Dhaka 11:25 pm, Monday, 24 August 2026
সর্বশেষ
এক ছাদের নিচে সরকারি সেবা, দাউদপুরে প্রশংসিত উদ্যোগ চীনে বিয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগ, বাংলাদেশকে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ পরীমণির গাড়ি বিতর্কে নামের ভুলে কি বদলে গিয়েছিল আসল পরিচয়? এনওসি ছাড়াই বিদেশ সফরে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভারত সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ ভারতবিরোধী রাজনীতির ফাঁদে পড়লে বিপদ বিএনপিরই ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল উগ্রবাদকে ছাড় নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগই হতে পারে সমাধান ক্ষমাপ্রার্থনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঐতিহাসিক জবাবদিহি কলকাতায় হোটেলে আগুন, কুষ্টিয়ার সাংবাদিকসহ পরিবারের চারজন নিহত

এক ছাদের নিচে সরকারি সেবা, দাউদপুরে প্রশংসিত উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 11:34:19 am, Monday, 24 August 2026
  • / 11 Time View

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা সদরে যেতে হবে না, বরং সরকারি সেবাই পৌঁছে যাবে মানুষের বাড়ির কাছাকাছি—এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সময়, অর্থ ও শারীরিক দুর্ভোগ কমাতে দাউদপুর ইউনিয়নের বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে একদিনের জন্য বসানো হয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত সেবা কেন্দ্র। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, কৃষি পরামর্শ, গবাদিপশুর চিকিৎসা, ভূমিসেবা—সবকিছুই মিলেছে একই স্থানে। প্রশাসনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেছেন।

রৌদ্রোজ্জ্বল সোমবার সকালে বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের চেনা সরকারি দপ্তরের পরিবর্তে সেখানে সারি সারি বুথ। স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নির্বাচন অফিস, সমাজসেবা, ভূমি ও সমবায় অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ বুথে বসে সরাসরি সেবা দিচ্ছেন।

৫৫ বছর বয়সী ফালানি বেগমের জন্য এ উদ্যোগ ছিল বিশেষ স্বস্তির। বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম সংশোধনের জন্য উপজেলা সদরে যাওয়া তার পক্ষে কঠিন। তার ওপর যাতায়াতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও ছিল দুশ্চিন্তার। কিন্তু বাড়ির কাছেই সংশোধনসংক্রান্ত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তার সেই ভোগান্তি দূর হয়েছে।

শুধু ফালানি বেগম নন, দাউদপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার হাজারো মানুষ এদিন একইভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিয়েছেন। কারও জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্যা, কারও গবাদিপশুর চিকিৎসা, কেউ কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছেন। একদিনের জন্য ইউনিয়নটি যেন পরিণত হয়েছিল একটি ‘মিনি উপজেলা’য়।

উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, গত বছর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ট’ প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার এক হাজার তরুণ-তরুণীকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এবার দাউদপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন দপ্তর থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন।

বেলদী থেকে গরুর চিকিৎসা নিতে আসা আশরাফুজ্জান ফরিদ বলেন, ‘বাজান, বয়সতো আর কম অইলো না। এতোখানি বয়সে এমুন সুন্দর নিয়ম দেহি নাই। আমাগো দাউদপুর থেইক্যা প্রাণী অফিসো যাইতে দেড় ঘন্টা লাগবো। আবার ভাড়াও লাগে অনেক। বাড়ির কাছে এমুন সুযোগ পাইয়া উপকার অইছে।’

একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় থাকা বেলদীর রাশিদা বেগমও এ উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকা বাড়ির কাছে সুযোগ পাইয়া ভালাই লাগতাছে।’

কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব সফেদ আলীর ভাষায়, ‘বাজান, জীবনে অনেক কিছু দেখছি। তয় এতো সুন্দর কইরা উপজেলা প্রশাসন সেবা দিয়া গেলো এলাকায় আইয়া। এইডা জীবনে দেহি নাই।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাসভীর যোবায়ের বলেন, ‘আমার চাকরির ইতিহাসে এমনটা কোথাও দেখিনি। সাধারণত মানুষ উপজেলা কিংবা হাসপাতালে সেবা নিতে আসে। কিন্তু এখানে উপজেলার সব দপ্তর, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানুষের এলাকায় গিয়ে সেবা দিয়েছে।’

এ সময় রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন, সাধারণ সম্পাদক বাশিরউদ্দিন বাচ্চুসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে এ উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয়। তার পরিকল্পনায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্যও পৃথক বুথ স্থাপন করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘দাউদপুর ইউনিয়ন একটি রিমোট এরিয়া। এখান থেকে উপজেলা কিংবা হাসপাতালে এসে সেবা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। কেউ শারীরিক অক্ষমতার কারণে আসতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে যাতায়াতে দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়। এ চিন্তা থেকেই সব দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা বুথ করা হয়েছে। যেন যার যে সমস্যা, তিনি সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারেন।’

তিনি জানান, দাউদপুর ইউনিয়ন দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এ ধরনের সেবা কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশাসনের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্বও কমেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এক ছাদের নিচে সরকারি সেবা, দাউদপুরে প্রশংসিত উদ্যোগ

Update Time : 11:34:19 am, Monday, 24 August 2026

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা সদরে যেতে হবে না, বরং সরকারি সেবাই পৌঁছে যাবে মানুষের বাড়ির কাছাকাছি—এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সময়, অর্থ ও শারীরিক দুর্ভোগ কমাতে দাউদপুর ইউনিয়নের বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে একদিনের জন্য বসানো হয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত সেবা কেন্দ্র। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, কৃষি পরামর্শ, গবাদিপশুর চিকিৎসা, ভূমিসেবা—সবকিছুই মিলেছে একই স্থানে। প্রশাসনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেছেন।

রৌদ্রোজ্জ্বল সোমবার সকালে বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের চেনা সরকারি দপ্তরের পরিবর্তে সেখানে সারি সারি বুথ। স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নির্বাচন অফিস, সমাজসেবা, ভূমি ও সমবায় অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ বুথে বসে সরাসরি সেবা দিচ্ছেন।

৫৫ বছর বয়সী ফালানি বেগমের জন্য এ উদ্যোগ ছিল বিশেষ স্বস্তির। বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম সংশোধনের জন্য উপজেলা সদরে যাওয়া তার পক্ষে কঠিন। তার ওপর যাতায়াতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও ছিল দুশ্চিন্তার। কিন্তু বাড়ির কাছেই সংশোধনসংক্রান্ত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তার সেই ভোগান্তি দূর হয়েছে।

শুধু ফালানি বেগম নন, দাউদপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার হাজারো মানুষ এদিন একইভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিয়েছেন। কারও জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্যা, কারও গবাদিপশুর চিকিৎসা, কেউ কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছেন। একদিনের জন্য ইউনিয়নটি যেন পরিণত হয়েছিল একটি ‘মিনি উপজেলা’য়।

উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, গত বছর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ট’ প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার এক হাজার তরুণ-তরুণীকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এবার দাউদপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন দপ্তর থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন।

বেলদী থেকে গরুর চিকিৎসা নিতে আসা আশরাফুজ্জান ফরিদ বলেন, ‘বাজান, বয়সতো আর কম অইলো না। এতোখানি বয়সে এমুন সুন্দর নিয়ম দেহি নাই। আমাগো দাউদপুর থেইক্যা প্রাণী অফিসো যাইতে দেড় ঘন্টা লাগবো। আবার ভাড়াও লাগে অনেক। বাড়ির কাছে এমুন সুযোগ পাইয়া উপকার অইছে।’

একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় থাকা বেলদীর রাশিদা বেগমও এ উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকা বাড়ির কাছে সুযোগ পাইয়া ভালাই লাগতাছে।’

কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব সফেদ আলীর ভাষায়, ‘বাজান, জীবনে অনেক কিছু দেখছি। তয় এতো সুন্দর কইরা উপজেলা প্রশাসন সেবা দিয়া গেলো এলাকায় আইয়া। এইডা জীবনে দেহি নাই।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাসভীর যোবায়ের বলেন, ‘আমার চাকরির ইতিহাসে এমনটা কোথাও দেখিনি। সাধারণত মানুষ উপজেলা কিংবা হাসপাতালে সেবা নিতে আসে। কিন্তু এখানে উপজেলার সব দপ্তর, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানুষের এলাকায় গিয়ে সেবা দিয়েছে।’

এ সময় রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন, সাধারণ সম্পাদক বাশিরউদ্দিন বাচ্চুসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে এ উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয়। তার পরিকল্পনায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্যও পৃথক বুথ স্থাপন করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘দাউদপুর ইউনিয়ন একটি রিমোট এরিয়া। এখান থেকে উপজেলা কিংবা হাসপাতালে এসে সেবা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। কেউ শারীরিক অক্ষমতার কারণে আসতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে যাতায়াতে দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়। এ চিন্তা থেকেই সব দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা বুথ করা হয়েছে। যেন যার যে সমস্যা, তিনি সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারেন।’

তিনি জানান, দাউদপুর ইউনিয়ন দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এ ধরনের সেবা কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশাসনের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্বও কমেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা হবে।