অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী
- Update Time : 05:25:48 pm, Wednesday, 9 September 2026
- / 1 Time View
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির ওপরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।’ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে এ কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল এবং সেই কমিটি সমগ্র দেশের মানুষের সামনে একটি শ্বেতপত্র বা এই ধরনের একটি রিপোর্ট-হোয়াইট পেপার প্রকাশ করেছিল। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অর্থনীতির বিষয়টি। ওই পেপারটা যদি বের করে দেখেন তাহলে মোটামুটিভাবে পরিষ্কার একটি চিত্র পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার সেই পেপারটিকে সামনে রেখে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত পর্যায়ক্রমে চেষ্টা করা হচ্ছে সেসব পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একটি কারণে হয় না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে। প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতার বিষয়টি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
এগুলো হলো : দুর্বল ফিজিবিলিটি স্টাডি, প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন যথাযথ না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহি, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেট সামঞ্জস্যের ঘাটতি এবং আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব ইত্যাদি।’
এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে, নতুন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রণয়ন নিশ্চিত করা, প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা, প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন সংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে নির্দেশিকার সংশোধন, চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মনিটরিং জোরদার করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় জোরদার, যেসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি, সেসব প্রকল্পের বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ নিরূপণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কর্তৃক পর্যালোচনাপূর্বক বিলম্বের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম সেসব প্রকল্পের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে প্রকল্পগুলো পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন কিংবা চলমান রাখার বিষয়ে মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপি ব্যবহারের সম্প্রসারণ, পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) মডেলের প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান এবং সরকারি ক্রয় অধিকতর প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিমূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সাময়িক সংকটকালীন সময়ে শিল্প খাতে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিকল্পনাগুলো হচ্ছে : ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খনন, দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪,৫০০ লাইন কিমি. ২ডি সাইসমিক (দ্বি-মাত্রিক) সার্ভে এবং ৪,২০০ বর্গ কি.মি. ৩ডি সাইসমিক (ত্রি-মাত্রিক) সার্ভে পরিচালনা, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলে সময়সীমা নির্ধারণ আছে।
স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ।’
তিনি বলেন, ‘দেশে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কম-বেশি গড়ে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যেন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় তা নিশ্চিতের জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল হতে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল হতে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা হবে আশা করা যায়।’
পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে কোনো সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মেইনল্যান্ডে এনে আগ্রহী গ্রাহক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মত পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
ভোলার গ্যাস ব্যবহার প্রসঙ্গে সুলতানা আহমেদের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভোলায় যে গ্যাস রয়েছে সেই গ্যাসকে যদি পাইপলাইনের মাধ্যমে মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসতে চাই, তাহলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছরের মতো সময় লাগবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা যেটি করতে চাচ্ছি তা হলো-সেখানে শিল্প কারখানা স্থাপন করা যায় কিনা। এরই মধ্যে কিছু শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে তাদের কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করছেন। যেগুলো গ্যাস দ্বারা পরিচালিত হবে। এর ফলে একদিকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির পরিধিও বৃদ্ধি পাবে ভোলা অঞ্চলে। এর বাইরেও সেখানকার গ্যাসকে সঠিকভাবে দেশের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে পাঁচশ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আলোচনা চলছে।’
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।