ভারতবিরোধী রাজনীতির ফাঁদে পড়লে বিপদ বিএনপিরই
- Update Time : 04:52:08 pm, Friday, 21 August 2026
- / 13 Time View
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়। এ বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানানো হয়েছে। ভারত বিষয়টি তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন দুই দেশের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ-ই কি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে? বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এর উত্তর হওয়া উচিত—না।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় থাকতেই পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোও স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিতে হবে। পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নির্ভর করে একই সঙ্গে একাধিক স্বার্থ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর। একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সংকুচিত করে ফেলা কৌশলগতভাবে বিচক্ষণতার পরিচয় হতে পারে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের কূটনীতির পরিধি যদি এই একটি প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার অসংখ্য ক্ষেত্র। ভারত হাসিনার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটির অপেক্ষায় বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কিংবা আঞ্চলিক যোগাযোগ থামিয়ে রাখা বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে।
পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্য সব জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়ার নাম নয়। বরং পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যেও নিজের দেশের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা বের করে আনার নামই বাস্তববাদী কূটনীতি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ভূগোল। বাংলাদেশের তিন দিকজুড়েই ভারতের অবস্থান। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও কেবল বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১.৩৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৯.৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং রপ্তানি করেছে প্রায় ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৮৬ বিলিয়ন ডলারে।
এই ঘাটতি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে আমদানির বড় অংশের সঙ্গে দেশের উৎপাদন, শিল্প ও ভোক্তা অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশল হতে হবে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি; হঠাৎ করে সম্পর্ককে সংঘাতপূর্ণ করে তোলার মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১২.১৫ লাখ টন সুতা আমদানি করেছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভারতীয় সুতার ওপর নির্ভর করার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ উল্লেখ করেন—মূল্য তুলনামূলকভাবে কম, বড় চালান পাওয়া যায় এবং দ্রুত সরবরাহ সম্ভব হয়।
অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, দীর্ঘ সরবরাহ সময় এবং বেশি মজুদ রাখার প্রয়োজন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কাঁচামালের ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।
অবশ্য এর বিপরীত সমস্যাটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশের স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো ভারতীয় সুতার প্রতিযোগিতা এবং গ্যাসের স্বল্পচাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। আবার তৈরি পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, সুতা আমদানি হঠাৎ সীমিত হলে সরবরাহ ঘাটতি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।
অতএব বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত—দেশীয় শিল্পকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে রপ্তানি শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বাণিজ্যনীতি, আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বস্ত্র খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক বস্ত্র খাতে বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। অথচ গ্যাস সংকট, অর্থায়নের উচ্চ ব্যয় এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যার কারণে খাতটি ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহকে আরও অনিশ্চিত করে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।
কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হলে নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হয়।
রাজনৈতিকভাবে ভারতকে কঠোর বার্তা দেওয়া সহজ হতে পারে। কিন্তু সেই নীতির কারণে যদি কোনো কারখানার কাঁচামাল ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন কমে বা রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সরকারকেই।
ভারত প্রশ্নে বিএনপির সামনে আরেকটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ভারতের বিষয়ে কঠোর জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। ফলে বিএনপির ওপরও আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
এখানেই সরকার ও বিরোধী রাজনীতির পার্থক্য।
বিরোধী দল কঠোর বক্তব্য দিতে পারে। কিন্তু সরকারকে সেই বক্তব্যের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি সামলাতে হয়। জামায়াত বা এনসিপিকে কোনো কারখানা চালু রাখতে হবে না, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে না, সীমান্ত বাণিজ্য সচল রাখতে হবে না কিংবা পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে হবে না। এগুলো সরকারের দায়িত্ব।
তাই বিএনপির উচিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করার জন্য এমন অবস্থান না নেওয়া, যার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য পরে সরকারকেই দিতে হবে।
জাতীয়তাবাদে কোনো সমস্যা নেই। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয়তাবাদ আর ভারতবিরোধিতাকে এক করে দেখা ভুল।
জাতীয়তাবাদের মৌলিক প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের জন্য কোন সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে ভালো?
অন্যদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ অনেক সময় প্রশ্নটিকে দাঁড় করায়—কে ভারতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর?
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রথম প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি জটিল সমস্যাকে সহজ ব্যাখ্যায় পরিণত করতে পারে। গ্যাস সংকট, বাণিজ্য সমস্যা, মূল্যস্ফীতি কিংবা বিনিয়োগের দুর্বলতা—সবকিছুর সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র খোঁজা রাজনৈতিকভাবে সহজ।
কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি এত সরল নয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, সরবরাহ সীমাবদ্ধতা ও পরিকল্পনার দুর্বলতা। ব্যাংকিং খাতের সংকটের সঙ্গে জড়িত খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা। শিল্পের প্রতিযোগিতা কমার পেছনে রয়েছে উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের সমস্যা এবং উৎপাদনশীলতার ঘাটতি।
ভারতের নীতি এসব সমস্যার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু দেশের সব অর্থনৈতিক সমস্যার দায় ভারতের ওপর চাপালে সমস্যার প্রকৃত কারণগুলো আড়াল হয়ে যায়।
সরকারের দায়িত্ব হলো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর কাঠামোগত সমাধান করা। কোনো ব্যর্থতা বা জনঅসন্তোষকে কেবল ভারতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা সেই দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না।
অতিরিক্ত ভারতবিরোধিতা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্যই ব্যয়বহুল হতে পারে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হলে তার প্রভাব শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যোগাযোগের খরচ বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে।
এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
পণ্যের দাম বাড়তে পারে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা কমতে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে পারেন।
তখন ভোটারদের প্রশ্ন হবে না—সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর হয়েছে কি না। বরং প্রশ্ন উঠবে—জীবনযাত্রার ব্যয় কেন কমছে না, কর্মসংস্থান কেন বাড়ছে না, ব্যবসার পরিবেশ কেন উন্নত হচ্ছে না।
এখানেই সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দায়িত্ব হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট রাখা, কিন্তু একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে সচল রাখা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অস্বস্তির একাধিক জায়গা রয়েছে—এ কথা খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন। অর্থাৎ সম্পর্কের সংকট যে শুধু শেখ হাসিনার ইস্যুকে ঘিরে নয়, তা উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই উপলব্ধিকে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া।
একইভাবে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরেরও রাজনৈতিক আবেগ ও জনমতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনা করে সরকারকে পরামর্শ দিতে হবে।
কোনো নীতি আজ জনপ্রিয় কি না, সেটিই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—সেই নীতি পাঁচ বা দশ বছর পর বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। নদীর পানি, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে দুই দেশের ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন। গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়।
এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে রাখা বাংলাদেশের জন্য কোনো কৌশলগত সুবিধা তৈরি করবে না।
একই কথা প্রযোজ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও। চোরাচালান, মাদক পাচার, মানবপাচার, জঙ্গিবাদ ও বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশেরই স্বার্থ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিরোধের কারণে এসব সহযোগিতা দুর্বল করা হলে ক্ষতি হবে উভয় দেশের। বাংলাদেশের জন্য এর মূল্য আরও বেশি হতে পারে, কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতকে এড়িয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন।
কাঁচামালের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। বন্দর, সড়ক, রেল ও লজিস্টিক সক্ষমতা উন্নত করতে হবে।
কিন্তু বহুমুখীকরণের অর্থ ভারতকে বাদ দিয়ে অন্য একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বদলাবে না। নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ভূখণ্ডের গুরুত্ব থাকবে। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে চায়, তাহলে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক অপরিহার্য।
সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভারতের ওপর অতি-নির্ভরতা কমানো, কিন্তু ভারতের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত সৃষ্টি না করা।
বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এখন বাস্তব পরীক্ষার মুখে। এই নীতির প্রকৃত অর্থ যদি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তার মধ্যে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই থাকতে হবে।
শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা, পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আলোচনা করা, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা—এসবই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর অংশ।
ভারতের সঙ্গে প্রয়োজন হলে কঠোর অবস্থান নেওয়াও এর মধ্যে থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কোনোভাবেই ‘হাসিনা ফার্স্ট’ হতে পারে না।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি গুরুত্বপূর্ণ। তার বিচার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট থাকা উচিত। কিন্তু একটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণকে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের উচিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রাখা এবং এ বিষয়ে আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরা। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রও এগিয়ে নিতে হবে।
বাণিজ্য সচল রাখতে হবে। শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিরোধের কাছে জিম্মি করা যাবে না। পানি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ বাড়াতে হবে। নয়াদিল্লির সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে যেন পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা না হয়।
জামায়াত বা এনসিপি চাইলে আরও কঠোর ভারতবিরোধী বক্তব্য দিতে পারে। বিরোধী দল হিসেবে তাদের রাজনৈতিক দায় সীমিত। কিন্তু সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের প্রতিটি নীতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি জনগণকে বহন করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দায়ও সরকারকেই নিতে হয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি ভারতনীতি, যা নতজানু নয়, আবার অকারণ সংঘাতপ্রবণও নয়; যা আবেগের পরিবর্তে তথ্য ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে; যা প্রয়োজন হলে দৃঢ় হবে, আবার প্রয়োজন হলে সমঝোতার পথও খোলা রাখবে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ—এই দুটি বিষয় পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং বিচক্ষণ কূটনীতির মাধ্যমে দুটোকেই একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য তখনই প্রমাণিত হবে, যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান রেখেও দেশটি তার বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়—প্রশ্নটি বাংলাদেশকে ঘিরে।
বাংলাদেশের স্বার্থ যেন কোনো এক ব্যক্তি, কোনো এক রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা কোনো এক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওঠানামার কাছে জিম্মি না হয়—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।












