Dhaka 3:21 am, Sunday, 23 August 2026
সর্বশেষ
পরীমণির গাড়ি বিতর্কে নামের ভুলে কি বদলে গিয়েছিল আসল পরিচয়? এনওসি ছাড়াই বিদেশ সফরে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভারত সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ ভারতবিরোধী রাজনীতির ফাঁদে পড়লে বিপদ বিএনপিরই ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল উগ্রবাদকে ছাড় নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগই হতে পারে সমাধান ক্ষমাপ্রার্থনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঐতিহাসিক জবাবদিহি কলকাতায় হোটেলে আগুন, কুষ্টিয়ার সাংবাদিকসহ পরিবারের চারজন নিহত মাদক নির্মূলে দরকার মাঠ প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগ, রূপগঞ্জ হতে পারে দৃষ্টান্ত লোহাগাড়ায় এক তহসিলদারের ওপেন ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়া আধুনগর ভূমি অফিস

পরীমণির গাড়ি বিতর্কে নামের ভুলে কি বদলে গিয়েছিল আসল পরিচয়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 02:57:07 pm, Saturday, 22 August 2026
  • / 14 Time View

চিত্রনায়িকা তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও বিনোদনজগতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই কয়েক বছর আগের বহুল আলোচিত পরীমণি ও ‘মাসরুর’ বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। তবে পুরোনো সেই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে উঠছে—পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগে যে ‘মাসরুর’ নামটি আলোচনায় এসেছিল, তিনি আসলে কে?

২০২১ সালে এ ঘটনায় সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিনের নাম বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মাসরুর আরেফিন শুরু থেকেই অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন। পরবর্তীতে দৈনিক ইত্তেফাকও প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার নাম ভুলভাবে আসার বিষয়টি স্বীকার করে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে।

অন্যদিকে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি এবং গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, ওই বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে মাসরুর আরেফিন নন; বরং তিনি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী।

এই বয়ান অনুযায়ী, বোট ক্লাবকাণ্ডের পর পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের বক্তব্যে যে ‘মাসরুর’-এর ইঙ্গিত ছিল, তিনি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। তবে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় নামের এই বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম আলোচনায় আসে—এমন দাবিও এখন সামনে এসেছে।

সেই সময় সিটি ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। ফলে প্রচারিত সূত্রের দাবি, ‘মাসরুর’ নামের বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে প্রকৃত ব্যক্তিকে আড়াল করা এবং অন্যদিকে মাসরুর আরেফিনকে বিতর্কে জড়িয়ে শওকত আজিজ রাসেলের ওপর চাপ সৃষ্টি—দুটি বিষয়ই ঘটনার পেছনে কাজ করে থাকতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ওই বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ঘটনার কিছুদিন আগে দুবাইয়ে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর সঙ্গে পরীমণির সাক্ষাৎ নিয়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও মাসরুর হোসেন মিতুর দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তৎকালীন রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তবতার কারণে এসব অভিযোগ ও আলোচনার অনেক কিছুই সে সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি—এমন বক্তব্যও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। একই সঙ্গে পরীমণির বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে মামলা ও বিভিন্ন আইনি জটিলতার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন ও অনুমান রয়েছে।

পুরো বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একই ‘মাসরুর’ নামের কারণে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেও প্রকৃতপক্ষে অন্য একজনকে বোঝানো হয়েছিল কি না। অর্থাৎ খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আড়ালে রাখতে গিয়ে ভুলভাবে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম সামনে চলে এসেছিল—বর্তমানের প্রচারিত বয়ানের মূল বক্তব্য এমনই।

পরীমণিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে ২০২১ সালের আগস্টে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ওই সময় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নামও উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে পরীমণির সঙ্গে কথিত অডিও রেকর্ডে গাড়ি উপহারের প্রসঙ্গ থাকার দাবি করা হয়। পাশাপাশি সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামের একজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাসরুর আরেফিন অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, পরীমণি নামের কাউকে তিনি কখনো দেখেননি, তার সঙ্গে তার কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই এবং তার ফোন নম্বরও তার কাছে থাকার প্রশ্ন ওঠে না।

মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, তার জীবনের বড় অংশ ব্যাংকিং পেশা ও সাহিত্যচর্চায় কেটেছে। তিনি ক্লাব বা পার্টিতে যাতায়াত করেন না বলেও উল্লেখ করেন। ঢাকার ক্লাবকেন্দ্রিক সামাজিক পরিসরে যারা চলাফেরা করেন, তাদের কেউ তাকে সেখানে দেখেছেন—এমন দাবিও করতে পারবেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে তার বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ‘শওকত রুবেল’ নামটি নিয়ে। মাসরুর আরেফিন জানান, সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামে কোনো ব্যক্তি নেই। তার ধারণা ছিল, প্রতিবেদনে হয়তো ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নাম ভুলভাবে লেখা হয়েছে।

তার যুক্তি ছিল, একটি প্রতিবেদনে যদি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পরিচয়ই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে একই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে গাড়ি উপহারের যে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হলো—সে প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই ওঠে।

ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক নোটিশে আগের প্রতিবেদনের ভুল স্বীকার করে।

সেখানে জানানো হয়, ৮ আগস্ট ‘পরীমনি ও পিয়াসার সঙ্গে ২১ প্রভাবশালীর সম্পর্ক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এক জায়গায় ভুলবশত একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম ছাপা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামও প্রকাশ করা হয়।

ইত্তেফাক স্পষ্টভাবে স্বীকার করে যে দুটি তথ্যই ভুল ছিল এবং পরীমণির ঘটনার সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভুলবশত তার নাম প্রকাশিত হওয়ায় ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার জন্য সংবাদপত্রটি তার ও তার পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।

ফলে ২০২১ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—পরীমণিকে গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের নাম জড়ালেও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নিজেই তার নাম প্রকাশকে ভুল হিসেবে স্বীকার করেছিল।

বর্তমানে বিতর্কটি আবার আলোচনায় আসার মূল কারণ এখানেই। একদিকে রয়েছে ২০২১ সালের সংবাদে ভুলভাবে উঠে আসা মাসরুর আরেফিনের নাম, তার প্রকাশ্য অস্বীকৃতি এবং পরে ইত্তেফাকের ভুল স্বীকার। অন্যদিকে রয়েছে নতুন করে সামনে আসা দাবি—পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ ছিলেন খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু।

এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে অবশ্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য বা সূত্রের দাবি নিজে থেকেই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তবে পুরোনো সংবাদ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রকাশ্য ভুল স্বীকার—সবকিছু মিলিয়ে ‘মাসরুর’ নামটি ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, সেটি যে বাস্তব ছিল, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ কম।

পরীমণির গাড়ি বিতর্ক তাই এখন শুধু একটি গাড়ি উপহারের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিচয় বিভ্রান্তি, সংবাদ প্রকাশের নির্ভুলতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এবং একটি ভুল নাম কীভাবে একজন ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদায় প্রভাব ফেলতে পারে—সেই প্রশ্নও।

সবশেষে মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে কে? ২০২১ সালের নথিভুক্ত ঘটনাপ্রবাহ বলছে, মাসরুর আরেফিনের নাম প্রকাশ করা হয়েছিল ভুলভাবে এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম পরবর্তীতে তা স্বীকারও করেছে। আর এখন প্রচারিত নতুন বয়ান দাবি করছে, সেই ‘মাসরুর’ ছিলেন খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। ফলে পুরোনো বিতর্কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে নামের সেই বিভ্রান্তিই।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পরীমণির গাড়ি বিতর্কে নামের ভুলে কি বদলে গিয়েছিল আসল পরিচয়?

Update Time : 02:57:07 pm, Saturday, 22 August 2026

চিত্রনায়িকা তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও বিনোদনজগতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই কয়েক বছর আগের বহুল আলোচিত পরীমণি ও ‘মাসরুর’ বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। তবে পুরোনো সেই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে উঠছে—পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগে যে ‘মাসরুর’ নামটি আলোচনায় এসেছিল, তিনি আসলে কে?

২০২১ সালে এ ঘটনায় সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিনের নাম বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মাসরুর আরেফিন শুরু থেকেই অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন। পরবর্তীতে দৈনিক ইত্তেফাকও প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার নাম ভুলভাবে আসার বিষয়টি স্বীকার করে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে।

অন্যদিকে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি এবং গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, ওই বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে মাসরুর আরেফিন নন; বরং তিনি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী।

এই বয়ান অনুযায়ী, বোট ক্লাবকাণ্ডের পর পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের বক্তব্যে যে ‘মাসরুর’-এর ইঙ্গিত ছিল, তিনি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। তবে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় নামের এই বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম আলোচনায় আসে—এমন দাবিও এখন সামনে এসেছে।

সেই সময় সিটি ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। ফলে প্রচারিত সূত্রের দাবি, ‘মাসরুর’ নামের বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে প্রকৃত ব্যক্তিকে আড়াল করা এবং অন্যদিকে মাসরুর আরেফিনকে বিতর্কে জড়িয়ে শওকত আজিজ রাসেলের ওপর চাপ সৃষ্টি—দুটি বিষয়ই ঘটনার পেছনে কাজ করে থাকতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ওই বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ঘটনার কিছুদিন আগে দুবাইয়ে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর সঙ্গে পরীমণির সাক্ষাৎ নিয়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও মাসরুর হোসেন মিতুর দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তৎকালীন রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তবতার কারণে এসব অভিযোগ ও আলোচনার অনেক কিছুই সে সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি—এমন বক্তব্যও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। একই সঙ্গে পরীমণির বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে মামলা ও বিভিন্ন আইনি জটিলতার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন ও অনুমান রয়েছে।

পুরো বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একই ‘মাসরুর’ নামের কারণে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেও প্রকৃতপক্ষে অন্য একজনকে বোঝানো হয়েছিল কি না। অর্থাৎ খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আড়ালে রাখতে গিয়ে ভুলভাবে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম সামনে চলে এসেছিল—বর্তমানের প্রচারিত বয়ানের মূল বক্তব্য এমনই।

পরীমণিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে ২০২১ সালের আগস্টে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ওই সময় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নামও উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে পরীমণির সঙ্গে কথিত অডিও রেকর্ডে গাড়ি উপহারের প্রসঙ্গ থাকার দাবি করা হয়। পাশাপাশি সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামের একজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাসরুর আরেফিন অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, পরীমণি নামের কাউকে তিনি কখনো দেখেননি, তার সঙ্গে তার কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই এবং তার ফোন নম্বরও তার কাছে থাকার প্রশ্ন ওঠে না।

মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, তার জীবনের বড় অংশ ব্যাংকিং পেশা ও সাহিত্যচর্চায় কেটেছে। তিনি ক্লাব বা পার্টিতে যাতায়াত করেন না বলেও উল্লেখ করেন। ঢাকার ক্লাবকেন্দ্রিক সামাজিক পরিসরে যারা চলাফেরা করেন, তাদের কেউ তাকে সেখানে দেখেছেন—এমন দাবিও করতে পারবেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে তার বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ‘শওকত রুবেল’ নামটি নিয়ে। মাসরুর আরেফিন জানান, সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামে কোনো ব্যক্তি নেই। তার ধারণা ছিল, প্রতিবেদনে হয়তো ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নাম ভুলভাবে লেখা হয়েছে।

তার যুক্তি ছিল, একটি প্রতিবেদনে যদি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পরিচয়ই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে একই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে গাড়ি উপহারের যে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হলো—সে প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই ওঠে।

ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক নোটিশে আগের প্রতিবেদনের ভুল স্বীকার করে।

সেখানে জানানো হয়, ৮ আগস্ট ‘পরীমনি ও পিয়াসার সঙ্গে ২১ প্রভাবশালীর সম্পর্ক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এক জায়গায় ভুলবশত একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম ছাপা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামও প্রকাশ করা হয়।

ইত্তেফাক স্পষ্টভাবে স্বীকার করে যে দুটি তথ্যই ভুল ছিল এবং পরীমণির ঘটনার সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভুলবশত তার নাম প্রকাশিত হওয়ায় ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার জন্য সংবাদপত্রটি তার ও তার পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।

ফলে ২০২১ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—পরীমণিকে গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের নাম জড়ালেও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নিজেই তার নাম প্রকাশকে ভুল হিসেবে স্বীকার করেছিল।

বর্তমানে বিতর্কটি আবার আলোচনায় আসার মূল কারণ এখানেই। একদিকে রয়েছে ২০২১ সালের সংবাদে ভুলভাবে উঠে আসা মাসরুর আরেফিনের নাম, তার প্রকাশ্য অস্বীকৃতি এবং পরে ইত্তেফাকের ভুল স্বীকার। অন্যদিকে রয়েছে নতুন করে সামনে আসা দাবি—পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ ছিলেন খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু।

এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে অবশ্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য বা সূত্রের দাবি নিজে থেকেই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তবে পুরোনো সংবাদ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রকাশ্য ভুল স্বীকার—সবকিছু মিলিয়ে ‘মাসরুর’ নামটি ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, সেটি যে বাস্তব ছিল, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ কম।

পরীমণির গাড়ি বিতর্ক তাই এখন শুধু একটি গাড়ি উপহারের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিচয় বিভ্রান্তি, সংবাদ প্রকাশের নির্ভুলতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এবং একটি ভুল নাম কীভাবে একজন ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদায় প্রভাব ফেলতে পারে—সেই প্রশ্নও।

সবশেষে মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে কে? ২০২১ সালের নথিভুক্ত ঘটনাপ্রবাহ বলছে, মাসরুর আরেফিনের নাম প্রকাশ করা হয়েছিল ভুলভাবে এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম পরবর্তীতে তা স্বীকারও করেছে। আর এখন প্রচারিত নতুন বয়ান দাবি করছে, সেই ‘মাসরুর’ ছিলেন খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। ফলে পুরোনো বিতর্কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে নামের সেই বিভ্রান্তিই।