Dhaka 1:13 am, Monday, 6 July 2026

বটবাহিনী ঠেকাতে এখনই উদ্যোগ জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 09:42:13 am, Sunday, 5 July 2026
  • / 14 Time View

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর ‘বটবাহিনী’ এখন বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে জনমত প্রভাবিত করা, অপপ্রচার চালানো, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গণতন্ত্র, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান এবং জনমত গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ভুয়া জনমত সৃষ্টি এবং সমন্বিত অপপ্রচারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, অনলাইনের প্রকৃত ব্যবহারকারী এবং কৃত্রিম কার্যকলাপকে আলাদা করে বিশ্লেষণ না করলে জনমত বা সাইবার বুলিংয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বট’ হলো এমন একটি সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট, মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। বিপুলসংখ্যক বট বা ভুয়া অ্যাকাউন্টকে একযোগে পরিচালনা করা হলে সেটিকে সাধারণভাবে ‘বটবাহিনী’ বলা হয়। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক ইস্যুকে ঘিরে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বটবাহিনী সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের বট সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসারে কাজ করে। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত মানুষ একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। এ ধরনের সমন্বিত কার্যক্রমকে অনেক সময় ‘ট্রল আর্মি’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বটবাহিনী মূলত তিনটি কৌশলে সক্রিয় থাকে। প্রথমত, কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত বিপুলসংখ্যক মন্তব্য করে জনমতের ধারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমন্বিত অপপ্রচার চালিয়ে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্টকে বিপুলসংখ্যক রিপোর্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বাভাবিক সংখ্যক মন্তব্য আসা, একই ধরনের ভাষায় অসংখ্য মন্তব্য দেখা যাওয়া কিংবা ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে সক্রিয়তা—এসবই বট কার্যক্রমের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বটবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জনমত গঠনের ওপর। একই ধরনের অসংখ্য মন্তব্য দেখে অনেক ব্যবহারকারী মনে করেন, সেটিই হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটিকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ নামে পরিচিত, যেখানে কৃত্রিমভাবে স্বতঃস্ফূর্ত জনমতের পরিবেশ তৈরি করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, সাম্প্রতিক সময়ে ডিপফেক ভিডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে। এতে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। তাঁদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করতে হবে।

তাঁদের আরও মত, দীর্ঘমেয়াদে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা সম্প্রসারণ করা জরুরি। সচেতন ব্যবহারকারী তৈরি করা গেলে বটনির্ভর অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বটবাহিনী ঠেকাতে এখনই উদ্যোগ জরুরি

Update Time : 09:42:13 am, Sunday, 5 July 2026

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর ‘বটবাহিনী’ এখন বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে জনমত প্রভাবিত করা, অপপ্রচার চালানো, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গণতন্ত্র, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান এবং জনমত গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ভুয়া জনমত সৃষ্টি এবং সমন্বিত অপপ্রচারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, অনলাইনের প্রকৃত ব্যবহারকারী এবং কৃত্রিম কার্যকলাপকে আলাদা করে বিশ্লেষণ না করলে জনমত বা সাইবার বুলিংয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বট’ হলো এমন একটি সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট, মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। বিপুলসংখ্যক বট বা ভুয়া অ্যাকাউন্টকে একযোগে পরিচালনা করা হলে সেটিকে সাধারণভাবে ‘বটবাহিনী’ বলা হয়। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক ইস্যুকে ঘিরে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বটবাহিনী সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের বট সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসারে কাজ করে। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত মানুষ একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। এ ধরনের সমন্বিত কার্যক্রমকে অনেক সময় ‘ট্রল আর্মি’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বটবাহিনী মূলত তিনটি কৌশলে সক্রিয় থাকে। প্রথমত, কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত বিপুলসংখ্যক মন্তব্য করে জনমতের ধারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমন্বিত অপপ্রচার চালিয়ে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্টকে বিপুলসংখ্যক রিপোর্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বাভাবিক সংখ্যক মন্তব্য আসা, একই ধরনের ভাষায় অসংখ্য মন্তব্য দেখা যাওয়া কিংবা ভুয়া পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে সক্রিয়তা—এসবই বট কার্যক্রমের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বটবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জনমত গঠনের ওপর। একই ধরনের অসংখ্য মন্তব্য দেখে অনেক ব্যবহারকারী মনে করেন, সেটিই হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটিকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ নামে পরিচিত, যেখানে কৃত্রিমভাবে স্বতঃস্ফূর্ত জনমতের পরিবেশ তৈরি করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, সাম্প্রতিক সময়ে ডিপফেক ভিডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে। এতে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। তাঁদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করতে হবে।

তাঁদের আরও মত, দীর্ঘমেয়াদে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা সম্প্রসারণ করা জরুরি। সচেতন ব্যবহারকারী তৈরি করা গেলে বটনির্ভর অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।