্যানেজারের রহস্যমৃত্যু, পুনঃতদন্তের নির্দেশ আদালতের জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক পদে ফের নিয়োগ পেলেন তানজিম ওয়াহাব সস্তায় ফ্ল্যাট কিনতে পারবে মানুষ : শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল রেললাইনে ‘শুয়ে ছিলেন’ তরুণী, ট্রেনে কাটা পড়ে গেল প্রাণ অভিভাবকদের আপত্তি গ্রাহ্য করেননি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা : আওয়ামী লীগ নেতাকে সভাপতি পদে মনোনয়নের সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশ্বনেতারা আলোড়িত হবেন : রাষ্ট্রদূত মুশফিক ৩ দাবি মানলে ঢাকা শহরে আর ককটেল ফুটবে না

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে গৃহহীন হাজারো ইয়েমেনি, আশ্রয় জিবুতির শরণার্থী শিবিরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 08:07:02 am, Tuesday, 22 September 2026
  • / 3 Time View

আকাশে যখন যুদ্ধবিমানের গর্জন শুরু হয়, ইয়েমেনের শহর ধুবাবের বাড়িঘর তখন থরথর করে কাঁপে। শিশুদের চিৎকার আর আতঙ্কের সেই শব্দই ৫০ বছর বয়সী ইব্রাহিম ইসাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল—ভিটেমাটি ছেড়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার।

ইব্রাহিম ইসা একা নন। ইয়েমেনের হুতি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের যুদ্ধ যখন সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার ইয়েমেনি পরিবার প্রাণ বাঁচাতে একই পথ বেছে নেয়। ইব্রাহিম নিজের মাছ ধরার বড় নৌকায় পরিবার ও গোটাকয়েক ছাগল চাপিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছেছেন আফ্রিকার দেশ জিবুতির ওবোক শহরের মারকাজি ক্যাম্পে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপমাত্রায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও জিবুতি সরকারের যৌথ পরিচালনায় চলা এই ক্যাম্পের খোলা গুদাম এবং তাঁবুর সারিতে ঠাঁই হয়েছে নতুন আসা হাজার হাজার মানুষের।

লোহিত সাগরে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়েই এই শিবিরে তিন হাজারের বেশি নতুন শরণার্থী এসে উঠেছেন। অন্যদিকে, পুরো ইয়েমেন জুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কিছুটা শিথিল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। দেশটির প্রধান প্রধান জনবহুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা উপকূল ধরে এগোতে থাকলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শত শত বিমান হামলা চালিয়ে তার জবাব দেয়।

এর বিপরীতে হুতিরাও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। 

কিন্তু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা সামরিক কৌশল নিয়ে ক্যাম্পের বাস্তুচ্যুত মানুষদের কোনো মাথাব্যথা নেই। ১০০ বছর বয়সী সাবেক জেলে কাসিম আব্রাহাম আবসি বলেন, ‘কারা হামলা করছে তা আমরা জানি না। পাহাড়, রাস্তা—সব জায়গায় বোমা পড়ছিল। সন্তানদের বাঁচাতেই আমাদের এই পলায়ন।

ক্যাম্পের চিত্রটি অভাব আর অনিশ্চয়তায় ভরা। কেউ হয়তো আসার সময় কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছেন, তবে অধিকাংশ পরিবারই এসে পৌঁছেছেন শূন্য হাতে, শুধু পরনের পোশাকটুকু সম্বল করে।

জিবুতি ভূরাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত দেশ—২০০৩ সাল থেকে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বহুজাতিক ঘাঁটি ‘ক্যাম্প লেমনিয়ার’ রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে চীনের আধুনিকায়িত সামরিক উপস্থিতি। তা সত্ত্বেও দেশটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইয়েমেন যুদ্ধে তারা জড়াবে না, কেবল মানবিক কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে। তবে জিবুতির এই আশ্রয় অনেকের জন্য বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এডেনের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আব্দুললারিম ২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরুর পরপরই এখানে এসেছিলেন। প্রায় এক দশক ধরে এই শিবিরের অনিশ্চিত জীবন দেখে তিনি স্পষ্ট অনুভব করেন নতুন আগতদের কষ্ট।

আন্তর্জাতিক বাজারের কাছে বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাবটিই প্রধান খবর হতে পারে, তবে এই প্রণালীর দুই পাড়ে যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। জীবন ধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা আর চরম গরমে দিন কাটলেও মারকাজি ক্যাম্পের বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো এখনই ফিরতে চান না। কাসিম আবসির স্ত্রী আয়েশা আব্দুলকাদির যেমন বলছিলেন, ‘দেশে শান্তি ফিরলে আমরা ফিরব। আমাদের শুধু শান্তি প্রয়োজন। আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য, তারপর খাদ্য, পানি ও শিক্ষার জন্য।’ যতদিন না ইয়েমেনের আকাশে বোমার গর্জন থামছে, ততদিন জিবুতির বালুকাময় প্রান্তরে পাতা এই প্লাস্টিকের ত্রিপল আর তাঁবুই ইব্রাহিম ইসাদের একমাত্র নিরাপদ ঠিকানা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে গৃহহীন হাজারো ইয়েমেনি, আশ্রয় জিবুতির শরণার্থী শিবিরে

Update Time : 08:07:02 am, Tuesday, 22 September 2026

আকাশে যখন যুদ্ধবিমানের গর্জন শুরু হয়, ইয়েমেনের শহর ধুবাবের বাড়িঘর তখন থরথর করে কাঁপে। শিশুদের চিৎকার আর আতঙ্কের সেই শব্দই ৫০ বছর বয়সী ইব্রাহিম ইসাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল—ভিটেমাটি ছেড়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার।

ইব্রাহিম ইসা একা নন। ইয়েমেনের হুতি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের যুদ্ধ যখন সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার ইয়েমেনি পরিবার প্রাণ বাঁচাতে একই পথ বেছে নেয়। ইব্রাহিম নিজের মাছ ধরার বড় নৌকায় পরিবার ও গোটাকয়েক ছাগল চাপিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছেছেন আফ্রিকার দেশ জিবুতির ওবোক শহরের মারকাজি ক্যাম্পে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপমাত্রায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও জিবুতি সরকারের যৌথ পরিচালনায় চলা এই ক্যাম্পের খোলা গুদাম এবং তাঁবুর সারিতে ঠাঁই হয়েছে নতুন আসা হাজার হাজার মানুষের।

লোহিত সাগরে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়েই এই শিবিরে তিন হাজারের বেশি নতুন শরণার্থী এসে উঠেছেন। অন্যদিকে, পুরো ইয়েমেন জুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কিছুটা শিথিল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। দেশটির প্রধান প্রধান জনবহুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা উপকূল ধরে এগোতে থাকলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শত শত বিমান হামলা চালিয়ে তার জবাব দেয়।

এর বিপরীতে হুতিরাও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। 

কিন্তু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা সামরিক কৌশল নিয়ে ক্যাম্পের বাস্তুচ্যুত মানুষদের কোনো মাথাব্যথা নেই। ১০০ বছর বয়সী সাবেক জেলে কাসিম আব্রাহাম আবসি বলেন, ‘কারা হামলা করছে তা আমরা জানি না। পাহাড়, রাস্তা—সব জায়গায় বোমা পড়ছিল। সন্তানদের বাঁচাতেই আমাদের এই পলায়ন।

ক্যাম্পের চিত্রটি অভাব আর অনিশ্চয়তায় ভরা। কেউ হয়তো আসার সময় কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছেন, তবে অধিকাংশ পরিবারই এসে পৌঁছেছেন শূন্য হাতে, শুধু পরনের পোশাকটুকু সম্বল করে।

জিবুতি ভূরাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত দেশ—২০০৩ সাল থেকে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বহুজাতিক ঘাঁটি ‘ক্যাম্প লেমনিয়ার’ রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে চীনের আধুনিকায়িত সামরিক উপস্থিতি। তা সত্ত্বেও দেশটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইয়েমেন যুদ্ধে তারা জড়াবে না, কেবল মানবিক কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে। তবে জিবুতির এই আশ্রয় অনেকের জন্য বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এডেনের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আব্দুললারিম ২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরুর পরপরই এখানে এসেছিলেন। প্রায় এক দশক ধরে এই শিবিরের অনিশ্চিত জীবন দেখে তিনি স্পষ্ট অনুভব করেন নতুন আগতদের কষ্ট।

আন্তর্জাতিক বাজারের কাছে বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাবটিই প্রধান খবর হতে পারে, তবে এই প্রণালীর দুই পাড়ে যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। জীবন ধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা আর চরম গরমে দিন কাটলেও মারকাজি ক্যাম্পের বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো এখনই ফিরতে চান না। কাসিম আবসির স্ত্রী আয়েশা আব্দুলকাদির যেমন বলছিলেন, ‘দেশে শান্তি ফিরলে আমরা ফিরব। আমাদের শুধু শান্তি প্রয়োজন। আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য, তারপর খাদ্য, পানি ও শিক্ষার জন্য।’ যতদিন না ইয়েমেনের আকাশে বোমার গর্জন থামছে, ততদিন জিবুতির বালুকাময় প্রান্তরে পাতা এই প্লাস্টিকের ত্রিপল আর তাঁবুই ইব্রাহিম ইসাদের একমাত্র নিরাপদ ঠিকানা।