Dhaka 11:22 am, Sunday, 1 November 2026
সর্বশেষ
বিক্রি কমেছে, খরচ কমেনি; বিপাকে বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা ফ্যাসিবাদ উত্থানের পথ বন্ধ করতে রাজনৈতিক ঐক্যই বেশি প্রয়োজন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে জেনেটিক বায়ো-কাউন্সেলিং সেবা বিলাসবহুল লং ড্রাইভ না করে ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল পরিষ্কার করুন : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চাকরি হারালেন ডিবির সেই হারুন মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের দিনভর বিক্ষোভ, জনদুর্ভোগ অবৈধ আবাসন ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্রেতা ও বৈধ প্রতিষ্ঠান আন্দোলন করে সরকার গঠন করা যায় না : চিফ হুইপ স্বামীকে পুনরায় বিয়ে করতে বলে ছেলেকে নিয়ে ১৮ তলা থেকে ঝাঁপ দিলেন নারী আদালত থেকে বের করার পর দীপ বললেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং’

বিক্রি কমেছে, খরচ কমেনি; বিপাকে বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 03:15:33 am, Sunday, 1 November 2026
  • / 8 Time View

একসময় রাজধানীর শপিংমলগুলো ছিল কেনাকাটার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। উৎসব-পার্বণ কিংবা সাধারণ দিন—সব সময়ই এসব বিপণিবিতানে থাকত ক্রেতাদের ভিড়। দোকানগুলোতে চলত বেচাকেনার ব্যস্ততা। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক বিপণিবিতানে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় দোকান খোলা রেখেও মিলছে না প্রত্যাশিত বিক্রি। কোনো কোনো দোকানে দুপুর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয় না দিনের বেচাকেনা।

রাজধানীর রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার, অর্কিড পয়েন্টসহ বেশ কয়েকটি পরিচিত শপিংমল এখন ক্রেতাসংকট ও ব্যবসায়িক মন্দার মুখে। দীর্ঘদিনের লোকসান, পরিচালন ব্যয় এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এসব বিপণিবিতানের ব্যবসা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এরই মধ্যে শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী। একদিকে পুঁজি আটকে যাচ্ছে, অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেকের কাছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর প্রচলিত শপিংমলগুলোর এই সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। প্রযুক্তির বিস্তার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বাজারব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।

শপিংমলগুলোতে ক্রেতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার। এখন ঘরে বসেই ফেসবুক পেজ, বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস থেকে পছন্দের পণ্য কেনা যাচ্ছে। অর্ডার করা পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতার বাসায়। ফলে সরাসরি দোকানে গিয়ে কেনাকাটার প্রয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে।

বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছেন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের অনেকের বড় শোরুমের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল কিংবা বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর বেতন দিতে হয় না। ফলে তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় প্রচলিত শপিংমলগুলোর ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন।

শপিংমলের ব্যবসায় মন্দার আরেকটি কারণ ফুটপাতকেন্দ্রিক কেনাকাটা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারে তুলনামূলক কম দামে পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রী পাওয়া যায়। একই ধরনের পণ্য শপিংমলের তুলনায় কম দামে কেনার সুযোগ থাকায় সীমিত ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের অনেকেই ফুটপাতের বাজারে ঝুঁকছেন।

বিশেষ করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ও ফ্যাশনসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কাছে এসব বাজারের আকর্ষণ বাড়ছে। এতে বিপণিবিতানগুলোর নিয়মিত ক্রেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবও খুচরা ব্যবসায় পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল এবং যাতায়াত ব্যয় মেটাতেই সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা শখের পণ্য কেনার মতো অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিয়েছেন অনেকেই।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এখন প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটায় আগের মতো অর্থ ব্যয় করতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শপিংমলগুলোর বিক্রিতে।

বেচাকেনা কমলেও দোকান পরিচালনার ব্যয় কমেনি। অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেনারেটর, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। বিক্রি কমে যাওয়ায় এসব ব্যয় বহন করা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান সামাল দিতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আয় কমে গেলেও নির্ধারিত ব্যয় বহাল থাকায় ধীরে ধীরে পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকছে না অনেকের।

রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় ছিল পরিচিত ও জমজমাট বিপণিবিতান। তবে দীর্ঘদিনের ক্রেতাসংকট, লোকসান এবং বকেয়া বিলের চাপ সামলাতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

একসময় প্রাণচঞ্চল এই বিপণিবিতানের বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজধানীর অন্যান্য শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি শুধু একটি বিপণিবিতান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়, বরং প্রচলিত খুচরা বাণিজ্যব্যবস্থার সংকটের একটি বড় সতর্কসংকেত।

দীর্ঘদিনের লোকসানে অনেক ব্যবসায়ীর সঞ্চিত পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসা চালু রাখতে ব্যাংক, আত্মীয়স্বজন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিতে হয়েছে অনেককে। কোনো কোনো দোকানে বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত থাকলেও সেগুলো বিক্রি করে নগদ অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ছে।

ব্যবসার আয় বন্ধ বা কমে যাওয়ায় পরিবার পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অনেকের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস দোকান। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বাসাভাড়া, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শপিংমলকেন্দ্রিক ব্যবসায় মন্দার প্রভাব পড়েছে কর্মচারীদের ওপরও। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক দোকানমালিক কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিক্রয়কর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীরা। এতে শুধু ব্যবসায়ী নয়, খুচরা বাণিজ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর প্রচলিত শপিংমলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ী, মার্কেট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রথমত, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় দোকানভাড়া ও সার্ভিস চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি। মার্কেট কর্তৃপক্ষ ও দোকান মালিক সমিতি আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া, এসি, জেনারেটর এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।

দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইন বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শপিংমলের দোকানগুলোর জন্য যৌথ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট কিংবা মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে। এতে দোকানে না এসেও ক্রেতারা পণ্য দেখতে ও অর্ডার করতে পারবেন। অনলাইন ও সরাসরি বিক্রির সমন্বয়ে নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগও বাড়বে।

তৃতীয়ত, শপিংমলগুলোকে শুধু কেনাকাটার জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনোদন ও পারিবারিক সময় কাটানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। ফুডকোর্ট, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট জোন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা যেতে পারে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা চালু করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করলে ব্যবসায়ীরা চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন উৎসব, মৌসুমি বিক্রি ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত ছাড়, বিশেষ মূল্যছাড়, ক্যাম্পেইন ও পুরস্কারভিত্তিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে শপিংমলগুলোতে ক্রেতাদের আগ্রহ ও উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর শপিংমলগুলোর বর্তমান সংকট কেবল বেচাকেনা কমে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের জীবন-জীবিকা। অনলাইন বাণিজ্যের বিস্তার, মূল্যস্ফীতি এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রচলিত বিপণিবিতানগুলোর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ক্রেতাদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় রাজধানীর পরিচিত ও জমজমাট অনেক শপিংমলই হয়তো বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিক্রি কমেছে, খরচ কমেনি; বিপাকে বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা

Update Time : 03:15:33 am, Sunday, 1 November 2026

একসময় রাজধানীর শপিংমলগুলো ছিল কেনাকাটার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। উৎসব-পার্বণ কিংবা সাধারণ দিন—সব সময়ই এসব বিপণিবিতানে থাকত ক্রেতাদের ভিড়। দোকানগুলোতে চলত বেচাকেনার ব্যস্ততা। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক বিপণিবিতানে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় দোকান খোলা রেখেও মিলছে না প্রত্যাশিত বিক্রি। কোনো কোনো দোকানে দুপুর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয় না দিনের বেচাকেনা।

রাজধানীর রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার, অর্কিড পয়েন্টসহ বেশ কয়েকটি পরিচিত শপিংমল এখন ক্রেতাসংকট ও ব্যবসায়িক মন্দার মুখে। দীর্ঘদিনের লোকসান, পরিচালন ব্যয় এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এসব বিপণিবিতানের ব্যবসা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এরই মধ্যে শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী। একদিকে পুঁজি আটকে যাচ্ছে, অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেকের কাছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর প্রচলিত শপিংমলগুলোর এই সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। প্রযুক্তির বিস্তার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বাজারব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।

শপিংমলগুলোতে ক্রেতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার। এখন ঘরে বসেই ফেসবুক পেজ, বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস থেকে পছন্দের পণ্য কেনা যাচ্ছে। অর্ডার করা পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতার বাসায়। ফলে সরাসরি দোকানে গিয়ে কেনাকাটার প্রয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে।

বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছেন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের অনেকের বড় শোরুমের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল কিংবা বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর বেতন দিতে হয় না। ফলে তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় প্রচলিত শপিংমলগুলোর ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন।

শপিংমলের ব্যবসায় মন্দার আরেকটি কারণ ফুটপাতকেন্দ্রিক কেনাকাটা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারে তুলনামূলক কম দামে পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রী পাওয়া যায়। একই ধরনের পণ্য শপিংমলের তুলনায় কম দামে কেনার সুযোগ থাকায় সীমিত ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের অনেকেই ফুটপাতের বাজারে ঝুঁকছেন।

বিশেষ করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ও ফ্যাশনসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কাছে এসব বাজারের আকর্ষণ বাড়ছে। এতে বিপণিবিতানগুলোর নিয়মিত ক্রেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবও খুচরা ব্যবসায় পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল এবং যাতায়াত ব্যয় মেটাতেই সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা শখের পণ্য কেনার মতো অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিয়েছেন অনেকেই।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এখন প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটায় আগের মতো অর্থ ব্যয় করতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শপিংমলগুলোর বিক্রিতে।

বেচাকেনা কমলেও দোকান পরিচালনার ব্যয় কমেনি। অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেনারেটর, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। বিক্রি কমে যাওয়ায় এসব ব্যয় বহন করা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান সামাল দিতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আয় কমে গেলেও নির্ধারিত ব্যয় বহাল থাকায় ধীরে ধীরে পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকছে না অনেকের।

রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় ছিল পরিচিত ও জমজমাট বিপণিবিতান। তবে দীর্ঘদিনের ক্রেতাসংকট, লোকসান এবং বকেয়া বিলের চাপ সামলাতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

একসময় প্রাণচঞ্চল এই বিপণিবিতানের বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজধানীর অন্যান্য শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি শুধু একটি বিপণিবিতান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়, বরং প্রচলিত খুচরা বাণিজ্যব্যবস্থার সংকটের একটি বড় সতর্কসংকেত।

দীর্ঘদিনের লোকসানে অনেক ব্যবসায়ীর সঞ্চিত পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসা চালু রাখতে ব্যাংক, আত্মীয়স্বজন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিতে হয়েছে অনেককে। কোনো কোনো দোকানে বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত থাকলেও সেগুলো বিক্রি করে নগদ অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ছে।

ব্যবসার আয় বন্ধ বা কমে যাওয়ায় পরিবার পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অনেকের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস দোকান। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বাসাভাড়া, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শপিংমলকেন্দ্রিক ব্যবসায় মন্দার প্রভাব পড়েছে কর্মচারীদের ওপরও। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক দোকানমালিক কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিক্রয়কর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীরা। এতে শুধু ব্যবসায়ী নয়, খুচরা বাণিজ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর প্রচলিত শপিংমলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ী, মার্কেট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রথমত, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় দোকানভাড়া ও সার্ভিস চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি। মার্কেট কর্তৃপক্ষ ও দোকান মালিক সমিতি আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া, এসি, জেনারেটর এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।

দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইন বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শপিংমলের দোকানগুলোর জন্য যৌথ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট কিংবা মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে। এতে দোকানে না এসেও ক্রেতারা পণ্য দেখতে ও অর্ডার করতে পারবেন। অনলাইন ও সরাসরি বিক্রির সমন্বয়ে নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগও বাড়বে।

তৃতীয়ত, শপিংমলগুলোকে শুধু কেনাকাটার জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনোদন ও পারিবারিক সময় কাটানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। ফুডকোর্ট, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট জোন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা যেতে পারে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা চালু করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করলে ব্যবসায়ীরা চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন উৎসব, মৌসুমি বিক্রি ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত ছাড়, বিশেষ মূল্যছাড়, ক্যাম্পেইন ও পুরস্কারভিত্তিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে শপিংমলগুলোতে ক্রেতাদের আগ্রহ ও উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর শপিংমলগুলোর বর্তমান সংকট কেবল বেচাকেনা কমে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের জীবন-জীবিকা। অনলাইন বাণিজ্যের বিস্তার, মূল্যস্ফীতি এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রচলিত বিপণিবিতানগুলোর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ক্রেতাদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় রাজধানীর পরিচিত ও জমজমাট অনেক শপিংমলই হয়তো বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে।