র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি বিল সংসদে পাস
- Update Time : 12:23:50 pm, Thursday, 10 September 2026
- / 1 Time View
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ পর্যায়ে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপন করেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
বিলের ওপর সাতটি আপত্তি জানায় বিরোধী দল।
নোট অব ডিসেন্টে বিরোধী সদস্যরা বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের আগে যথাযথ জাতীয় পরামর্শ ও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের আপত্তির মধ্যে রয়েছে বিলটি দ্রুত পাস, র্যাবের জনবল-সম্পদ ও রেকর্ড সরাসরি এসআরবিতে হস্তান্তর, অভিযোগ তদন্তের কাঠামো, গ্রেফতার ও আটকের ক্ষমতা, প্রশিক্ষণ এবং বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকারকারী সদস্যদের সুরক্ষা।
তাদের আশঙ্কা, যথাযথ স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন এসআরবি র্যাবেরই নতুন নাম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ জন্য রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কমিটির সুপারিশসহ বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধীদলীয় নেতা এর বিরোধিতা করে বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠন জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। তিনি বলেন, ‘এই আইনটা কোনও অবস্থায় পাস করা উচিত না।’
বিলে যা আছে
বিলে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
বিলের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে।’ সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী, পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল ও কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিট গঠন করবে। এর সদর দফতর থাকবে ঢাকায়।
এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশের অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। তিনি ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
যেসব দায়িত্ব থাকবে
বিলের ১০ ধারায় এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করবে ইউনিটটি। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে এসআরবি।
তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা
বিলের ১২ ধারায় এসআরবিকে কোনও স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে।
১৩ ধারায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব ইউনিটের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে গ্রেফতার করা ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে রাখা যাবে না।
বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে বা জব্দকৃত আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করিবেন।’
ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত
আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক এসআরবি মহাপরিচালককে কোনও ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনও সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন। তদন্তের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।
শৃঙ্খলা লঙ্ঘন ও শাস্তি
বিলের ১৭ ধারায় কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত বা অসদাচরণ, অনুমতি ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ, আটক বা গ্রেফতার থেকে পালানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য করাকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম ক্ষতি বা হারানো, বলপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত হওয়াও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তি হিসেবে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্ত এবং বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের বিধান রাখা হয়েছে। লঘুদণ্ড হিসেবে জরিমানা, তিরস্কার, কোয়ার্টার গার্ডে আটক এবং অতিরিক্ত ড্রিলের বিধান রয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনও সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে। আপিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
অভিযোগ প্রতিকার কমিটি
এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে এসআরবির কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের প্রতিনিধি, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি থাকবেন।
বিরোধী সদস্যদের আপত্তি ছিল, অভিযোগ প্রতিকার কমিটির নেতৃত্বে এসআরবির কর্মকর্তারা থাকায় এর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তারা অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিটি এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বার কাউন্সিল, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব দেন।
আটকের বিষয়ে বিধান
বিলে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে সদস্যকে আটক করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। কোনও সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন অন্তর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। ‘আটককৃত সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনও প্রমাণ না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।’
বিরোধী সদস্যরা বেসামরিক ব্যক্তিকে কোথায় ও কতক্ষণ আটক রাখা যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানান। প্রতিটি হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের তথ্য গেজেটে প্রকাশ এবং হেফাজতের বিস্তারিত রেজিস্টার সংরক্ষণের প্রস্তাবও দেন তারা।
প্রশিক্ষণ ও বেআইনি আদেশ
বিলে এসআরবির সদস্যদের প্রশিক্ষণের বিধান থাকলেও প্রশিক্ষণের মেয়াদ ও মানদণ্ড পরে বিধির মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বিরোধী সদস্যরা প্রশিক্ষণ শেষ করে সনদ না পাওয়া পর্যন্ত ফৌজদারি তদন্তের ক্ষমতা না দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
একইসঙ্গে বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকারকারী বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের তথ্য দেওয়া সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়েও তারা স্পষ্ট বিধানের দাবি জানান।
র্যাবের সম্পদ-জনবল এসআরবিতে
আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে র্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। তবে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকের অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাববহি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিল এসআরবির অনুকূলে ‘তৎক্ষণাৎ স্থানান্তরিত এবং ন্যস্ত বা অর্পিত’ হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি এবং জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতার প্রয়োজন বেড়েছে। সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ, চরমপন্থা, মানবপাচার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধে আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একইসঙ্গে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এসআরবি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।