বরাদ্দ রয়েছে, নেই নির্ধারিত সংখ্যক এতিম
- Update Time : 10:08:30 am, Thursday, 27 August 2026
- / 2 Time View
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার টোনা ইসলামিয়া এতিমখানা। বুধবার তোলা। কালের কণ্ঠ
নড়াইলে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া বেসরকারি এতিমখানাগুলোতে নির্ধারিত সংখ্যক এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের বিপরীতে শিশু রয়েছে অর্ধেকেরও কম।
কোনটি কার্যক্রমহীন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বাবা-মা দুজনই জীবিত – এমন শিক্ষার্থীকে এতিম দেখিয়ে রাখা হয়েছে।
নড়াইল সমাজসেবা অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ৪১টি বেসরকারি এতিমখানা রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশেই ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট (মাথাপিছু বা প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত আর্থিক অনুদান বা বরাদ্দ)-এর জন্য দেখানো শিশুর সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাদের তালিকা অনুযায়ী জেলার ৪১টি বেসরকারি এতিমখানার মধ্যে নড়াইল পৌরসভায় চারটি, সদর উপজেলায় ৯টি, লোহাগড়া উপজেলায় ১৮টি এবং কালিয়া উপজেলায় ১০টি এতিমখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতিপালনের জন্য সরকারি ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট বা মাথাপিছু বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধিত এতিমখানায় অন্তত ১০ জন এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু থাকার কথা। পাশাপাশি ক্যাপিটেশন গ্র্যান্টের জন্য যতজন শিশুর নাম দেখানো হয়, তার দ্বিগুণ শিশুর উপস্থিত থাকার নিয়ম রয়েছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার টোনা ইসলামিয়া এতিমখানায় ৫০ জন এতিম শিশুর জন্য মাসে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। ছয় মাস পর প্রতিষ্ঠানটি একসঙ্গে ছয় লাখ টাকা তোলে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু সরেজমিন প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়,এতিমখানার সাইনবোর্ড বসানো রয়েছে যে ঘরটিতে, তা প্রায় ফাঁকা। সেখানে কতজন শিশু থাকে, জানতে চাইলে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারেননি।
তবে মুঠোফোনে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মো. আলমগীরের সঙ্গে।
তিনি দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠানে ৩৫ জন শিশু রয়েছে, যাদের নিয়মিত এতিমখানা থেকে খাবার দেওয়া হয়৷ কিন্তু ৫০ জনের বিপরীতে যেখানে ১০০ জন এতিম শিশু থাকার কথা, সেখানে মাত্র ৩৫ জন কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এতিম পাবো কই? যা আছে তাই দিয়ে চলছে।’
যদিও টোনা ইসলামিয়া এতিমখানায় থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘এখানে আমরা ১৫ থেকে ২০ জন থাকি।’
শামিম মোল্যা নামের আরেক শিক্ষার্থী জানায়, তার বাবা ও মা দুইজনই জীবিত। তার পরও ওই এতিমখানায় থাকে শামিম। সে জানায়, সকালে তারা ডাল, আলুভর্তা ও ভাজি খেয়েছে। আর তারা ওই এতিমখানায় ২৫ থেকে ৩০ জন থাকে।
এতিমখানায় কতজন শিক্ষার্থী থাকে- এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি সেখানে দায়িত্বরত শিক্ষক হাফেজ শাহা জাম্মান। পরে জানান, প্রতিদিন ২৫ জনের খাবার রান্না হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত কালিয়া উপজেলার আরেকটি এতিমখানা হলো পাখিমারা শামছুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানা। প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ে। সেখানকার রান্নাঘর দীর্ঘদিন দিন ধরে তালাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা গ্রামের বাড়িতে লজিং থাকে এবং সেই বাড়িতেই খাবার খায়।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক হাফেজ আব্দুল রহিম বলেন,‘গ্যাস না থাকায় মাস খানেক রান্না বন্ধ রয়েছে। সবসময় রান্না হয় না, মাঝেমধ্যে হয়। শিক্ষার্থীরা অন্যের বাড়িতে খায়।’
এদিকে, ১৮ জনের ক্যাপিটেশন গ্র্যান্টের বিপরীতে ৩৬ জন শিশুর নাম থাকার কথা কালিয়া উপজেলার দেবদূন মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানায়। সেখানে দায়িত্বরত শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে এতিমের সংখ্যা কম। দুস্থ ও অসহায় শিশুসহ ১৮ জন শিশু রয়েছে। তবে কাগজ-কলমে ৩৬ জনের হিসাব রয়েছে।
তালিকায় নাম থাকা লোহাগড়া উপজেলার কালনা চরকরফা হাসানূল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানায় গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ পড়ে রয়েছে এতিমখানা ভবন। সাইনবোর্ড ফেলে রাখা সড়কের পাশে। প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ধরনের কার্যক্রম নেই। স্থানীয়রা জানায়, নানা সমস্যার কারণে এতিমখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শুধু এই চারটি প্রতিষ্ঠান নয়, তালিকায় থাকা নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চাচই ইসমাইল হোসেন মাদরাসা ও এতিমখানা, একই উপজেলার মণ্ডলভাগ আক্তার হোসেন এতিমখানা, কালিয়া উপজেলার খাশিয়াল ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা ও এতিমখানা, একই উপজেলার বাঐসোনা আশরাফিয়া এতিমখানা, সদর উপজেলার জঙ্গলগ্রাম মুসলিম এতিমখানা, একই উপজেলার মিরাপাড়া এতিমখানাসহ জেলার অধিকাংশ এতিমখানায় ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট অনুযায়ী এতিম ও দুস্থ শিশু পাওয়া যায়নি।
এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের কাছে শিশু কম থাকার কারণ জানতে চাইলে কেউই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে কয়েকজন পরিচালক ও শিক্ষকের দাবি, সরকার যে টাকা দেয়, তা দিয়ে এতিমখানার শিক্ষকদের বেতন এবং শিশুদের খাবার, চিকিৎসা, পোশাক ও অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণে নানা উপায়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়।
এ ব্যাপারে মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারি এতিমখানা সমিতির সভাপতি বরাশুলা এতিম ইছুব আলী বলেন, ‘আমাদের সংঠনের কার্যক্রম এখন তেমন নেই। এ কারণে তদারকি করা হয় না। কোনো এতিমখানায় সমস্যা থাকলে সমাজসেবা অধিদপ্তর তার ব্যবস্থা নেবে।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এ টি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আবেদন গ্রহণ করি অনলাইনে। নাম দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেক শিশুর জন্য আলাদা রেজিস্ট্রেশন থাকে। এগুলো উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দেখেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।










