সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসনই প্রধান লক্ষ্য
- Update Time : 01:56:58 am, Tuesday, 1 September 2026
- / 3 Time View
দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের (বিএইচবিএফসি) প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নূর আলম সরদার। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসনের চাহিদা মেটাতে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বিএইচবিএফসি।
এ সময়ে প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত এমডি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
সাশ্রয়ী সুদে গৃহঋণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে আরো ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নূর আলম সরদার বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য বিএইচবিএফসিকে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
বর্তমানে ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণের জন্য ‘নগরবন্ধু’ ও ‘পল্লীমা’সহ মোট ১২ ধরনের ঋণসেবা দিচ্ছে বিএইচবিএফসি। এর মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাট ঋণ, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের আবাসন ঋণ। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ‘স্বপ্ননীড়’ নামে একটি ঋণপণ্য চালু করা হয়েছে।
নূর আলম সরদারের ভাষ্য, তুলনামূলক কম কিস্তিতে গ্রাহকরা এই ঋণ নিতে পারবেন।
ডেভেলপারদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বড় আবাসন প্রকল্পে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। বিএইচবিএফসির প্রধান লক্ষ্য সরাসরি প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া। তবে পল্লী ও শহরতলি এলাকায় আবাসন সুবিধা বাড়াতে ‘Rural and Peri-Urban Housing Finance Project’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আওতায় প্রায় ১৭ হাজার আবাসন ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ উপকৃত হবে বলে জানান তিনি।
বিএইচবিএফসির তহবিলের প্রধান উৎস চারটি-পরিশোধিত মূলধন, সরকারি ঋণ, সরকারি আমানত ও ডিবেঞ্চার বিক্রি। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে নূর আলম সরদার জানান, বাড়ানো মূলধনের মধ্যে এখনো ৩৮৫ কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বাকি রয়েছে।
ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৯২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি এবং তৃতীয় পর্যায়ে আরো প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী ঋণ, স্বপ্ননীড় ও কৃষক আবাসন ঋণের জন্য সরকারের কাছে আরো ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
নূর আলম সরদার বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী ৩ থেকে ৫ বছরে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’
এদিকে বাজারে নির্মাণসামগ্রী ও জমির দাম বাড়ায় গৃহঋণের সুদহার কমানোর কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানান বিএইচবিএফসির ভারপ্রাপ্ত এমডি। তার দাবি, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সর্বনিম্ন সুদহারে গৃহঋণ দিচ্ছে। তবে গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব নতুন ঋণপণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণে ‘গ্রিন রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং মডেল’ তৈরির কাজও চলছে বলে জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির ও ঘুষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নূর আলম সরদার বলেন, জমির মালিকানা ও কাগজপত্র নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তির বিষয়টি অনেক সময় বিএইচবিএফসির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা থাকে না। তার দাবি, ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়া এবং জমি ও ভবন জামানত হিসেবে থাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও সীমিত।
তিনি বলেন, ‘ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে আমরা বরাবরের মতোই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে আসছি।’ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ বক্স, গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম (জিআরএস) এবং সেন্ট্রাল ডিসিপ্লিনারি কমিটি রয়েছে বলেও জানান তিনি। বিএইচবিএফসিতে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেও কাজ শেষ হয় বলে জানান এমডি। তবে ঋণ মঞ্জুরির চূড়ান্ত ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাতে থাকায় পুরো প্রক্রিয়ায় ২০ থেকে ৩০ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি। এ প্রক্রিয়া আরো সহজ করতে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল সেবার দিকে যাচ্ছে।
অপরদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিএইচবিএফসির শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩ দশমিক ২১ শতাংশ বলে জানিয়েছেন নূর আলম সরদার। তার দাবি, দেশের সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি সর্বনিম্ন।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএইচবিএফসি কোনো ঋণ রাইট-অফ করেনি এবং সুদও মওকুফ করেনি। খেলাপি ঋণ আদায়ে আদালতের বাইরে ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি। শ্রেণিকৃত ঋণের হার আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলেও যোগ করেন নূর আলম সরদার।