Dhaka 3:27 pm, Wednesday, 28 October 2026
সর্বশেষ
জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশের মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিক্যাল পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর ডিআইজির ভাড়া বাসায় অভিযান, সাজা নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে জেটরোর প্রতি আহ্বান স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে : মীর শাহে আলম ইউপি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা, কঠোর হবে আচরণবিধি আইসিসিবিতে ফার্নিচার মেলা, ৩২৩ স্টলে পণ্যের সমাহার ৮৫ জনের কারাদণ্ড: সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি? কন্ট্রোল টাওয়ারে নজরদারির সুযোগ, তবু শনাক্তের বাইরে শত শত গাড়ি

ডিআইজির ভাড়া বাসায় অভিযান, সাজা নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 07:14:31 am, Wednesday, 28 October 2026
  • / 10 Time View

ঢাকার পূর্বাচলে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। আটক ব্যক্তিদের মাদক গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই সাজা দেওয়া, অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড জব্দ তালিকায় না রাখাসহ একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী। নারীদের ১৫ দিন এবং পুরুষদের এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি নারীদের ৫০০ ও পুরুষদের এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। তার বাবার দাবি, অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ পেয়ে ছেলে সেখানে গিয়েছিলেন। মাদক গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন সাজাপ্রাপ্তের স্বজনের অভিযোগ, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডিবির ৪০ থেকে ৫০ সদস্যের একটি দল বাড়িটিতে প্রবেশ করে। পরে উপস্থিত ৮৫ জনকে দুটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। তল্লাশির সময় প্রথম দফায় কোনো মাদক পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। দ্বিতীয় দফায় দুটি খালি মদের বোতল পাওয়া যায়।

তবে ডিবির জব্দ তালিকায় চারটি মদের বোতল— একটি খালি, একটি পূর্ণ ও দুটি আংশিক পূর্ণ উদ্ধারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

পাশাপাশি একটি ইয়াবা বড়ি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও সামান্য পরিমাণ কুশ উদ্ধারের তথ্যও রয়েছে। 

অভিযানের সময় বাড়ির ছয়টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে চারটি খুলে নেওয়া হয় এবং বাকি দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মেমোরি কার্ড নেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। তবে এসব কার্ড জব্দ তালিকায় উল্লেখ না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান আটক ব্যক্তিদের সাজা দেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় মাদক গ্রহণ করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিঘ্নিত করা, বিরক্তিকর আচরণ কিংবা গাড়ি চালানোর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান বলেন, আসামিরা দোষ স্বীকার করায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে সাজা দেওয়ার আগে মাদক গ্রহণের পরীক্ষা করা হয়নি বলে তিনিও উল্লেখ করেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, শুধু দোষ স্বীকারের ভিত্তিতে মাদক গ্রহণের দায়ে সাজা দেওয়া যথেষ্ট নয়। মাদক পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণের সুযোগ ছিল।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের ভিডিও পুলিশ সদস্যরা ধারণ করেন। পরে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়লে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। 

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব ভিডিও ছড়িয়ে থাকলে তা আইনগত সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না, খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাড়িটির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির। অভিযান ও তা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়ন নিয়ে পুলিশের প্রভাবশালী একটি পক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। তবে এ বিরোধের সঙ্গে অভিযানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না সেটি নিশ্চিত হয়নি।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবীরের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চালানো হয়েছে। বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলত। অন্যদিকে আবদুল্লাহ আল জহির বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই করা যেত।

এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ১০১ জন নাগরিক। ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, নারীপক্ষ ও সপ্রাণ যৌথভাবে দেওয়া বিবৃতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ডিআইজির ভাড়া বাসায় অভিযান, সাজা নিয়ে বিতর্ক

Update Time : 07:14:31 am, Wednesday, 28 October 2026

ঢাকার পূর্বাচলে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। আটক ব্যক্তিদের মাদক গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই সাজা দেওয়া, অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড জব্দ তালিকায় না রাখাসহ একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী। নারীদের ১৫ দিন এবং পুরুষদের এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি নারীদের ৫০০ ও পুরুষদের এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। তার বাবার দাবি, অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ পেয়ে ছেলে সেখানে গিয়েছিলেন। মাদক গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন সাজাপ্রাপ্তের স্বজনের অভিযোগ, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডিবির ৪০ থেকে ৫০ সদস্যের একটি দল বাড়িটিতে প্রবেশ করে। পরে উপস্থিত ৮৫ জনকে দুটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। তল্লাশির সময় প্রথম দফায় কোনো মাদক পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। দ্বিতীয় দফায় দুটি খালি মদের বোতল পাওয়া যায়।

তবে ডিবির জব্দ তালিকায় চারটি মদের বোতল— একটি খালি, একটি পূর্ণ ও দুটি আংশিক পূর্ণ উদ্ধারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

পাশাপাশি একটি ইয়াবা বড়ি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও সামান্য পরিমাণ কুশ উদ্ধারের তথ্যও রয়েছে। 

অভিযানের সময় বাড়ির ছয়টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে চারটি খুলে নেওয়া হয় এবং বাকি দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মেমোরি কার্ড নেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। তবে এসব কার্ড জব্দ তালিকায় উল্লেখ না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান আটক ব্যক্তিদের সাজা দেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় মাদক গ্রহণ করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনশান্তি বিঘ্নিত করা, বিরক্তিকর আচরণ কিংবা গাড়ি চালানোর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান বলেন, আসামিরা দোষ স্বীকার করায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে সাজা দেওয়ার আগে মাদক গ্রহণের পরীক্ষা করা হয়নি বলে তিনিও উল্লেখ করেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, শুধু দোষ স্বীকারের ভিত্তিতে মাদক গ্রহণের দায়ে সাজা দেওয়া যথেষ্ট নয়। মাদক পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণের সুযোগ ছিল।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের ভিডিও পুলিশ সদস্যরা ধারণ করেন। পরে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়লে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। 

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব ভিডিও ছড়িয়ে থাকলে তা আইনগত সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না, খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাড়িটির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির। অভিযান ও তা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলি ও পদায়ন নিয়ে পুলিশের প্রভাবশালী একটি পক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। তবে এ বিরোধের সঙ্গে অভিযানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না সেটি নিশ্চিত হয়নি।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবীরের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চালানো হয়েছে। বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলত। অন্যদিকে আবদুল্লাহ আল জহির বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই করা যেত।

এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ১০১ জন নাগরিক। ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, নারীপক্ষ ও সপ্রাণ যৌথভাবে দেওয়া বিবৃতিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।