বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সেন্টমার্টিনের জেলে পরিবার
- Update Time : 10:37:26 am, Thursday, 16 April 2026
- / 28 Time View
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন দ্বীপে একযোগে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন বন্ধের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জীবিকার প্রধান দুই উৎস একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দ্বীপজুড়ে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ (মধ্যরাত) থেকে ১১ জুন ২০২৬ (মধ্যরাত) পর্যন্ত মোট ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় ট্রলার, নৌকা কিংবা যে কোনো ধরনের জাল ব্যবহার করে মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। মূলত মাছের প্রজনন নিশ্চিত করা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং টেকসই মৎস্য উৎপাদন বজায় রাখার লক্ষ্যেই প্রতিবছরের মতো এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ৯ মাসের জন্য পর্যটন কার্যক্রমও সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে জেলে ও পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা একযোগে আয়ের উৎস হারিয়ে পড়েছেন সংকটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ১১ হাজার মানুষের বসবাস এবং প্রায় ৪ হাজার ১০০ জন ভোটার রয়েছেন। এদের বড় একটি অংশ সরাসরি মাছ ধরা ও পর্যটননির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত।
মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের অনেকেই এখন কর্মহীন। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। জাল-নৌকা পড়ে আছে ঘাটে, অথচ ঘরে নেই প্রয়োজনীয় খাবার। অনেক পরিবার ঋণ করে দিন পার করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়ার জেলে সোলায়মান মিয়া বলেন, “সমুদ্রে যেতে পারছি না, মাছ ধরতে পারছি না। ঘরে আয়-রোজগার একেবারে বন্ধ। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি। সরকারের যে সহায়তা পাই, তা দিয়ে পুরো মাস চলা সম্ভব হয় না। আমাদের জন্য আরও সহায়তা দরকার।”
তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য কিছু সহায়তা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে চাল বিতরণ
কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা বা নগদ ভাতা
বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ (সীমিত পরিসরে)
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অনেক জেলে তালিকার বাইরে থেকে যায়।
এদিকে, পর্যটক না থাকায় দ্বীপের হোটেল-রেস্টুরেন্ট, গাইড, পরিবহনকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সব খাত প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। একসময় পর্যটকের কোলাহলে মুখর থাকা দ্বীপ এখন অনেকটাই নীরব।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও ছাত্রনেতা জয়নাল আবেদীন বলেন, “একদিকে মাছ ধরা বন্ধ, অন্যদিকে পর্যটক নেই—আমরা দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সরকার পরিবেশ রক্ষার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা আমরা বুঝি। কিন্তু আমাদের বাঁচার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। সহায়তা বাড়ানো জরুরি, না হলে অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে দ্বীপবাসীর জীবিকা টিকিয়ে রাখতে কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ভর্তুকি এবং স্বচ্ছ সহায়তা বণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই পর্যটন ও মৎস্য ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা সম্ভব হবে, অন্যদিকে দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
বর্তমানে সেন্টমার্টিনে জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা দ্বীপবাসীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসকাগজ/আরডি























