Dhaka 3:34 pm, Thursday, 3 September 2026

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্ত এখন জনতার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 08:22:38 am, Thursday, 3 September 2026
  • / 6 Time View

ফাইল ছবিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও আসিফ মাহমুদ (বাঁ থেকে)
অবশেষে ইউনূস সরকারের প্রভাবশালী ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

অভিযোগে বলা হয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ মাহমুদ নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন পদায়নের আদেশ জারির বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে আরো বলা হয়, ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি বাবদ দেড় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়ন নিশ্চিতে আরো ২ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রথম দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করল দুদক।

তবে আসিফ মাহমুদ যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছেন, তার তুলনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অভিযোগ অনেক সামান্য। সাধারণ মানুষ আশা করে, এই শিশু উপদেষ্টার বড় বড় দুর্নীতির তদন্ত করা হবে। আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির সাক্ষী তার বন্ধু এবং সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন। দুর্নীতির কারণে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলেও তাতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আসিফ মাহমুদের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, মোয়াজ্জেম এখনো আসিফের ঘনিষ্ঠ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই আসিফ মাহমুদের অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যাবে। 

শুধু আসিফ মাহমুদ একা নন, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে তার উপদেষ্টারা দুর্নীতির উৎসবে মেতেছিলেন। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ইউনূসের উপদেষ্টাদের মধ্যে।

ইউনূস যেমন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তেমনি দুর্নীতিতেও তিনি ছিলেন প্রধান। তিনিই অন্য উপদেষ্টাদের কিভাবে দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করতে হয়, তা হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। ইউনূস সরকারের দেড় বছর বাংলাদেশে দুর্নীতির সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। তাই শুধু আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির তদন্ত করলে হবে না, ইউনূসসহ সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা। 

আসিফ মাহমুদের আসল দুর্নীতি এখনো তদন্তের বাইরে

আসিফ মাহমুদ ছিলেন ইউনূস সরকারের দুর্নীতির ‘পোস্টার বয়’। গত দেড় বছরে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ইতিবাচক কিছুর প্রমাণ করতে না পারলেও দুর্নীতির পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দেড় বছরে কোনো ভালো কাজের জন্য নয়, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বারবার তার নাম সামনে এসেছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ছাত্রনেতা থেকে একজন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—

উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি-আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আওতায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের পঁচিশ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো। তা না হলে অর্থ ছাড় করা হতো না। উপদেষ্টার কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন তদারকি করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ওয়াশার এমডি নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ-অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে ওয়াশার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আব্দুস সালামকে। তাকে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি ছিলেন একই সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। এ পদে চাকরিকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। আবদুস সালামের কানাডায় বাড়ি আছে। অভিযোগ বলা হয়েছে, সালাম উপদেষ্টাকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে এই পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ে আল আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। বাকি দুই কোটি টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছে।

উত্তর সিটিতে প্রশাসক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য-২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে লেনদেনের মাধ্যমে এই নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। নগদ বিশ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের সকল কাজে নিয়মিত দশ শতাংশ কমিশনের শর্তে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেয়ে এজাজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে অপসারণ করা হয়। ডিএনসিসির অধীনস্থ মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটনের ভাগ, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য নানা বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার কথা বলছে দুদক। এজাজের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, আসিফ মাহমুদের টাকা জোগাড় করতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন এজাজ।

টেন্ডার বাণিজ্য-দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে। সব টেন্ডারেই দশ থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ নিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তার কথিত প্রেস সেক্রেটারি প্রতিটি টেন্ডারে হস্তক্ষেপ করেছেন। লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ডও চিঠির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পদায়ন বাণিজ্য-২০২৪ সালে আগস্ট থেকে বিদায়ের আগে পর্যন্ত জনপ্রশাসনের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন আসিফ মাহমুদ, এরকম লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি। সারাদেশে ডিসি নিয়োগে আসিফ মাহমুদ ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। যার মধ্যে ৩৬ জনকেই জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ আছে, জেলা ভেদে জেলা প্রশাসক পদায়নে দুই থেকে দশ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। শুধু জেলা প্রশাসক নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের, প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে, এমনকি সচিব পদে পদোন্নতির জন্যও আসিফ মাহমুদের কাছে তদবির করতেন সরকারি কর্মকর্তারা। মোটা অঙ্কের লেনদেন চূড়ান্ত হলেই আসিফ তদবির শুরু করতেন।

ক্রিপ্টোকারেন্সি বিতর্ক-আসিফ মাহমুদ ব্যাংক হিসাব সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। সবাই বলতে শুরু করে, চুরির টাকা কেউ কী ব্যাংকে রাখে?

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বেশিরভাগ অর্থই ক্রিপ্টোকারেন্সি করে রাখা। এছাড়াও দুবাইয়ে আসিফ সম্পদ এবং বিনিয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে। সুইস ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আসিফ মাহমুদ উপদেষ্টা হওয়ার পর অন্তত তিনবার সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এসব টাকা যে আসিফ মাহমুদ এবং ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা পাচার করেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ইউনূসে দুর্নীতি কি তদন্তের বাইরে থেকে যাবে?

দেড় বছরে ইউনূস সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছেন। দেড় বছরে ইউনূস হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন এবং বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে ফ্রান্সে গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ অন্তত ১৫০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এটি ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক এবং ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং গ্রুপ ক্রেডিট এগ্রিকল (Crédit Agricole)-এর যৌথ উদ্যোগে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর সদর দফতর ফ্রান্সের মঁত্রুজ (Montrouge)-এ অবস্থিত। ইউনূসের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানে ২০২৪ এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ এর জুনের মধ্যে এই টাকা ট্রান্সফার হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কোনো টাকা পাঠানোর অনুমতি নেই। বৈধ পথে এই প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠানোর কোনো রেকর্ডও নেই। ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায় গ্রামীণ আমেরিকায় বিনিয়োগ বেড়েছে ১২০ কোটি টাকা। নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই নতুন অর্থ প্রাপ্তির তথ্য জানা যায়। ২০০৮ সালে ইউনূস এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ বিতরণ করেছে। ইউনূসের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এছাড়াও বিশ্বের অন্তত দশটি দেশে ইউনূসের বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, যতদিন ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ততদিন এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। এই অর্থ কি ইউনূস অবৈধভাবে উপার্জন করে পাচার করেছেন? এই বিষয়ে তদন্ত করে সঠিক তথ্য বের করা দরকার। ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর দুর্নীতি করেছেন প্রকাশ্যে। ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পেতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিবন্ধন, অনুমোদন, করছাড়সহ বেশকিছু সুবিধা পেয়েছে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকায় ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে।

সেই সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ ও সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ড. ইউনূস ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন ইউনূসের এসব সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি কতটা আইনানুগভাবে হয়েছে তা তদন্ত করবে বলে দেশবাসী আশা করে।

দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই আসিফ নজরুল

আসিফ নজরুলের দেড় বছরের রাজত্বে সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি ছিল সাব রেজিস্ট্রার বদলি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে। আঠারো মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভালো জায়গায় বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন আসিফ নজরুল। সাধারণ বদলির জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অতীতে কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।

গত বছরের জুনে বাংলাদেশের নিম্ন আদালতে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ২ জুন সারা দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে যায়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ঢালাও বদলি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন জেলার ৩০ জন জেলা ও দায়রা জজ এবং সম পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ৩৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ২২ জন বিচারক এবং সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ এবং সম পদমর্যাদার ১৬২ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে জেলা ও দায়রা জজ/মহানগর দায়রা জজ/চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা/দফতর প্রধান কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে অবিলম্বে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঢালাও বদলির পেছনে রয়েছে দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার নেতৃত্বে ছিলেন আসিফ নজরুল। আসিফ দায়িত্ব গ্রহণের পর, বিচারক বদলি বাণিজ্যের পরিকল্পনা হাতে নেন। তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন চূড়ান্ত করার পর, একযোগে বদলি করা হয়। এই বদলি বাণিজ্য করে আসিফ নজরুল হাতিয়ে নেন কয়েক শ কোটি টাকা।

আসিফ নজরুল টাকার বিনিময়ে বহু আসামির জামিন করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জামিনের বিনিময়ে তিনি কয়েক শ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আসিফ নজরুল হয়ে উঠেছিলেন দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি। প্রধান উপদেষ্টার পরপরই তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছিল। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা তার পরামর্শ অনুযায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর কয়েকজন আমলাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমান ছিলেন অন্যতম। মোখলেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। এ সময় ডিসি নিয়োগে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য গঠিত হয় একটি তদন্ত কমিটি। এই কমিটিতে আসিফ নজরুল ছিলেন একক ক্ষমতার অধিকারী। মোখলেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আসিফ নজরুল তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করেন। বিনিময়ে ডিসি পদায়নে নিজের পছন্দের নাম দিতে শুরু করেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে, যখন চট্টগ্রামের ডিসি পদায়নে আসিফ নজরুলের পছন্দের প্রার্থীর বিপরীতে ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও নাম দেন। দুজনই বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নাম দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর, মোখলেসুর রহমানকে জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

শুধু জেলা প্রশাসক নয়, আসিফ নজরুল অনেক সচিবকে পদায়নের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও ছিলেন। এখানেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। আসিফ নজরুল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। জনশক্তি রপ্তানি খাতে ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সি আছে ১ হাজার ৯৮৮টি। অন্যদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬। শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি সক্রিয় আছে বাংলাদেশে। এমনকি পৃথিবীর বড় বড় বড় শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায়ও এ সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

ইউনূস সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন আরো ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেয় মূলত আসিফ নজরুলের ইচ্ছায়।

আসিফ নজরুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তার একাধিক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এই অভিযোগগুলো তদন্ত করবে বলে দেশবাসী আশা করে।

রিজওয়ানা দম্পতি এখনো বিপুর পাহারাদার—ইউনূস সরকারের আরেক শীর্ষ দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টা ছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী (এবিসি) আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে বিপুর অবৈধ সম্পদের রক্ষক ছিলেন রিজওয়ানা এবং তার স্বামী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিজওয়ানা পক্ষে তার স্বামী দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ করতেন। ১৮ মাসে পরিবেশ খাতেই শুধু নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, তদবিরের মাধ্যমে এই দম্পতি শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

উপদেষ্টা হওয়ার আগে, রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, তাঁদের কোনো সম্পত্তি নেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তাঁদের সম্পত্তির পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে। যা ঘিরে রীতিমতো প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। এ বি সিদ্দিকী যেহেতু নসরুল হামিদ বিপুর সঙ্গে একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, সেই সূত্রেই হামিদ ফ্যাশনে চাকরি করতেন। ২০২৪-এর আগস্টের পর এবি সিদ্দিকী বা উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী নসরুল হামিদ বিপুর নানা সম্পত্তি কেনাবেচার মধ্যস্থতা করছেন। এমনকি এই টাকা বিদেশে পাঠিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম, আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

দুদক এসব অভিযোগ তদন্ত করবে বলে সবাই আশা করেন। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত একটি শুভ সূচনা। ইউনূস শাসনামলে সংঘটিত সকল দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বাংলাদেশ দুর্নীতি প্রতিরোধে এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্ত এখন জনতার দাবি

Update Time : 08:22:38 am, Thursday, 3 September 2026

ফাইল ছবিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও আসিফ মাহমুদ (বাঁ থেকে)
অবশেষে ইউনূস সরকারের প্রভাবশালী ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

অভিযোগে বলা হয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ মাহমুদ নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন পদায়নের আদেশ জারির বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে আরো বলা হয়, ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি বাবদ দেড় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়ন নিশ্চিতে আরো ২ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রথম দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করল দুদক।

তবে আসিফ মাহমুদ যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছেন, তার তুলনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অভিযোগ অনেক সামান্য। সাধারণ মানুষ আশা করে, এই শিশু উপদেষ্টার বড় বড় দুর্নীতির তদন্ত করা হবে। আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির সাক্ষী তার বন্ধু এবং সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন। দুর্নীতির কারণে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলেও তাতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আসিফ মাহমুদের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, মোয়াজ্জেম এখনো আসিফের ঘনিষ্ঠ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই আসিফ মাহমুদের অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যাবে। 

শুধু আসিফ মাহমুদ একা নন, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে তার উপদেষ্টারা দুর্নীতির উৎসবে মেতেছিলেন। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ইউনূসের উপদেষ্টাদের মধ্যে।

ইউনূস যেমন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তেমনি দুর্নীতিতেও তিনি ছিলেন প্রধান। তিনিই অন্য উপদেষ্টাদের কিভাবে দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করতে হয়, তা হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। ইউনূস সরকারের দেড় বছর বাংলাদেশে দুর্নীতির সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। তাই শুধু আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির তদন্ত করলে হবে না, ইউনূসসহ সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা। 

আসিফ মাহমুদের আসল দুর্নীতি এখনো তদন্তের বাইরে

আসিফ মাহমুদ ছিলেন ইউনূস সরকারের দুর্নীতির ‘পোস্টার বয়’। গত দেড় বছরে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ইতিবাচক কিছুর প্রমাণ করতে না পারলেও দুর্নীতির পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দেড় বছরে কোনো ভালো কাজের জন্য নয়, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বারবার তার নাম সামনে এসেছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ছাত্রনেতা থেকে একজন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—

উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি-আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আওতায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের পঁচিশ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো। তা না হলে অর্থ ছাড় করা হতো না। উপদেষ্টার কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন তদারকি করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ওয়াশার এমডি নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ-অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে ওয়াশার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আব্দুস সালামকে। তাকে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি ছিলেন একই সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। এ পদে চাকরিকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। আবদুস সালামের কানাডায় বাড়ি আছে। অভিযোগ বলা হয়েছে, সালাম উপদেষ্টাকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে এই পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ে আল আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। বাকি দুই কোটি টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছে।

উত্তর সিটিতে প্রশাসক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য-২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে লেনদেনের মাধ্যমে এই নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। নগদ বিশ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের সকল কাজে নিয়মিত দশ শতাংশ কমিশনের শর্তে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেয়ে এজাজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে অপসারণ করা হয়। ডিএনসিসির অধীনস্থ মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটনের ভাগ, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য নানা বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার কথা বলছে দুদক। এজাজের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, আসিফ মাহমুদের টাকা জোগাড় করতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন এজাজ।

টেন্ডার বাণিজ্য-দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে। সব টেন্ডারেই দশ থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ নিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তার কথিত প্রেস সেক্রেটারি প্রতিটি টেন্ডারে হস্তক্ষেপ করেছেন। লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ডও চিঠির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পদায়ন বাণিজ্য-২০২৪ সালে আগস্ট থেকে বিদায়ের আগে পর্যন্ত জনপ্রশাসনের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন আসিফ মাহমুদ, এরকম লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি। সারাদেশে ডিসি নিয়োগে আসিফ মাহমুদ ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। যার মধ্যে ৩৬ জনকেই জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ আছে, জেলা ভেদে জেলা প্রশাসক পদায়নে দুই থেকে দশ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। শুধু জেলা প্রশাসক নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের, প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে, এমনকি সচিব পদে পদোন্নতির জন্যও আসিফ মাহমুদের কাছে তদবির করতেন সরকারি কর্মকর্তারা। মোটা অঙ্কের লেনদেন চূড়ান্ত হলেই আসিফ তদবির শুরু করতেন।

ক্রিপ্টোকারেন্সি বিতর্ক-আসিফ মাহমুদ ব্যাংক হিসাব সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। সবাই বলতে শুরু করে, চুরির টাকা কেউ কী ব্যাংকে রাখে?

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বেশিরভাগ অর্থই ক্রিপ্টোকারেন্সি করে রাখা। এছাড়াও দুবাইয়ে আসিফ সম্পদ এবং বিনিয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে। সুইস ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আসিফ মাহমুদ উপদেষ্টা হওয়ার পর অন্তত তিনবার সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এসব টাকা যে আসিফ মাহমুদ এবং ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা পাচার করেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ইউনূসে দুর্নীতি কি তদন্তের বাইরে থেকে যাবে?

দেড় বছরে ইউনূস সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছেন। দেড় বছরে ইউনূস হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন এবং বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে ফ্রান্সে গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ অন্তত ১৫০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এটি ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক এবং ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং গ্রুপ ক্রেডিট এগ্রিকল (Crédit Agricole)-এর যৌথ উদ্যোগে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর সদর দফতর ফ্রান্সের মঁত্রুজ (Montrouge)-এ অবস্থিত। ইউনূসের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানে ২০২৪ এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ এর জুনের মধ্যে এই টাকা ট্রান্সফার হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কোনো টাকা পাঠানোর অনুমতি নেই। বৈধ পথে এই প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠানোর কোনো রেকর্ডও নেই। ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায় গ্রামীণ আমেরিকায় বিনিয়োগ বেড়েছে ১২০ কোটি টাকা। নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই নতুন অর্থ প্রাপ্তির তথ্য জানা যায়। ২০০৮ সালে ইউনূস এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ বিতরণ করেছে। ইউনূসের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এছাড়াও বিশ্বের অন্তত দশটি দেশে ইউনূসের বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, যতদিন ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ততদিন এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। এই অর্থ কি ইউনূস অবৈধভাবে উপার্জন করে পাচার করেছেন? এই বিষয়ে তদন্ত করে সঠিক তথ্য বের করা দরকার। ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর দুর্নীতি করেছেন প্রকাশ্যে। ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পেতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিবন্ধন, অনুমোদন, করছাড়সহ বেশকিছু সুবিধা পেয়েছে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকায় ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে।

সেই সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ ও সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ড. ইউনূস ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন ইউনূসের এসব সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি কতটা আইনানুগভাবে হয়েছে তা তদন্ত করবে বলে দেশবাসী আশা করে।

দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই আসিফ নজরুল

আসিফ নজরুলের দেড় বছরের রাজত্বে সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি ছিল সাব রেজিস্ট্রার বদলি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে। আঠারো মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভালো জায়গায় বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন আসিফ নজরুল। সাধারণ বদলির জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অতীতে কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।

গত বছরের জুনে বাংলাদেশের নিম্ন আদালতে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ২ জুন সারা দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে যায়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ঢালাও বদলি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন জেলার ৩০ জন জেলা ও দায়রা জজ এবং সম পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ৩৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ২২ জন বিচারক এবং সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ এবং সম পদমর্যাদার ১৬২ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে জেলা ও দায়রা জজ/মহানগর দায়রা জজ/চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা/দফতর প্রধান কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে অবিলম্বে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঢালাও বদলির পেছনে রয়েছে দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার নেতৃত্বে ছিলেন আসিফ নজরুল। আসিফ দায়িত্ব গ্রহণের পর, বিচারক বদলি বাণিজ্যের পরিকল্পনা হাতে নেন। তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন চূড়ান্ত করার পর, একযোগে বদলি করা হয়। এই বদলি বাণিজ্য করে আসিফ নজরুল হাতিয়ে নেন কয়েক শ কোটি টাকা।

আসিফ নজরুল টাকার বিনিময়ে বহু আসামির জামিন করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জামিনের বিনিময়ে তিনি কয়েক শ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আসিফ নজরুল হয়ে উঠেছিলেন দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি। প্রধান উপদেষ্টার পরপরই তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছিল। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা তার পরামর্শ অনুযায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর কয়েকজন আমলাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমান ছিলেন অন্যতম। মোখলেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। এ সময় ডিসি নিয়োগে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য গঠিত হয় একটি তদন্ত কমিটি। এই কমিটিতে আসিফ নজরুল ছিলেন একক ক্ষমতার অধিকারী। মোখলেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আসিফ নজরুল তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করেন। বিনিময়ে ডিসি পদায়নে নিজের পছন্দের নাম দিতে শুরু করেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে, যখন চট্টগ্রামের ডিসি পদায়নে আসিফ নজরুলের পছন্দের প্রার্থীর বিপরীতে ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও নাম দেন। দুজনই বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নাম দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর, মোখলেসুর রহমানকে জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

শুধু জেলা প্রশাসক নয়, আসিফ নজরুল অনেক সচিবকে পদায়নের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও ছিলেন। এখানেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। আসিফ নজরুল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। জনশক্তি রপ্তানি খাতে ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সি আছে ১ হাজার ৯৮৮টি। অন্যদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬। শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি সক্রিয় আছে বাংলাদেশে। এমনকি পৃথিবীর বড় বড় বড় শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায়ও এ সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

ইউনূস সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন আরো ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেয় মূলত আসিফ নজরুলের ইচ্ছায়।

আসিফ নজরুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তার একাধিক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এই অভিযোগগুলো তদন্ত করবে বলে দেশবাসী আশা করে।

রিজওয়ানা দম্পতি এখনো বিপুর পাহারাদার—ইউনূস সরকারের আরেক শীর্ষ দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টা ছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী (এবিসি) আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে বিপুর অবৈধ সম্পদের রক্ষক ছিলেন রিজওয়ানা এবং তার স্বামী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিজওয়ানা পক্ষে তার স্বামী দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ করতেন। ১৮ মাসে পরিবেশ খাতেই শুধু নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, তদবিরের মাধ্যমে এই দম্পতি শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

উপদেষ্টা হওয়ার আগে, রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, তাঁদের কোনো সম্পত্তি নেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তাঁদের সম্পত্তির পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে। যা ঘিরে রীতিমতো প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। এ বি সিদ্দিকী যেহেতু নসরুল হামিদ বিপুর সঙ্গে একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, সেই সূত্রেই হামিদ ফ্যাশনে চাকরি করতেন। ২০২৪-এর আগস্টের পর এবি সিদ্দিকী বা উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী নসরুল হামিদ বিপুর নানা সম্পত্তি কেনাবেচার মধ্যস্থতা করছেন। এমনকি এই টাকা বিদেশে পাঠিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম, আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

দুদক এসব অভিযোগ তদন্ত করবে বলে সবাই আশা করেন। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত একটি শুভ সূচনা। ইউনূস শাসনামলে সংঘটিত সকল দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বাংলাদেশ দুর্নীতি প্রতিরোধে এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।