১৪ বছরে সর্বনিম্নে স্মার্টফোন সরবরাহ, কমেছে ২০ শতাংশ
- Update Time : 12:16:07 pm, Saturday, 17 October 2026
- / 5 Time View
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে স্মার্টফোন কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেক ক্রেতা। এর মধ্যে মেমোরি চিপ ও প্রসেসরের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
ফলে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের বাজারে তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী সংকট। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। ১৪ বছরের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন সরবরাহ।
বিশ্ববাজারের এ মন্দার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও।
উৎপাদন কমার পাশাপাশি স্মার্টফোনের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা নতুন ফোন কেনা থেকে বিরত থাকছেন। এতে বিক্রি কমে চাপে পড়েছেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা। একই চিত্র টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, গাড়ি ও প্রসাধনসামগ্রীর বাজারেও। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয় বাড়ার সীমিত সুযোগে মানুষের অতিরিক্ত খরচের সামর্থ্য কমেছে।
ফলে বিলাসপণ্য ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল পণ্যের চাহিদা সংকুচিত হচ্ছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, মেমোরি চিপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম বাড়ায় স্মার্টফোন উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে সাশ্রয়ী মূল্যের ফোন বাজারে সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন নির্মাতারা। কাউন্টারপয়েন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শিল্পী জৈন বলেন, মেমোরি চিপ ও প্রসেসিং যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির কারণে নির্মাতারা পরিকল্পনা অনুযায়ী সাশ্রয়ী ফোন বাজারে আনতে পারছেন না। এতে খুচরা বাজারে ফোনের গড় বিক্রয়মূল্য বাড়ছে।
বাজারের এ পরিস্থিতিতে বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক চালান কমেছে ৩ শতাংশ। শাওমির চালান কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি, বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ডটির অংশ নেমেছে ১০ শতাংশে। তবে প্রিমিয়াম ফোনের বাজারে অবস্থান ধরে রেখেছে অ্যাপল।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে হ্যান্ডসেট উৎপাদন আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮.০২ শতাংশ কমেছে। ওই অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে দুই কোটি ৪৯ লাখ ১৭ হাজার ৮৩টি হ্যান্ডসেট। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৭০ লাখ ৯০ হাজার ১০টি।
টেকনো, আইটেল ও ইনফিনিক্সের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আই স্মার্ট ইউ টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানুল হক বলেন, মেমোরি ও চিপসেটের দাম বাড়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১০ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি স্মার্টফোনের দাম বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার ৯৯০ টাকা হয়েছে।
তার ভাষ্য, সাধারণত দেশে স্মার্টফোনের বাজারে বছরে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতো। কিন্তু চলতি বছর বিক্রি ১০ শতাংশ কমে যাওয়ায় খাতটি প্রায় ২০ শতাংশের নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়েছে।
স্মার্টফোনের পাশাপাশি গাড়ি, প্রসাধনী ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারেও মন্দা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন ব্যক্তিগত ও যাত্রীবাহী গাড়ির নিবন্ধন হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৭টি, যা ২০১১ সালের পর সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতায় প্রায় সব খাতে বিক্রি কমেছে। বিলাসপণ্যের বাজারে এর প্রভাব বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জাহাজীকরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে মানুষের আয় না বাড়ায় বিলাসপণ্যের চাহিদা কমছে। নতুন কর্মসংস্থান না বাড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানুষ কেনাকাটায় কাটছাঁট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তা চাহিদা কমার প্রভাব শুধু খুচরা বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, বিপণন, কর্মসংস্থান ও সরকারি রাজস্বেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।









