Dhaka 9:50 am, Monday, 19 October 2026
সর্বশেষ
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যপথ বন্ধ করল পাকিস্তান, বড় সংকটের শঙ্কা হরিনারায়ণপুর বাজারে জনদুর্ভোগ চরমে,নেই সিসি ক্যামেরা , দুর্বল ড্রেনেজ, সড়ক দখলে যানজট মালয়েশিয়ায় ২৮৭ দিনে বাংলাদেশীসহ আটক ৬৫ হাজার জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে আনিসুল-ইনুসহ ৪ জন ঢাকার আকাশে দরজা খুলে গেল ভারতীয় ফ্লাইটের, জরুরি অবতরণ বিএমইউতে ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ২০ বছরের পুরনো বাস চলতে না দিলে ১ নভেম্বর থেকে ধর্মঘট নাটোরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার

দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ বরিশাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 12:37:51 pm, Tuesday, 15 September 2026
  • / 28 Time View

একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ আর নদী-খালের সৌন্দর্যে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে পরিচিত ছিল বরিশাল। বন্দরে দূর-দূরান্তের বণিকদের আনাগোনা ছিল।

সেই বরিশাল এখন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ। কৃষি উৎপাদন কমেছে, গড়ে ওঠেনি শিল্প-কারখানা, তৈরি হয়নি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। গ্যাসের বড় মজুদ থাকার পরও কাজে লাগানো যায়নি সেই সম্পদ। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগে এ হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের আট বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। একসময় দেশের দরিদ্রতম বিভাগ রংপুর হলেও এখন সেই অবস্থানে বরিশাল। 
কর্মসংস্থানের অভাবে এ অঞ্চলের মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে।

জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, বরিশালের স্থানীয় বাসিন্দাদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ এখন ঢাকায় বসবাস করছে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিবাসীর প্রায় ১৩ শতাংশ বরিশালের। 

বরিশালকে একসময় শস্যভাণ্ডার বলা হলেও ধান উৎপাদনে এখন পিছিয়ে পড়ছে বিভাগটি। বিবিএসের ইয়ারবুক অব অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৫ অনুযায়ী, আউশ উৎপাদনে বরিশাল চতুর্থ, আমনে পঞ্চম এবং বোরো উৎপাদনে অষ্টম।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিভাগটিতে আউশ উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার ২০ টন।

পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯৯ টনে। আমন উৎপাদনও ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৯ টন থেকে কমে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ টনে নেমেছে। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরিশাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষক বিকল্প হিসেবে চিংড়ি চাষসহ অন্য কাজে যাচ্ছেন।

মৎস্যসম্পদেও একই চিত্র। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার টন। তিন বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিবিএসের ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ধান, গম ও শস্য উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ভোলায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ সম্পদকে ঘিরে বড় শিল্পায়ন হয়নি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে শিল্প-কারখানা কার্যত সীমিত। বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরিশাল ছাড়া বাকি পাঁচ জেলায় উল্লেখযোগ্য কলকারখানা নেই। বরিশাল জেলায় কারখানা রয়েছে ৪০৯টি, যেখানে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক।

বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, যে ধরনের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কৃষি ও মৎস্যকে ঘিরে আগের অর্থনৈতিক তৎপরতাও কমেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে।

স্থানীয় রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিল্পায়নের অভাব বরিশালের অর্থনৈতিক বিকাশে বড় বাধা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বড় রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। পুরো অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।

তবে পরিস্থিতি বদলাতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ভোলাকে মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা এবং দুর্গম যোগাযোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠেনি। ভোলার গ্যাসের সঠিক ব্যবহার, পায়রা বন্দর সচল, কুয়াকাটায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক কাঠামো দ্রুত বদলে যেতে পারে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ বরিশাল

Update Time : 12:37:51 pm, Tuesday, 15 September 2026

একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ আর নদী-খালের সৌন্দর্যে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে পরিচিত ছিল বরিশাল। বন্দরে দূর-দূরান্তের বণিকদের আনাগোনা ছিল।

সেই বরিশাল এখন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ। কৃষি উৎপাদন কমেছে, গড়ে ওঠেনি শিল্প-কারখানা, তৈরি হয়নি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। গ্যাসের বড় মজুদ থাকার পরও কাজে লাগানো যায়নি সেই সম্পদ। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগে এ হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের আট বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। একসময় দেশের দরিদ্রতম বিভাগ রংপুর হলেও এখন সেই অবস্থানে বরিশাল। 
কর্মসংস্থানের অভাবে এ অঞ্চলের মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে।

জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, বরিশালের স্থানীয় বাসিন্দাদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ এখন ঢাকায় বসবাস করছে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিবাসীর প্রায় ১৩ শতাংশ বরিশালের। 

বরিশালকে একসময় শস্যভাণ্ডার বলা হলেও ধান উৎপাদনে এখন পিছিয়ে পড়ছে বিভাগটি। বিবিএসের ইয়ারবুক অব অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৫ অনুযায়ী, আউশ উৎপাদনে বরিশাল চতুর্থ, আমনে পঞ্চম এবং বোরো উৎপাদনে অষ্টম।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিভাগটিতে আউশ উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার ২০ টন।

পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯৯ টনে। আমন উৎপাদনও ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৯ টন থেকে কমে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ টনে নেমেছে। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরিশাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষক বিকল্প হিসেবে চিংড়ি চাষসহ অন্য কাজে যাচ্ছেন।

মৎস্যসম্পদেও একই চিত্র। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার টন। তিন বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিবিএসের ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ধান, গম ও শস্য উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ভোলায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ সম্পদকে ঘিরে বড় শিল্পায়ন হয়নি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে শিল্প-কারখানা কার্যত সীমিত। বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরিশাল ছাড়া বাকি পাঁচ জেলায় উল্লেখযোগ্য কলকারখানা নেই। বরিশাল জেলায় কারখানা রয়েছে ৪০৯টি, যেখানে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক।

বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, যে ধরনের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কৃষি ও মৎস্যকে ঘিরে আগের অর্থনৈতিক তৎপরতাও কমেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে।

স্থানীয় রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিল্পায়নের অভাব বরিশালের অর্থনৈতিক বিকাশে বড় বাধা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বড় রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। পুরো অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।

তবে পরিস্থিতি বদলাতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ভোলাকে মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা এবং দুর্গম যোগাযোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠেনি। ভোলার গ্যাসের সঠিক ব্যবহার, পায়রা বন্দর সচল, কুয়াকাটায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক কাঠামো দ্রুত বদলে যেতে পারে।