Dhaka 6:43 pm, Sunday, 26 July 2026
সর্বশেষ
কঙ্গোতে দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে ইবোলা ভাইরাস, মৃত্যু ছাড়াল ১ হাজার ৩০০ কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতন: বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তিন দশক পর আবারও উচ্ছেদের মুখে পূর্বাচল থেকে আসা পরিবারগুলো জীবনযুদ্ধে ইয়াসমিনের পাশে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন একাধিকবার বাস্তুচ্যুতির শঙ্কা, অনিশ্চয়তায় শিমুলিয়া ও মুলাদীর পরিবারগুলো স্কলারশিপ, শিক্ষা ঋণ ও ভিসা—বিদেশে পড়তে আগ্রহীদের জন্য শিক্ষামেলায় নানা সুযোগ অবশেষে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত মহাতারকা মেসির ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন স্পিকার অবশেষে পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন

কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতন: বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 09:44:52 am, Sunday, 26 July 2026
  • / 8 Time View

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাজির করেছে—কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

প্রায় ছয় মিনিটের ওই ভিডিওতে এক শিক্ষককে কয়েকজন শিশুকে নির্মমভাবে মারধর করতে দেখা যায়। ভিডিওটির স্থান-কাল ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও দৃশ্যগুলো যে কোনো বিবেকবান মানুষকে বিচলিত করার মতো। একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার নামে শিশুদের ওপর এমন নির্দয় আচরণ করতে পারেন—এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা ঘটলে তা দেখার দায়িত্ব কার?

এটি কোনো একটি মাদ্রাসা, কোনো একজন শিক্ষক কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রশ্ন নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে সামনে আসে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষা, নজরদারি ও জবাবদিহির একটি দীর্ঘদিনের অনালোচিত সংকট।

কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের লাখ লাখ শিশু এই ধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। অনেক শিশু আবাসিক মাদ্রাসায় থেকে পড়াশোনা করে। তাদের একটি বড় অংশ আসে দরিদ্র, অতিদরিদ্র কিংবা সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে। কেউ কেউ এতিম। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানকে মাদ্রাসায় রেখে নিশ্চিন্ত হতে চান—সন্তান সেখানে ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাবে, খাবার পাবে, নিরাপদে থাকবে এবং ভবিষ্যতে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

কিন্তু সেই শিশুই যদি শিক্ষকের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে সে যাবে কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই দিতে হবে।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ। অন্যান্য কওমি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ কওমি শিক্ষাব্যবস্থা এখন বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।

এত বিপুলসংখ্যক শিশুর শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে যে প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত, সেখানে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসাশিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়া জরুরি। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসতে থাকলে সেটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

বরং প্রশ্ন করতে হবে, কেন এ ধরনের অভিযোগ বারবার উঠছে?

আরও বড় প্রশ্ন—যেসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না, সেগুলোর কী হবে?

শিশু নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে কঠিন জায়গা। একটি শিশু যখন পরিবারের কাছ থেকে দূরে কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকে, তখন তার ওপর নির্যাতন হলে সে সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না। অনেক সময় সে জানেই না, তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। কখনো ভয় দেখানো হয়, কখনো প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার ভয় থাকে, আবার কখনো সামাজিক লজ্জা ও পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় শিশুটি মুখ বন্ধ রাখে।

অভিভাবকরাও অনেক সময় অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বললে সামাজিকভাবে সমালোচিত হওয়ার ভয় থাকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

ফলে গণমাধ্যমে যে সংখ্যক ঘটনা প্রকাশ পায়, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির বিষয়টিও কম উদ্বেগের নয়। বেত দিয়ে পেটানো, মারধর, আটকে রাখা কিংবা অপমানজনক আচরণের খবর প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ২০১১ সালে হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে পরিপত্র জারি করেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কওমি মাদ্রাসায় এই নির্দেশনা কতটা কার্যকর?

শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সরকারি স্কুল, বেসরকারি স্কুল, ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান কিংবা কওমি মাদ্রাসা—প্রতিষ্ঠানের ধরন যাই হোক, সেখানে পড়া প্রতিটি শিশুর অধিকার সমান।

কওমি মাদ্রাসা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয় না কিংবা ঐতিহ্যগতভাবে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে—এই যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্র শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। কারণ শিশুটি তো রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন ও অবহেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবেও দিয়েছে। ফলে কোনো শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিচয় কিংবা পরিচালন কাঠামো কোনো বাধা হতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কওমি মাদ্রাসা মানেই নির্যাতনের জায়গা, এমন ধারণা যেমন সত্য নয়, তেমনি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো ব্যবস্থার সমস্যাকে অস্বীকার করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁদের অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, সেসব ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনোভাবেই পুরো কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপানো উচিত নয়। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধীকে দায়মুক্ত রাখার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

এখন সময় এসেছে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কাঠামো গড়ে তোলার।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো ধরনের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আপসের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক কীভাবে শিশুকে শাসন করবেন, কীভাবে শিশুর মানসিক বিকাশ বুঝবেন, কীভাবে সহিংসতা ছাড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব আরও সক্রিয়ভাবে পালন করতে হবে। শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা শিক্ষাক্রম পরিচালনা নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী দোষী সাব্যস্ত হলে ভবিষ্যতে তিনি যেন অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের দায়িত্বে যেতে না পারেন, সে জন্য আইনসম্মত ও যথাযথ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রতি সহিংসতাকে ‘শাসন’ বলে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে মানবিক হতে শেখায়। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি কোমলতা, মমতা ও ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়। শিশুদের গায়ে হাত তোলা, অপমান করা কিংবা ভয় দেখিয়ে শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই।

বরং যে শিক্ষা একটি শিশুকে ভীত, আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, সেই শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

অভিভাবকেরা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান মানুষ হওয়ার জন্য। তাঁরা চান সন্তান জ্ঞান অর্জন করুক, নৈতিকতা শিখুক, ধর্মীয় মূল্যবোধে বেড়ে উঠুক। কোনো বাবা-মা চান না, তাদের সন্তান কোনো শিক্ষকের নির্যাতনের শিকার হোক কিংবা নিথর দেহ হয়ে ঘরে ফিরুক।

তাই প্রশ্নটি কেবল কওমি মাদ্রাসার নয়। প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রের, আমাদের সমাজের এবং আমাদের বিবেকের।

একটি শিশু স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদ্রাসায়—তার অধিকার সমান। সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হোক কিংবা সচ্ছল পরিবারের, এতিম হোক কিংবা অভিভাবকসহ বেড়ে উঠুক—তার নিরাপত্তার অধিকারও সমান।

কওমি মাদ্রাসার শিশুরাও এই দেশের সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

সুতরাং কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সাময়িক উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা। প্রয়োজন কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা বোর্ড, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক, শিশু অধিকারকর্মী এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

কারণ একটি শিশুর কান্না কখনোই কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে ছোট হতে পারে না। একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো আপসের বিষয় হতে পারে না। আর যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সাফল্যের কোনো দাবিই পূর্ণতা পায় না।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতন: বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

Update Time : 09:44:52 am, Sunday, 26 July 2026

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাজির করেছে—কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

প্রায় ছয় মিনিটের ওই ভিডিওতে এক শিক্ষককে কয়েকজন শিশুকে নির্মমভাবে মারধর করতে দেখা যায়। ভিডিওটির স্থান-কাল ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও দৃশ্যগুলো যে কোনো বিবেকবান মানুষকে বিচলিত করার মতো। একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার নামে শিশুদের ওপর এমন নির্দয় আচরণ করতে পারেন—এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা ঘটলে তা দেখার দায়িত্ব কার?

এটি কোনো একটি মাদ্রাসা, কোনো একজন শিক্ষক কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রশ্ন নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে সামনে আসে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষা, নজরদারি ও জবাবদিহির একটি দীর্ঘদিনের অনালোচিত সংকট।

কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের লাখ লাখ শিশু এই ধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। অনেক শিশু আবাসিক মাদ্রাসায় থেকে পড়াশোনা করে। তাদের একটি বড় অংশ আসে দরিদ্র, অতিদরিদ্র কিংবা সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে। কেউ কেউ এতিম। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানকে মাদ্রাসায় রেখে নিশ্চিন্ত হতে চান—সন্তান সেখানে ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাবে, খাবার পাবে, নিরাপদে থাকবে এবং ভবিষ্যতে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

কিন্তু সেই শিশুই যদি শিক্ষকের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে সে যাবে কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই দিতে হবে।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ। অন্যান্য কওমি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ কওমি শিক্ষাব্যবস্থা এখন বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।

এত বিপুলসংখ্যক শিশুর শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে যে প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত, সেখানে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসাশিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়া জরুরি। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসতে থাকলে সেটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

বরং প্রশ্ন করতে হবে, কেন এ ধরনের অভিযোগ বারবার উঠছে?

আরও বড় প্রশ্ন—যেসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না, সেগুলোর কী হবে?

শিশু নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে কঠিন জায়গা। একটি শিশু যখন পরিবারের কাছ থেকে দূরে কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকে, তখন তার ওপর নির্যাতন হলে সে সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না। অনেক সময় সে জানেই না, তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। কখনো ভয় দেখানো হয়, কখনো প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার ভয় থাকে, আবার কখনো সামাজিক লজ্জা ও পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় শিশুটি মুখ বন্ধ রাখে।

অভিভাবকরাও অনেক সময় অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বললে সামাজিকভাবে সমালোচিত হওয়ার ভয় থাকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

ফলে গণমাধ্যমে যে সংখ্যক ঘটনা প্রকাশ পায়, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির বিষয়টিও কম উদ্বেগের নয়। বেত দিয়ে পেটানো, মারধর, আটকে রাখা কিংবা অপমানজনক আচরণের খবর প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ২০১১ সালে হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে পরিপত্র জারি করেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কওমি মাদ্রাসায় এই নির্দেশনা কতটা কার্যকর?

শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সরকারি স্কুল, বেসরকারি স্কুল, ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান কিংবা কওমি মাদ্রাসা—প্রতিষ্ঠানের ধরন যাই হোক, সেখানে পড়া প্রতিটি শিশুর অধিকার সমান।

কওমি মাদ্রাসা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয় না কিংবা ঐতিহ্যগতভাবে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে—এই যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্র শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। কারণ শিশুটি তো রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন ও অবহেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবেও দিয়েছে। ফলে কোনো শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিচয় কিংবা পরিচালন কাঠামো কোনো বাধা হতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কওমি মাদ্রাসা মানেই নির্যাতনের জায়গা, এমন ধারণা যেমন সত্য নয়, তেমনি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো ব্যবস্থার সমস্যাকে অস্বীকার করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁদের অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, সেসব ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনোভাবেই পুরো কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপানো উচিত নয়। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধীকে দায়মুক্ত রাখার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

এখন সময় এসেছে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কাঠামো গড়ে তোলার।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো ধরনের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আপসের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক কীভাবে শিশুকে শাসন করবেন, কীভাবে শিশুর মানসিক বিকাশ বুঝবেন, কীভাবে সহিংসতা ছাড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব আরও সক্রিয়ভাবে পালন করতে হবে। শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা শিক্ষাক্রম পরিচালনা নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী দোষী সাব্যস্ত হলে ভবিষ্যতে তিনি যেন অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের দায়িত্বে যেতে না পারেন, সে জন্য আইনসম্মত ও যথাযথ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রতি সহিংসতাকে ‘শাসন’ বলে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে মানবিক হতে শেখায়। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি কোমলতা, মমতা ও ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়। শিশুদের গায়ে হাত তোলা, অপমান করা কিংবা ভয় দেখিয়ে শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই।

বরং যে শিক্ষা একটি শিশুকে ভীত, আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, সেই শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

অভিভাবকেরা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান মানুষ হওয়ার জন্য। তাঁরা চান সন্তান জ্ঞান অর্জন করুক, নৈতিকতা শিখুক, ধর্মীয় মূল্যবোধে বেড়ে উঠুক। কোনো বাবা-মা চান না, তাদের সন্তান কোনো শিক্ষকের নির্যাতনের শিকার হোক কিংবা নিথর দেহ হয়ে ঘরে ফিরুক।

তাই প্রশ্নটি কেবল কওমি মাদ্রাসার নয়। প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রের, আমাদের সমাজের এবং আমাদের বিবেকের।

একটি শিশু স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদ্রাসায়—তার অধিকার সমান। সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হোক কিংবা সচ্ছল পরিবারের, এতিম হোক কিংবা অভিভাবকসহ বেড়ে উঠুক—তার নিরাপত্তার অধিকারও সমান।

কওমি মাদ্রাসার শিশুরাও এই দেশের সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

সুতরাং কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সাময়িক উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা। প্রয়োজন কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা বোর্ড, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক, শিশু অধিকারকর্মী এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

কারণ একটি শিশুর কান্না কখনোই কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে ছোট হতে পারে না। একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো আপসের বিষয় হতে পারে না। আর যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সাফল্যের কোনো দাবিই পূর্ণতা পায় না।