দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের মাঝে আটকা পড়েছে
- Update Time : 09:57:48 am, Wednesday, 9 September 2026
- / 2 Time View
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে দক্ষিণ কোরিয়া সামরিকভাবে জড়ালে দেশটিকে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধে সহায়তা করার বিষয়টি বিবেচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া।
এই অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ৬৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান এই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় বলেও জানান তিনি।
তবে বাঘাই সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া যোগ দিলে তার পরিণতি দেশটিকে ভোগ করতে হবে।
তিনি দাবি করেন, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধ থেকে আত্মরক্ষা করছে। তিনি আরো বলেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি বা সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণকে ইরান ‘আগ্রাসনকারীর প্রতি সরাসরি সমর্থন’ হিসেবে বিবেচনা করবে। এ ধরনের পদক্ষেপের ‘গুরুতর পরিণতি’ হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ইরানের এই বক্তব্যের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এখনো সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে এখনো বিস্তারিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি সিউল বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। এই পথে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া কেন জড়িত?
ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে সীমিত সহায়তা চেয়েছিলেন ট্রাম্প। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি বিষয়টি প্রকাশ করেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতা ১৭ মে ফোনে কথা বলেছিলেন। ট্রাম্পের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে বলেছিল, ‘না, ধন্যবাদ।’ তবে এরপর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন হয়ে ওঠে।
১৬ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার ঠিক আগের সন্ধ্যায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মহড়াটি উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট করা হবে।‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ বা ইউএফএস মহড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা। সাধারণত ১১ দিনের বেশি সময় ধরে চলা এই মহড়া এবার কমিয়ে পাঁচ দিনে আনা হয়।
ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ অ্যাকাউন্টে দাবি করেন, এসব মহড়া ব্যয়বহুল এবং এগুলো উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ বার্তা পাঠায়। তিনি জানান, কিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন তিনি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সংসদে বলেন, মহড়া কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেয়নি।
ট্রাম্প আরো প্রশ্ন তোলেন, কোরীয় উপদ্বীপে যখন হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করবে। এর পাশাপাশি, সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা আরেকটি যৌথ সামরিক মহড়াও যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে জুনেই একটি বিজ্ঞপ্তি পেয়েছিল। ওয়াশিংটন তখন মহড়া বাতিলের কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের কারণে তৈরি সামরিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিল।
দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং একজন উদারপন্থী নেতা। তিনি উত্তেজনা কমিয়ে প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্রে নমনীয় নীতি গ্রহণের পক্ষে। তাই ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না গিয়ে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। এর আগে প্রেসিডেন্ট লির দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘অর্থপূর্ণ সংলাপ’ চালিয়ে যেতে চায়।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ সোমবার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন সিউলের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা ইয়োনহাপকে জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সামরিকভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়টি সিউল বিবেচনা করছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপে যেন দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই হবে প্রধান শর্ত।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া বেশ কয়েকটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য মিত্র দেশের সঙ্গে অসামরিক ও অনুসন্ধান-উদ্ধারকারী বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও রয়েছে। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল পর্যালোচনা শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ দল এবং চালকবিহীন মাইন শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ জনপ্রিয় নয়। দেশটির বিরোধী দল সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করেছে। প্রেসিডেন্ট লির ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর থেকেও কেউ কেউ সেনা পাঠানোর বিরোধিতা করেছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক নাগরিকও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ করেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে থেকেও ইরান ইস্যুতে সামরিকভাবে কতটা জড়াবে, তা নিয়ে সিউলের সামনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কের ইতিহাস কী?
১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধের সময় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেয় ওয়াশিংটন। যুদ্ধের পর করা চুক্তির আওতায় কোরীয় উপদ্বীপে এখনো প্রায় ২৯ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করতে দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আসছে।
এর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়াও বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ইরাক যুদ্ধসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ নিয়েছে। দেশটি ন্যাটোর সদস্য না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। সিউল পাল্টা ব্যবস্থা না নিয়ে আলোচনার পথ বেছে নেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করে।
একই বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে একটি হুন্দাই কারখানায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিইর অভিযানে শত শত দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর অক্টোবরে ট্রাম্প ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে দক্ষিণ কোরিয়া যান। চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট লিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। একই সঙ্গে লি জে মিয়ং যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে আবারও সংলাপ শুরু করার চেষ্টা করছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ কোরিয়াও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এসব তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশটিতে পৌঁছায়। যুদ্ধের কারণে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে দেশটির অর্থনীতিতেও। যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ওন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এ কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশটির জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী, দেশের সামরিক বাহিনী বিদেশে মোতায়েন করতে হলে সরকারের সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে ক্ষমতাসীন দলেরই কিছু সদস্য সম্ভাব্য সামরিক মোতায়েনের বিরোধিতা করতে পারেন। ফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এখন বড় একটি কঠিন প্রশ্ন, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় হরমুজ প্রণালিতে কতটা ভূমিকা নেবে। এ ছাড়া কীভাবে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াবে।