Dhaka 7:34 pm, Monday, 14 September 2026

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে—আশা পেজেশকিয়ানের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 06:29:17 am, Saturday, 12 September 2026
  • / 16 Time View

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শুক্রবারের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও ইরানের সহযোগিতা আরো বাড়ানো সম্ভব জানিয়েছে এএনআই।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে ভারতের ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান। এর আগে একই দিন ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ভারতে পৌঁছান। অনুবাদকের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে।

এসব আলোচনা ও সম্পর্কের মাধ্যমে সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পেজেশকিয়ান বলেন, ভারত ও ইরান চাইলে একসঙ্গে কাজ করে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। 

বক্তব্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দুই দেশের তীব্র সমালোচনা করেন।

পেজেশকিয়ানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে চায়। তবে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো হলে দেশটি পাল্টা জবাব দেবে। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান একই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। তার দাবি, ভয় দেখিয়ে ইরানকে নত করা যাবে না।

তিনি বলেন, ইরান কখনো তাদের সামনে মাথা নত করবে না এবং চাপ দেওয়া হলে পাল্টা জবাব দেবে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগও তোলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, যারা নিজেদের মানবাধিকারের পক্ষে বলে দাবি করে, তারাই আসলে মানুষ হত্যা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানে স্কুলশিশু, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। স্কুল ও হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো দেশ যদি সত্যিই সাহসী হয়, তাহলে তাদের শুধু সেনা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে লড়াই করা উচিত। বেসামরিক অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকার ওপর হামলা কেন করা হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ইরানের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, তার দেশ মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। পৃথিবীর সব মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন পেজেশকিয়ান। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতা বৈঠক করেছিলেন। শুক্রবারের বৈঠকে ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি ব্রিকসের বিভিন্ন বৈঠকে ইরানের নিয়মিত ও উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণের জন্য পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান। চলমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান ব্রিকসের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মোদি বলেন, বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, নতুন চিন্তা, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের মনোভাব গড়ে তুলতে ব্রিকসের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রিকস ব্যবসা ফোরামের নেতাদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতা মতবিনিময় করেন। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিষয়ে ভারতের অবস্থানও বৈঠকে তুলে ধরেন মোদি। তিনি আবারও বলেন, আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর সমাধান আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে করতে হবে। মোদি বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সমুদ্রপথে চলাচলকারী নাবিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ব্রিকসসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংগঠনে ভারত ও ইরানের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টিকেও স্বাগত জানান মোদি। দুই নেতার সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠক থেকে স্পষ্ট যে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মধ্যেও ভারত ও ইরান তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। তবে একই সময়ে ভারত পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ক্ষেত্রে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ফলে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও সংঘাতে কোনো পক্ষের সরাসরি অবস্থান না নেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে নয়াদিল্লি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে—আশা পেজেশকিয়ানের

Update Time : 06:29:17 am, Saturday, 12 September 2026

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শুক্রবারের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও ইরানের সহযোগিতা আরো বাড়ানো সম্ভব জানিয়েছে এএনআই।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে ভারতের ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান। এর আগে একই দিন ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ভারতে পৌঁছান। অনুবাদকের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দুই দেশের নেতাদের মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে।

এসব আলোচনা ও সম্পর্কের মাধ্যমে সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পেজেশকিয়ান বলেন, ভারত ও ইরান চাইলে একসঙ্গে কাজ করে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। 

বক্তব্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দুই দেশের তীব্র সমালোচনা করেন।

পেজেশকিয়ানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে চায়। তবে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো হলে দেশটি পাল্টা জবাব দেবে। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান একই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। তার দাবি, ভয় দেখিয়ে ইরানকে নত করা যাবে না।

তিনি বলেন, ইরান কখনো তাদের সামনে মাথা নত করবে না এবং চাপ দেওয়া হলে পাল্টা জবাব দেবে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগও তোলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, যারা নিজেদের মানবাধিকারের পক্ষে বলে দাবি করে, তারাই আসলে মানুষ হত্যা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানে স্কুলশিশু, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। স্কুল ও হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো দেশ যদি সত্যিই সাহসী হয়, তাহলে তাদের শুধু সেনা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে লড়াই করা উচিত। বেসামরিক অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকার ওপর হামলা কেন করা হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ইরানের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, তার দেশ মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। পৃথিবীর সব মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন পেজেশকিয়ান। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতা বৈঠক করেছিলেন। শুক্রবারের বৈঠকে ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি ব্রিকসের বিভিন্ন বৈঠকে ইরানের নিয়মিত ও উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণের জন্য পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান। চলমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান ব্রিকসের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মোদি বলেন, বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, নতুন চিন্তা, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের মনোভাব গড়ে তুলতে ব্রিকসের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রিকস ব্যবসা ফোরামের নেতাদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতা মতবিনিময় করেন। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিষয়ে ভারতের অবস্থানও বৈঠকে তুলে ধরেন মোদি। তিনি আবারও বলেন, আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর সমাধান আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে করতে হবে। মোদি বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সমুদ্রপথে চলাচলকারী নাবিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ব্রিকসসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংগঠনে ভারত ও ইরানের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টিকেও স্বাগত জানান মোদি। দুই নেতার সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠক থেকে স্পষ্ট যে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মধ্যেও ভারত ও ইরান তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। তবে একই সময়ে ভারত পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ক্ষেত্রে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ফলে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও সংঘাতে কোনো পক্ষের সরাসরি অবস্থান না নেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে নয়াদিল্লি।