Dhaka 6:54 pm, Saturday, 5 September 2026
সর্বশেষ

বড় প্রকল্পে জোর, জ্বালানি খাতের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কোথায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 10:01:57 am, Saturday, 5 September 2026
  • / 7 Time View

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। এতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কীভাবে দূর করা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং এসব সংস্কার কখন ও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্কে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার না করে নতুন প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের হিসাবে, বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো কম ব্যবহার হচ্ছে এবং কোন কেন্দ্র বন্ধ, পুনর্গঠন বা আধুনিকায়ন করা দরকার। পুরোনো অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যার সমাধান না করে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়তে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার জরুরি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু করা প্রয়োজন।

এদিকে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়লে এই ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

এ ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহারও বাড়ানো যেত।

বিপিডিবির আর্থিক দুর্বলতাও বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। উৎপাদন ও ক্রয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের দায়িত্বও এর ওপর রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় না নেওয়া। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা।

নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো উৎপাদনে আসেনি। কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এর মধ্যে নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি ও এলএনজিনির্ভর নতুন অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি নাও হতে পারে।

উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখা টেকসই নয়। তাঁর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি রূপরেখা। তাই এতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ফ্রেমওয়ার্কে মূলত কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে।

সরকারের এই রোডম্যাপে তাই একদিকে যেমন নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক চাপও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বড় প্রকল্পে জোর, জ্বালানি খাতের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কোথায়

Update Time : 10:01:57 am, Saturday, 5 September 2026

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। এতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কীভাবে দূর করা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং এসব সংস্কার কখন ও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্কে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার না করে নতুন প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের হিসাবে, বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো কম ব্যবহার হচ্ছে এবং কোন কেন্দ্র বন্ধ, পুনর্গঠন বা আধুনিকায়ন করা দরকার। পুরোনো অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যার সমাধান না করে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়তে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার জরুরি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু করা প্রয়োজন।

এদিকে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়লে এই ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

এ ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহারও বাড়ানো যেত।

বিপিডিবির আর্থিক দুর্বলতাও বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। উৎপাদন ও ক্রয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের দায়িত্বও এর ওপর রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় না নেওয়া। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা।

নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো উৎপাদনে আসেনি। কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এর মধ্যে নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি ও এলএনজিনির্ভর নতুন অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি নাও হতে পারে।

উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখা টেকসই নয়। তাঁর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি রূপরেখা। তাই এতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ফ্রেমওয়ার্কে মূলত কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে।

সরকারের এই রোডম্যাপে তাই একদিকে যেমন নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক চাপও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।