প্রতিশোধ নয় উন্নয়ন: তারেক রহমানের বার্তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
- Update Time : 11:50:38 am, Friday, 19 June 2026
- / 7 Time View
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পূর্ণ হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক ও জনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের একাংশের মতে, সরকারের ঘোষিত নীতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এখনো স্পষ্ট ফারাক রয়ে গেছে।
সম্প্রতি বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের কল্যাণে কাজ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অনেকেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা হিসেবে দেখছেন।
তবে সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মব সহিংসতার ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, জামিনের পর পুনরায় মামলায় গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। এসব ঘটনা সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে ঘিরে পুলিশের আচরণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
অর্থনৈতিক খাতেও সরকারের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিল্পকারখানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপের কারণে বেসরকারি খাতের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। অর্থমন্ত্রী শিল্প ও বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে নতুন বাজেটে বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণাও দিয়েছেন।
তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের দাবি, কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিতর্কিত বা মিথ্যা মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংক হিসাবের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং বিদেশ ভ্রমণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার মতো বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে না।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সরকার নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অভিযোগ করছেন, পূর্ববর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ এখনো সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছে না। আইন, বিচার ও কূটনৈতিক অঙ্গনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে আগের সময়ের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়েও দলটির ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে, দলীয়করণ ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগও সামনে এসেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনার ওপর জোর দিলেও মাঠপর্যায়ে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, সরকার গঠনের পর প্রাথমিক যে সময়টুকু জনসমর্থনের সুবিধা পাওয়া যায়, সেই সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। মানুষ শান্তি, স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দেখতে চায়।
তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে চাইলে প্রশাসনে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক জনবলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। অন্যথায় জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব অর্জনের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।



















