Dhaka 7:58 am, Sunday, 11 October 2026
সর্বশেষ
দেশের ৫০৩টি উপজেলার উন্নয়নে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে : এলজিআরডিমন্ত্রী নিখোঁজের ৫ দিন পর কলাবাগানে মিলল অটোভ্যান চালকের মরদেহ যে কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের জরুরি অবতরণ বিদ্যুৎ বিভাগের ৪১টি উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকার সহায়তা স্টারলিংকে প্রথম মাস ফ্রি মোবাইল সেবা, চালু করবেন যেভাবে সাবেক এমপি ও রাষ্ট্রদূত ব্যারিস্টার মুন্তাকিম চৌধুরী মারা গেছেন পে স্কেলে বড় অগ্রগতি, যুক্ত হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কেন ‘গাঁজাখোর’ বললেন রাশেদ খান ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যাধুনিক হাসপাতাল হবে সিটি হাসপাতাল : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

ডিজিটাল প্রজন্মের সামনে মূল্যবোধের নতুন পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 11:02:25 am, Thursday, 6 August 2026
  • / 117 Time View

ড. রাহাত সিকদার
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

আজকের Gen Z-এর একটি অংশের মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ এবং সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা আগের প্রজন্মের তুলনায় দৃশ্যত কমে যাচ্ছে বলে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে। দ্রুত মতামত দেওয়া, সমালোচনায় আগ্রহী হওয়া, কিন্তু অবদান ও অর্জনের গভীরতা অনুধাবন না করার প্রবণতাও ক্রমেই দৃশ্যমান। অথচ অন্যকে সম্মান করতে হলে আগে নিজেকে জানা, নিজেকে ভালোবাসা এবং নিজের মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি। যে নিজের পরিচয় ও শিকড়কে ধারণ করতে পারে, সে-ই অন্যের অবদানকে যথাযথভাবে সম্মান করতে শেখে।

একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নয়, বরং তার মানুষ কতটা বিনয়ী, সহনশীল এবং পূর্বসূরিদের অবদানকে সম্মান করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। কারণ সভ্যতার অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা এবং জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটে। এই আত্ম-উপলব্ধির ভিত্তিতেই আমরা বর্তমান বাস্তবতাকে বুঝতে পারি। আজ আমরা একটি স্পষ্ট সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমগুলো মানুষের আচরণ, মনোযোগ ও মূল্যবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল সভ্যতা ও সমসাময়িক সামাজিক ধারার কারণে তৈরি হওয়া বিস্তর জেনারেশন গ্যাপ এই প্রজন্মকে দৃশ্যত আত্মপরিচয়ের সংকট ও বিভ্রান্তির জালে আটকে দিয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

আজকের Gen Z, যাদের অনেকেই Google Generation নামেও পরিচিত, তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা সব সময় প্রজ্ঞার সমার্থক নয়। দ্রুত মতামত দেওয়া, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই বাস্তবতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে দেখা যায়। ফলে মানুষকে জানার আগে বিচার করা, শিল্পকে উপলব্ধি করার আগে সমালোচনা করা এবং অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের আগে মন্তব্য করে বসা যেন একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।

অবশ্য এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। এই প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রযুক্তিতে দক্ষ, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্মুক্ত এবং নতুন ধারণা গ্রহণে অনেক বেশি সাহসী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তন সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোতে তাদের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা প্রশংসনীয়। ফলে সমস্যার উৎস প্রযুক্তি নয়; বরং প্রযুক্তির ব্যবহারের ধরন এবং সেই ব্যবহারের সঙ্গে মূল্যবোধের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারাই মূল চ্যালেঞ্জ।

এখানেই আগের প্রজন্মের সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। পূর্ববর্তী প্রজন্মের সামাজিকীকরণ হতো পরিবার, বিদ্যালয়, প্রতিবেশ, খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশের সামাজিকীকরণ হচ্ছে অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট, শর্ট ভিডিও, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ফলে মনোযোগের স্থায়িত্ব, ধৈর্য, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং গভীরভাবে কোনো বিষয় উপলব্ধি করার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই পরিবর্তনের কিছু দিক নির্দেশ করে। OECD-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদস্য দেশগুলোর ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা গড়ে সপ্তাহে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করে। গবেষণাটি আরও ইঙ্গিত করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যপন্থী ব্যবহার কিছু ইতিবাচক ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষাগত ফলাফল এবং সৃজনশীল চিন্তার সক্ষমতার সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক প্রদর্শন করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও একই ধরনের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। UNICEF-এর ২০২৫ সালের U-Report জরিপে প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রতি তিনজনের দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টকে তাদের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনলাইন হয়রানি এবং ক্ষতিকর কনটেন্টও তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান কোনো প্রজন্মকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়। বরং এগুলো আমাদের সময়ের বাস্তবতা বোঝার একটি আয়না। প্রতিটি প্রজন্মই তার সময়ের প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে। তাই Gen Z-কে শুধুমাত্র সমালোচনা না করে তাদের শক্তিকে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও মানবিকতার সঙ্গে সংযুক্ত করাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এই দায়িত্ব কেবল পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়: রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজেরও। কারণ একটি প্রজন্ম কখনো শূন্য থেকে তৈরি হয় না। তাদের চিন্তা, রুচি, ভাষা, আচরণ এবং মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সমাজের সম্মিলিত প্রভাবের মধ্য দিয়ে।

আজ যখন কোনো প্রবীণ শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত রুচির নয় এটি আমাদের সামষ্টিক সাংস্কৃতিক পরিপক্কতারও প্রশ্ন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে শালীনতা, দায়িত্ববোধ এবং শ্রদ্ধাবোধের সমন্বয় না ঘটলে স্বাধীনতা কখনোই সভ্যতার পরিচয় বহন করতে পারে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন সাংস্কৃতিক সমন্বয়, যাতে পরিবর্তনের মধ্যেও আমরা আমাদের প্রত্যাশাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। কারণ একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তি শুধু তার শিল্পী, সাহিত্য বা ইতিহাসে নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্ম সেই উত্তরাধিকারকে কতটা সম্মান ও ধারণ করতে শিখছে তার ওপরও নির্ভর করে।
প্রজন্মের পরিবর্তন অনিবার্য। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাও থেমে থাকবে না। কিন্তু পরিবর্তনের এই স্রোতে যদি আমরা আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে হারিয়ে ফেলি, তাহলে উন্নয়নের অনেক সূচক অর্জিত হলেও সমাজ হিসেবে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়ব। তাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয় বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের মধ্যেও মানুষ হয়ে থাকার শিক্ষা নিশ্চিত করা। কারণ মানুষকে জানার আগে বিচার নয়, বুঝতে শেখাই সভ্যতার প্রথম শর্ত।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ডিজিটাল প্রজন্মের সামনে মূল্যবোধের নতুন পরীক্ষা

Update Time : 11:02:25 am, Thursday, 6 August 2026

ড. রাহাত সিকদার
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

আজকের Gen Z-এর একটি অংশের মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ এবং সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা আগের প্রজন্মের তুলনায় দৃশ্যত কমে যাচ্ছে বলে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে। দ্রুত মতামত দেওয়া, সমালোচনায় আগ্রহী হওয়া, কিন্তু অবদান ও অর্জনের গভীরতা অনুধাবন না করার প্রবণতাও ক্রমেই দৃশ্যমান। অথচ অন্যকে সম্মান করতে হলে আগে নিজেকে জানা, নিজেকে ভালোবাসা এবং নিজের মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি। যে নিজের পরিচয় ও শিকড়কে ধারণ করতে পারে, সে-ই অন্যের অবদানকে যথাযথভাবে সম্মান করতে শেখে।

একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নয়, বরং তার মানুষ কতটা বিনয়ী, সহনশীল এবং পূর্বসূরিদের অবদানকে সম্মান করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। কারণ সভ্যতার অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা এবং জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটে। এই আত্ম-উপলব্ধির ভিত্তিতেই আমরা বর্তমান বাস্তবতাকে বুঝতে পারি। আজ আমরা একটি স্পষ্ট সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমগুলো মানুষের আচরণ, মনোযোগ ও মূল্যবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল সভ্যতা ও সমসাময়িক সামাজিক ধারার কারণে তৈরি হওয়া বিস্তর জেনারেশন গ্যাপ এই প্রজন্মকে দৃশ্যত আত্মপরিচয়ের সংকট ও বিভ্রান্তির জালে আটকে দিয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

আজকের Gen Z, যাদের অনেকেই Google Generation নামেও পরিচিত, তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা সব সময় প্রজ্ঞার সমার্থক নয়। দ্রুত মতামত দেওয়া, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই বাস্তবতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে দেখা যায়। ফলে মানুষকে জানার আগে বিচার করা, শিল্পকে উপলব্ধি করার আগে সমালোচনা করা এবং অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের আগে মন্তব্য করে বসা যেন একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।

অবশ্য এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। এই প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রযুক্তিতে দক্ষ, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্মুক্ত এবং নতুন ধারণা গ্রহণে অনেক বেশি সাহসী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তন সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোতে তাদের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা প্রশংসনীয়। ফলে সমস্যার উৎস প্রযুক্তি নয়; বরং প্রযুক্তির ব্যবহারের ধরন এবং সেই ব্যবহারের সঙ্গে মূল্যবোধের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারাই মূল চ্যালেঞ্জ।

এখানেই আগের প্রজন্মের সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। পূর্ববর্তী প্রজন্মের সামাজিকীকরণ হতো পরিবার, বিদ্যালয়, প্রতিবেশ, খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশের সামাজিকীকরণ হচ্ছে অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট, শর্ট ভিডিও, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ফলে মনোযোগের স্থায়িত্ব, ধৈর্য, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং গভীরভাবে কোনো বিষয় উপলব্ধি করার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই পরিবর্তনের কিছু দিক নির্দেশ করে। OECD-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদস্য দেশগুলোর ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা গড়ে সপ্তাহে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করে। গবেষণাটি আরও ইঙ্গিত করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যপন্থী ব্যবহার কিছু ইতিবাচক ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষাগত ফলাফল এবং সৃজনশীল চিন্তার সক্ষমতার সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক প্রদর্শন করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও একই ধরনের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। UNICEF-এর ২০২৫ সালের U-Report জরিপে প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রতি তিনজনের দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টকে তাদের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনলাইন হয়রানি এবং ক্ষতিকর কনটেন্টও তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান কোনো প্রজন্মকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়। বরং এগুলো আমাদের সময়ের বাস্তবতা বোঝার একটি আয়না। প্রতিটি প্রজন্মই তার সময়ের প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে। তাই Gen Z-কে শুধুমাত্র সমালোচনা না করে তাদের শক্তিকে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও মানবিকতার সঙ্গে সংযুক্ত করাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এই দায়িত্ব কেবল পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়: রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজেরও। কারণ একটি প্রজন্ম কখনো শূন্য থেকে তৈরি হয় না। তাদের চিন্তা, রুচি, ভাষা, আচরণ এবং মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সমাজের সম্মিলিত প্রভাবের মধ্য দিয়ে।

আজ যখন কোনো প্রবীণ শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত রুচির নয় এটি আমাদের সামষ্টিক সাংস্কৃতিক পরিপক্কতারও প্রশ্ন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে শালীনতা, দায়িত্ববোধ এবং শ্রদ্ধাবোধের সমন্বয় না ঘটলে স্বাধীনতা কখনোই সভ্যতার পরিচয় বহন করতে পারে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন সাংস্কৃতিক সমন্বয়, যাতে পরিবর্তনের মধ্যেও আমরা আমাদের প্রত্যাশাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। কারণ একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তি শুধু তার শিল্পী, সাহিত্য বা ইতিহাসে নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্ম সেই উত্তরাধিকারকে কতটা সম্মান ও ধারণ করতে শিখছে তার ওপরও নির্ভর করে।
প্রজন্মের পরিবর্তন অনিবার্য। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাও থেমে থাকবে না। কিন্তু পরিবর্তনের এই স্রোতে যদি আমরা আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে হারিয়ে ফেলি, তাহলে উন্নয়নের অনেক সূচক অর্জিত হলেও সমাজ হিসেবে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়ব। তাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয় বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের মধ্যেও মানুষ হয়ে থাকার শিক্ষা নিশ্চিত করা। কারণ মানুষকে জানার আগে বিচার নয়, বুঝতে শেখাই সভ্যতার প্রথম শর্ত।