Dhaka 9:25 am, Monday, 12 October 2026
সর্বশেষ
দুটি স্পিড বোর্ডে আগুনসন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে দুই পক্ষের গোলাগুলি আশুলিয়ায় ডিবির অভিযানে লাখ টাকার ইয়াবাসহ চার মাদককারবারি গ্রেফতার সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন গরুর মাংসের কেজি ২৫০ টাকায় আনার দাবিতে আইনি নোটিশ রূপপুরে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ধর্মমন্ত্রী হাম উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১২৭৩ জিবুতি উপকূলে নৌকাডুবি, ১৫ শিশুসহ ১০৯ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু দুর্গাপূজায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ : আইজিপি সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটির গভর্নরস বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন ড. মামুন

দেড় হাজার কোটি  টাকার জমি ২১ বছর ‘সংঘবদ্ধ চক্র’র দখলে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 06:27:44 am, Wednesday, 7 October 2026
  • / 8 Time View

ঢাকার মেরুল বাড্ডায় মূল সড়ক ঘেঁষে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১১ একর জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। জমিটি রাজউকের নিজম্ব সম্পত্তি হলেও এটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দখল রেখেছে একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্র’।

দীর্ঘ সময় ধরে চক্রের দখলে থাকা এই জমি উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেই রাজউকের। যদিও এই জমি নিয়ে পাঁচটি রিট মামলা হয়েছে। তবে দীর্ঘ ২১ বছরেও রিটগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায়, সেখানে মাছ, মুরগি ও বাঁশের বিশাল আড়ত গড়ে তোলে চলছে রমরমা বাণিজ্য।  

অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জমি উদ্ধারের তৎপরতা থমকে আছে।

ফলে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই জমি এখনো চক্রের দখলে।  

নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর ৯৩-এ ধারায় জমিটি অধিগ্রহণ হয় ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাড্ডা মৌজায় সি এস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল এ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ আদেশের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল জমি ডিআইটির কাছে দখল বুঝিয়ে দেয়।

ডিআইটির অনুকূলে জমির ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক রাখা হয়।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিটি দখলে রাখতে ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। এ ছাড়া ওই বছর এই জমি দখলমুক্ত করতে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা উচ্ছেদ অভিযান চালান। এতে সংক্ষুব্ধরা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে আরেকটি রিট মামলা করেন।

এরপর ২০০৭ সালে রিট করে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও। এই জমি নিয়ে ধাপে ধাপে রাজউকের বিরুদ্ধ পাঁচটি রিট মামলা করা হয়।  

অভিযোগ রয়েছে, ১১ একরের এই জমি বেদখল হয়ে থাকলেও উদ্ধারে রাজউকের কোনো আগ্রহ নেই। এত বছরেও রিট মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। জমিতে থাকা আড়ত থেকে মাসে যে টাকা ওঠে, তার ভাগ পাচ্ছেন রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। 

সরেজমিন দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়ক ঘেঁষে রয়েছে বাঁশের আড়ত। এরপর মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে ছোট একটা টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের’ অফিস। আড়তের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। এ ছাড়া ১১ একর জমি ঘেঁষে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ। 

সরেজমিন আরো দেখা গেছে, রাজউক জমির মালিকানা দাবি করলেও জমিটি ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার দেখানো হয়েছে- মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসকে। সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯, সিটি-১৫০০৯ দেওয়া রয়েছে। যেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

মেরুল বাড্ডায় ১১ একর জমি উদ্ধার ও রিট মামলা-সংক্রান্ত রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা ব্যক্ত করে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

এদিকে রাজউকের এই জমি ঘিরে গড়ে উঠেছে আরেক ভয়াবহ চক্র। প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে চক্রটি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই জমির ওপরে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু হওয়া এই সমিতিতে ধাপে ধাপে ৬ হাজারের কাছাকাছি সদস্য রয়েছে। 

জমির ওপরে গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানি বলেন, জমিটি কাদের—এ আইনি অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে পুঁজি করেই মাঠে নামে এক প্রভাবশালী চক্র। তারা ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে সাইনবোর্ড টানিয়ে ঘোষণা দেয়, এখানে নির্মিত হবে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট। সেখানে স্বল্পমূল্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও দোকান খুলতে পারেননি সমিতির সদস্যরা। তবু টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সংঘবদ্ধচক্রটি।

২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ এক নোটিশে বলেন, মামলা খরচ ও অন্যান্য বাবদ সমিতির সদস্যদের এক হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব সদস্য মারা গেছেন এবং অন্যত্রে চলে গেছেন, তাদের সদস্যপদ ওয়ারিশদের নামে কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য সমিতিকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছ, স্থায়ী একটি দোকান পাবেন— এমন আশায় প্রায় ৬ হাজার মানুষ তাদের জমানো সঞ্চয় তুলে দেন সমিতির কাছে। রসিদের মাধ্যমে ও নানা অজুহাতে সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় তুলে নেওয়া হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

২০০৫ সালের দিকে ওই বিতর্কিত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় রাজউক। এ সময় গোমর ফাঁস হয় যাবে—এমন আশঙ্কায় থমকে যায় সমিতির কার্যক্রম। সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে থেকে থাকেনি চতুর সমিতি চক্র। তারা নতুন করে মেরুল বাড্ডা থেকে কার্যালয় সরিয়ে নিয়ে যায় মতিঝিলে। রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবে—এমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে ফের চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় অব্যাহত রাখে। 

ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ—রাজউকের চোখের সামনে কীভাবে একটি ভুয়া সমিতি যুগের পর যুগ এভাবে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের ৩০০ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে রাজপথে বা আইনি দ্বারে কড়া নাড়ছে।

তাদের দাবি, অবিলম্বে এই ভুয়া ‘দোকানদার সমিতি’র নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় এনে কড়া শাস্তি দিতে হবে, এবং হারিয়ে যাওয়া ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের উত্তরসূরিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’

সমিতির আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।’

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে যাত্রা হওয়া এই সমিতিতে সদস্যরা টানা ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’

তিনি বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউক বলছে—মামলা নিষ্পত্তি না হলে সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। আমরা রাজউকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেছি। ২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দেড় হাজার কোটি  টাকার জমি ২১ বছর ‘সংঘবদ্ধ চক্র’র দখলে

Update Time : 06:27:44 am, Wednesday, 7 October 2026

ঢাকার মেরুল বাড্ডায় মূল সড়ক ঘেঁষে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১১ একর জমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। জমিটি রাজউকের নিজম্ব সম্পত্তি হলেও এটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দখল রেখেছে একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্র’।

দীর্ঘ সময় ধরে চক্রের দখলে থাকা এই জমি উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেই রাজউকের। যদিও এই জমি নিয়ে পাঁচটি রিট মামলা হয়েছে। তবে দীর্ঘ ২১ বছরেও রিটগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায়, সেখানে মাছ, মুরগি ও বাঁশের বিশাল আড়ত গড়ে তোলে চলছে রমরমা বাণিজ্য।  

অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জমি উদ্ধারের তৎপরতা থমকে আছে।

ফলে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই জমি এখনো চক্রের দখলে।  

নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর ৯৩-এ ধারায় জমিটি অধিগ্রহণ হয় ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাড্ডা মৌজায় সি এস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল এ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ আদেশের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল জমি ডিআইটির কাছে দখল বুঝিয়ে দেয়।

ডিআইটির অনুকূলে জমির ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক রাখা হয়।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিটি দখলে রাখতে ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। এ ছাড়া ওই বছর এই জমি দখলমুক্ত করতে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা উচ্ছেদ অভিযান চালান। এতে সংক্ষুব্ধরা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে আরেকটি রিট মামলা করেন।

এরপর ২০০৭ সালে রিট করে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও। এই জমি নিয়ে ধাপে ধাপে রাজউকের বিরুদ্ধ পাঁচটি রিট মামলা করা হয়।  

অভিযোগ রয়েছে, ১১ একরের এই জমি বেদখল হয়ে থাকলেও উদ্ধারে রাজউকের কোনো আগ্রহ নেই। এত বছরেও রিট মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। জমিতে থাকা আড়ত থেকে মাসে যে টাকা ওঠে, তার ভাগ পাচ্ছেন রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। 

সরেজমিন দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়ক ঘেঁষে রয়েছে বাঁশের আড়ত। এরপর মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে ছোট একটা টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের’ অফিস। আড়তের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। এ ছাড়া ১১ একর জমি ঘেঁষে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ। 

সরেজমিন আরো দেখা গেছে, রাজউক জমির মালিকানা দাবি করলেও জমিটি ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার দেখানো হয়েছে- মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসকে। সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯, সিটি-১৫০০৯ দেওয়া রয়েছে। যেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

মেরুল বাড্ডায় ১১ একর জমি উদ্ধার ও রিট মামলা-সংক্রান্ত রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা ব্যক্ত করে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

এদিকে রাজউকের এই জমি ঘিরে গড়ে উঠেছে আরেক ভয়াবহ চক্র। প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে চক্রটি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই জমির ওপরে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু হওয়া এই সমিতিতে ধাপে ধাপে ৬ হাজারের কাছাকাছি সদস্য রয়েছে। 

জমির ওপরে গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানি বলেন, জমিটি কাদের—এ আইনি অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে পুঁজি করেই মাঠে নামে এক প্রভাবশালী চক্র। তারা ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে সাইনবোর্ড টানিয়ে ঘোষণা দেয়, এখানে নির্মিত হবে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট। সেখানে স্বল্পমূল্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও দোকান খুলতে পারেননি সমিতির সদস্যরা। তবু টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সংঘবদ্ধচক্রটি।

২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ এক নোটিশে বলেন, মামলা খরচ ও অন্যান্য বাবদ সমিতির সদস্যদের এক হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব সদস্য মারা গেছেন এবং অন্যত্রে চলে গেছেন, তাদের সদস্যপদ ওয়ারিশদের নামে কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য সমিতিকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছ, স্থায়ী একটি দোকান পাবেন— এমন আশায় প্রায় ৬ হাজার মানুষ তাদের জমানো সঞ্চয় তুলে দেন সমিতির কাছে। রসিদের মাধ্যমে ও নানা অজুহাতে সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় তুলে নেওয়া হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

২০০৫ সালের দিকে ওই বিতর্কিত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় রাজউক। এ সময় গোমর ফাঁস হয় যাবে—এমন আশঙ্কায় থমকে যায় সমিতির কার্যক্রম। সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে থেকে থাকেনি চতুর সমিতি চক্র। তারা নতুন করে মেরুল বাড্ডা থেকে কার্যালয় সরিয়ে নিয়ে যায় মতিঝিলে। রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবে—এমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে ফের চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় অব্যাহত রাখে। 

ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ—রাজউকের চোখের সামনে কীভাবে একটি ভুয়া সমিতি যুগের পর যুগ এভাবে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের ৩০০ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে রাজপথে বা আইনি দ্বারে কড়া নাড়ছে।

তাদের দাবি, অবিলম্বে এই ভুয়া ‘দোকানদার সমিতি’র নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় এনে কড়া শাস্তি দিতে হবে, এবং হারিয়ে যাওয়া ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের উত্তরসূরিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’

সমিতির আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।’

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে যাত্রা হওয়া এই সমিতিতে সদস্যরা টানা ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’

তিনি বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউক বলছে—মামলা নিষ্পত্তি না হলে সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। আমরা রাজউকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেছি। ২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।’