অচেনা নোবিপ্রবি এবং আমাদের প্রথম বন্ধু দিবস
- Update Time : 01:57:48 pm, Monday, 3 August 2026
- / 41 Time View
সুমাইয়া আক্তার, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি :
মাত্র সপ্তাহ দুয়েকের আগের কথা। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সবুজ সরণি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি কিংবা শান্ত ক্যাম্পাস তখনো পুরোপুরি চেনা হয়ে ওঠেনি। অর্থনীতি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের (বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের মনে তখন একদিকে নতুন ক্যাম্পাসের রঙিন ক্যানভাসের রোমাঞ্চ, অন্যদিকে চেনা পরিবেশ ছেড়ে আসার এক চাপা একাকীত্ব। “তোমার বাড়ি কোথায়?”, “কোন কলেজ থেকে এসেছ?”-এই চেনা ফরমাল আলাপের বাইরে গভীর কোনো কথা তখনো জমেনি। ঠিক এমন এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই ক্যালেন্ডারের পাতায় হাজির হলো ২ আগস্ট ‘বন্ধু দিবস’। মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় আসা এই দিনটিই কল্পিতা, কাউসার, রিচি, নাফিস, ইমরুল, নিলয়দের জীবনকে এক ফ্রেমে বেঁধে ফেলল।
ক্যাম্পাসের ক্লাস শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই সপ্তাহ সাধারণত কাটে এক ধরনের আড়ষ্টতায়। কিন্তু বন্ধু দিবসের সকালটা নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে নিয়ে এলো অন্যরকম এক হাওয়া। সেদিন আর ক্লাসের পর সোজা হলে বা বাসায় ফেরা নয়, বন্ধুদের সিদ্ধান্ত ছিল-আজ আড্ডা হবে। ক্যাম্পাসের শান্তিময় গাছতলায় কিংবা নীলদিঘির পাড়ে যখন কল্পিতা, কাউসার, রিচি, নাফিস, আলভী, ইমরুলসহ কয়েকজন গোল হয়ে বসল, তখনো বাতাসে কিছুটা জড়তা ছিল। কিন্তু আড্ডা শুরু হতেই সেই দুই সপ্তাহের জড়তা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। একে অপরের অদ্ভুত সব ডাকনাম, প্রথম দিনের ক্লাসের অভিজ্ঞতা আর পরিচয় পর্ব নিয়ে ফিসফিসানি—সবকিছু মিলে আড্ডা জমতে সময় লাগেনি। রিচির কথায় কাউসারের সায় দেওয়া, কিংবা তিথির কোনো চুটকিতে আলভীর খিলখিল হাসি প্রমাণ করে দিল, মনের মিল হতে বছরের পর বছর লাগে না, একটা সুন্দর মুহূর্তই যথেষ্ট। আবেদ যখন সবার হাতে একটা করে বুনো ফুল এনে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল, তখন আর মনে হচ্ছিল না এই পরিচয়ের বয়স মাত্র দুই সপ্তাহ!
এই জাদুকরী দিনটি নিয়ে বন্ধুদের স্মৃতিচারণও বেশ চমৎকার। সেজান জানান, “ক্যাম্পাসে আসার পর প্রথম কয়েকদিন বেশ একা লাগছিল। কাউকে ভালো করে চিনিই না, ভাবছিলাম বন্ধু দিবসে কী আর করব! কিন্তু বিথি, কল্পিতা, প্রমি, নাফিসদের সাথে যখন সেদিন আড্ডায় বসলাম, মনে হলো আমরা যেন যুগ যুগ ধরে বন্ধু। ওই একটা দিন আমাদের ব্যাচের সবাইকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।”
ইমরুলের স্মৃতিতেও দিনটি উজ্জ্বল। তিনি বলেন, “ক্যাম্পাসে আসার পর প্রথম দুই সপ্তাহ বেশ একাকীত্বে ভুগছিলাম। কিন্তু বন্ধু দিবসের দিন যখন কল্পিতা আর পিতুর সাথে মন খুলে হাসলাম, মনে হলো যাক—ক্যাম্পাসে আমার আপন মানুষ পাওয়া গেছে। নোবিপ্রবি আমাদের এই উপহারটা খুব দ্রুতই দিয়ে দিয়েছে।”
কল্পিতা আবার হাসতে হাসতে যোগ করলেন ইমরুলের ট্রিটের কথা। তিনি বলেন, “মাত্র ১৪ দিনের পরিচয়ে কেউ বন্ধু দিবসের ট্রিট দেয়-তা ইমরুলের সাথে পরিচয় না হলে জানতাম না! রিচি আর আমি সেদিন হেসেই খুন হচ্ছিলাম। দুই সপ্তাহের মাথায় যে এমন একটা আড্ডা জমবে, তা ভাবতেই পারিনি।”
আর মবিন রসিকতা করে বলেন, “আরে ভাই, মাত্র দুই সপ্তাহ ধরে চিনি, এর মধ্যেই লেগ-পুলিং শুরু হয়ে গেছে! আবেদকে সেদিন আমরা যেভাবে ক্ষ্যাপাচ্ছিলাম, মনেই হচ্ছিল না আমাদের পরিচয় মাত্র কয়দিনের। এই দুই সপ্তাহের মাথাতেই আমরা একে অপরের নাড়িনক্ষত্র জেনে গিয়েছিলাম।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকেই প্রথম প্রথম একাকীত্বে ভোগে। কিন্তু এই অসময়ের বন্ধু দিবসটি অর্থনীতি বিভাগের এই দলটির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। সেদিনই প্রথম তারা একে অপরকে ‘সহপাঠী’র গণ্ডি থেকে বের করে ‘বন্ধু’র আসনে বসিয়েছিল। মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় নোবিপ্রবির বুকে জন্ম নিল এক নতুন পরিবার। নোবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের এই বন্ধুদের গল্পটি মনে করিয়ে দেয় যে, বন্ধুত্বের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না। সময়ের সাথে সাথে এই বন্ধন আরও দৃঢ় হবে, কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহের পরিচয়ে কাটানো সেই প্রথম বন্ধু দিবসের স্মৃতি নোবিপ্রবির বাতাসে চিরকাল অম্লান থাকবে।












