হাজারো ছাত্র-শিক্ষকের মিছিলে উত্তাল ফ্রান্স
- Update Time : 01:38:20 pm, Tuesday, 6 October 2026
- / 2 Time View
শিক্ষক সংকট এবং জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের সমস্যা সমাধানের দাবিতে আজ মঙ্গলবারও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। এ সময় বিক্ষোভকারীরা দেশটির শত শত স্কুলে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
সকালে মার্সেই, নান্তেস ও লিওঁ শহরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। ল ইউনিয়ন এটুডিয়ান্টের তথ্য অনুযায়ী, মার্সেই, নিস, নান্তেস, লিয়োঁ ও প্যারিসসহ ৩০টিরও বেশি শহরে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ চলছে। পরে রাজধানী প্যারিসে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
নিক বিকের তথ্য অনুযায়ী, লিলি শহরে ময়লার ডাস্টবিনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভে তরুণেরা ধোঁয়ার ফ্লেয়ার ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করেন। এসব প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমাদের স্কুলের বইয়ের নিচে জমে আছে ক্ষোভ’ এবং ‘রাজনীতিবিদরা কোথায়? তারা কি আদৌ জানেন যে আমরা আছি?’
গত দুই সপ্তাহ ধরে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত উপশহরগুলো থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেছে। সরকারের দাবি, আন্দোলনের কিছু অংশ এখন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
এদিকে সোমবার উত্তর ফ্রান্সে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। পাস-দ্য-ক্যালাইসের প্রিফেক্ট ফ্রাঁসোয়া-জাভিয়ের লাউশ ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি বলেন, ‘ওই সময় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ছিল।’
আঞ্চলিক সংবাদপত্র ‘লা ভোয়া দ্যু নর্ড’ জানায়, পুলিশের ছত্রভঙ্গ করার কাজে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড ওই কিশোর তুলে নেওয়ার পর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার হাত এবং বাহুর নিচের অংশের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন জানিয়েছে, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি উচ্চবিদ্যালয় অবরোধ করা হয়েছে অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হবে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। কিছু স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
স্ট্রাসবার্গের এক উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হুগো ভেটজেল বলেন, ‘যখন কোনো সমস্যার জবাব হয় সহিংসতা, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্র আর ঠিকভাবে কাজ করছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।’ ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো পূরণে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তার মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি স্কুলগুলোর অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু বলেছেন, পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবনগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামতের বিষয়টিও সরকার পর্যালোচনা করবে। তিনি মন্ত্রীদের আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজেট ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে ফরাসি সরকার। এর মধ্যেই দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণ, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে সরকারি বন্ডের সুদহারে।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার সাময়িকভাবে ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। এটি প্রায় ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়। ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ইউরোর অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। একই সময়ে ইউরোর দরপতনও ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে অর্থমন্ত্রী রোলান্ড লেস্কুর মঙ্গলবার বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখনই হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।
আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী ও ইউরো-সংশয়বাদী রাজনীতিক মেরিন লে পেন ক্ষমতায় গেলে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ফ্রান্সের বন্ডবাজারে চাপ বাড়ার মধ্যেই লে পেন নিজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নুর কার্যালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষে অন্তত ৭১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী আহত হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে এই বিক্ষোভ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বেড়েছে।
ম্যাখোঁর সরকার এবং ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি পার্টি কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের (এলএফআই) আইনপ্রণেতা ও মেয়রদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করেছে। তবে এলএফআই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্যারিসের দরিদ্র উপশহর সাঁ-দেনির এলএফআই মেয়র বালি বাগায়োকো বলেছেন, তিনি সহিংসতার বিরোধিতা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার এলাকার বাসিন্দাদের পাশে থাকার অবস্থানে অটল। আর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আমার এলাকারই বাসিন্দা।’









