Dhaka 12:30 am, Sunday, 21 June 2026

সুইস ব্যাংকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত: রেকর্ড পাচারের নেপথ্যে কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 11:50:43 am, Saturday, 20 June 2026
  • / 13 Time View

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল নিয়ে নানা মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে জনমনে উদ্ভূত অসন্তোষের পাশাপাশি সমসাময়িক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন দেশের আর্থিক খাতের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে।
অভিযোগ উঠছে, বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী আমলেও দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা)। ২০২৪ সালে এই জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২১ সালের পর এটিই বাংলাদেশিদের আমানত জমার সর্বোচ্চ রেকর্ড এবং গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ সুইজারল্যান্ডে যায়। সিংহভাগ অর্থ পাচার হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে। সুইস ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির এই আনুপাতিক হার হিসাব করলে ধারণা করা যায়, বিগত এক বছরে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের মূলধন বাইরে চলে গেছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের গড় বার্ষিক পাচারের আনুমানিক হিসাবকেও স্পর্শ বা অতিক্রম করেছে।

ফাঁকা বুলি ও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ:
ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার রোধ এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কঠোর প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটেনি বলে সমালোচকরা দাবি করছেন।
সরাসরি অভিযোগের আঙুল উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরের দিকেও। শুরুতে দ্রুত অর্থ ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তিনি একে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেন। তদুপরি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের বিষয়ে বৈধ উপায়ে অর্থ স্থানান্তরের কোনো প্রমাণ না থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়েছে। সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার বিতর্কিত বিদেশ সফর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পদ রক্ষার নেপথ্য ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার অর্থ পাচার রোধে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যথাযথ তদন্তের আগেই গণমাধ্যম ট্রায়াল এবং বেসরকারি খাতের ওপর চড়াও হওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর ফলে প্রকৃত পাচারকারীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে দলমত নির্বিশেষে বিগত ১৭ বছর ধরে ঘটে যাওয়া সকল অর্থ পাচারের ঘটনার নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের দাবি—আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই হোক না কেন, দেশের শত্রু ও অর্থ পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করতে হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সুইস ব্যাংকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত: রেকর্ড পাচারের নেপথ্যে কারা?

Update Time : 11:50:43 am, Saturday, 20 June 2026

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল নিয়ে নানা মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে জনমনে উদ্ভূত অসন্তোষের পাশাপাশি সমসাময়িক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন দেশের আর্থিক খাতের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে।
অভিযোগ উঠছে, বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী আমলেও দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা)। ২০২৪ সালে এই জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২১ সালের পর এটিই বাংলাদেশিদের আমানত জমার সর্বোচ্চ রেকর্ড এবং গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ সুইজারল্যান্ডে যায়। সিংহভাগ অর্থ পাচার হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে। সুইস ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির এই আনুপাতিক হার হিসাব করলে ধারণা করা যায়, বিগত এক বছরে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের মূলধন বাইরে চলে গেছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের গড় বার্ষিক পাচারের আনুমানিক হিসাবকেও স্পর্শ বা অতিক্রম করেছে।

ফাঁকা বুলি ও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ:
ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার রোধ এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কঠোর প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটেনি বলে সমালোচকরা দাবি করছেন।
সরাসরি অভিযোগের আঙুল উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরের দিকেও। শুরুতে দ্রুত অর্থ ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তিনি একে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেন। তদুপরি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের বিষয়ে বৈধ উপায়ে অর্থ স্থানান্তরের কোনো প্রমাণ না থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়েছে। সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার বিতর্কিত বিদেশ সফর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পদ রক্ষার নেপথ্য ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার অর্থ পাচার রোধে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যথাযথ তদন্তের আগেই গণমাধ্যম ট্রায়াল এবং বেসরকারি খাতের ওপর চড়াও হওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর ফলে প্রকৃত পাচারকারীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে দলমত নির্বিশেষে বিগত ১৭ বছর ধরে ঘটে যাওয়া সকল অর্থ পাচারের ঘটনার নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের দাবি—আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই হোক না কেন, দেশের শত্রু ও অর্থ পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করতে হবে।