কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড ,পাঁচ আসামির অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ।
- Update Time : 02:45:21 am, Wednesday, 16 September 2026
- / 10 Time View
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির টাকা হতাহতদের দেওয়া হবে
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় দেন।
ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান। দণ্ডপ্রাপ্ত সব আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভ্যুত্থানে হতাহত ব্যক্তি বা তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার শুরুতেই প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা, রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ রায় লিখতে আমাদের যেমন কষ্ট হয়েছে, তেমনি প্রসিকিউশন, সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তাও কষ্ট করেছেন। মামলা চলাকালে সাংবাদিকরাও অনেক পরিশ্রম করেছেন। এ জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
রায়ের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা নিয়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এ মামলার আসামিরা উপস্থিত থাকলে পুরো রায়টি পড়া যেত; কিন্তু তাঁরা পলাতক। এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রায় হাজার পৃষ্ঠাও হতে পারে। তবে আমরা ৫৫৭ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায় থেকে শুধু কার্যকর অংশ (দণ্ড ও সাজা) ঘোষণা করছি।’
ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় শুনানিতে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম।
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ইশরাত জাহান অনি।
কার কী সম্পদ আছে, খুঁজে বের করবে সরকার : চিফ প্রসিকিউটর
রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই (মৃত্যুদণ্ডের) রায় হয়েছে। আমরা এই রায়ে শুকরিয়া আদায় করছি।’
দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘রোম সংবিধি অনুসারে দণ্ডিতের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম আমাদের ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘রায় বাস্তবায়ন করবে সরকার। কার কী সম্পদ আছে তা সরকার খুঁজে বের করবে এবং সে অনুযায়ী তাদের সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হবে।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রায়টা প্রকাশিত হওয়ার পরে ৩০ দিন পর্যন্ত আপিলের সময়সীমা থাকবে। ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নেই। কিন্তু ৩০ দিন পর থেকে এই রায় বাস্তবায়ন করতে আর আইনগত কোনো বাধা থাকবে না।’
রায়ে সন্তুষ্ট নন রাষ্ট্র নিযুক্ত দুই আইনজীবী
কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি একজন বিচারক ছিলাম। সেই হিসেবে বলছি, মাননীয় বিচারপতিদের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই, কিংবা বলার মতো ধৃষ্টতাও আমার নেই। তবে আমিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।’
সুযোগ থাকলে আপিল করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আপিলে হয়তো আরো ভালো কোনো ফল পেতে পারি।’
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ইশরাত জাহান অনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের খালাস করানোর জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আইন অনুযায়ী যেভাবে এগোনো যায়, সেভাবেই আর্গুমেন্ট ও জেরা করেছি; কিন্তু মাননীয় ট্রাইব্যুনাল আমার চার আসামির বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের রায় মানতে আইনজীবী হিসেবে আমরা বাধ্য। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমাদের নেই। ট্রাইব্যুনালের রায় মানি, মান্য করি; কিন্তু আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই।’
‘দু-একটাকে ফাঁসি দিক, তারপর বলব যে সরকার বিচার করছে’
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন রায়ের পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সাংবাদিকদের কাছে। তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর দেখতে চান। মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘যারা দেশে আছে, তাদের বিচার করুক। দু-একটাকে ফাঁসি দিক না। তারপর বলব যে সরকার বিচার করছে। আজ পর্যন্ত প্রদীপের বিচার হলো না। জিয়াউল হাসানের কিছু হলো না। তারা এখন জেলে এক্সারসাইজ করে। তারেক রহমানকে আবারও বলছি, দু-একটার ফাঁসি দিন, তারপর বিশ্বাস করব যে আপনি আসলেই বিচার করতে চান।’
বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মোশাররফ বলেন, ‘আজ সরকারের যে অবস্থা, এই সরকার থাকবে কি না তা-ও জানি না। নতুন কোনো সরকার এলে, আবার শুনি যে আওয়ামী লীগ আসবে, তখন তো এদের সব মামলা শেষ হয়ে যাবে। এরা আবার দেশের মধ্যে অশান্তি শুরু করবে।’
মামলার বিচারপ্রক্রিয়া
সাত আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ১৮ জুন মামলার তদন্ত শুরু হয়। পাঁচ মাসে তদন্ত শেষ করে সাত আসামির বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ এনে ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। যাচাই-বাছাইয়ের পর তা ১৮ ডিসেম্বর ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হলে ওই দিনই তা আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তাঁদের ধরতে না পারায় আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় সাত আসামিকেই পলাতক দেখিয়ে তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে উভয় পক্ষের শুনানির পর চলতি বছর ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল বিচার শুরুর আদেশ দেন। সাত আসামির বিরুদ্ধেই ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে আন্দোলনকারী নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহবান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে তাঁরা সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।
অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাত আসামিকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), (গ), (হ) এবং ৪(১), (২), (৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের ‘সূচনা বক্তব্যের’ মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার। ওই দিনই শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২৯ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। শরীফ ওসমান হাদি মৃত্যুর আগে এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। পরে তাঁর জবানবন্দিটিও প্রসিকিউশণের আবেদনে গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ শেষ হলে গত ৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। টানা ছয় কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। গত ১২ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। গত ১৭ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে সাত আসামির পদ-পদবি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে আসামিরা তাঁদের অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায়, পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের হত্যা ও নির্যাতনের অপরাধ সংঘটন করেন, যা আসামির নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তায়, সম্পৃক্ততায় ও জ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়।
ওবায়দুল কাদের : সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেলে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের ফোনালাপ হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সাদ্দামকে কাদের বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’ তা ছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে ওবায়দুল কাদের অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রুখে দিতে এবং আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য রাজধানীর ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন কাদের। আন্দোলন দমনে ইন্টারনেটের গতি কমানো, পুলিশ-র্যাবকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম : আওয়ামী লীগের এই নেতার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করতেন এবং তাঁর নির্দেশে সেখানে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪ অগাস্ট ফার্মগেটে আন্দোলনকারীদের স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এ ছাড়া বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনায় তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৮-এ সশস্ত্র হামলায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটে।
মোহাম্মদ আলী আরাফাত : ২০২৪ সালের ১৩ ও ১৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে মহড়া দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা-১৭ আসনের মহাখালী ও গুলশান এলাকায় হামলা চালিয়ে একাধিক আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আন্দোলন দমনে সরকারের বল প্রয়োগের খবর প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
শেখ ফজলে শামস পরশ : যুবলীগ চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামস পরশ তাঁর অধীন নেতাকর্মীদের ‘সশস্ত্র অবস্থায়’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। পরশের বিরুদ্ধে ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে এই মামলায়।
মাইনুল হোসেন খান নিখিল : যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সিলেটে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যুবলীগ নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া এবং ১৯ জুলাই মিরপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নিখিলের সরাসরি নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।
সাদ্দাম হোসেন : ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি দেন। ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে। ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের বক্তব্যের পরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান : ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’-এর নামে আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরা অবস্থায় মাঠে থেকে তা সরাসরি তদারকি করেন তিনি। তা ছাড়া দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ পেয়ে তিনি তা সারা দেশে বাস্তবায়ন করেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
সাত মামলায় ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড
এ নিয়ে চব্বিশের অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি মামলার রায় হলো। এসব মামলায় মোট আসামি ছিলেন ৭০ জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান ছিলেন দুই মামলার আসামি। দুই মামলায়ই তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। সে হিসাবে সাত মামলার মোট আসামি ৬৯ জন। এই ৬৯ আসামির মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ১১ আসামিকে যাবজ্জীন এবং ৩৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন দুজন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪৯ আসামি পলাতক।






