ক্রীড়াঙ্গনের সোনালি দিনের শেষ সারির এক প্রহরী আবদুস সাদেক
- Update Time : 10:02:05 am, Sunday, 21 June 2026
- / 8 Time View
দেশ যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মগ্ন, ঠিক সেই সময়ই জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সংগঠক, সাবেক খেলোয়াড়, কোচ ও ক্রীড়া প্রশাসক আবদুস সাদেক আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে দেশের ফুটবল ও হকি অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
ফুটবল ও হকি—দুই খেলাতেই সমান দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে আবদুস সাদেক নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ক্রীড়াচক্রের যাত্রার শুরুতে তিনি ছিলেন ক্লাবটির ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক। শুধু তাই নয়, আবাহনীর হকি দলেরও প্রথম অধিনায়ক হওয়ার বিরল কৃতিত্ব তাঁর ঝুলিতেই রয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন সফলতার সঙ্গে।
১৯৭৭ সালে আবাহনী প্রথমবারের মতো ঘরোয়া ফুটবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। সে সময় তিনি ছিলেন কোচ-কাম-খেলোয়াড়। তাঁর নেতৃত্বেই আবাহনী ফুটবল ও হকি—উভয় লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল সাফল্য অর্জন করে।
ষাটের দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান জাতীয় দলে বাঙালি খেলোয়াড়দের উপেক্ষার প্রবণতার মধ্যেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন আবদুস সাদেক। পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে ইউরোপ সফরে অংশ নিয়ে ২০ ম্যাচের মধ্যে ৮টিতে রাইট-হাফ হিসেবে মাঠে নামেন।
মাঠের বাইরে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবাহনী ক্লাব যখন কঠিন সংকটের মুখে পড়ে, তখন অনেকেই সরে গেলেও আবদুস সাদেক সাহসিকতার সঙ্গে ক্লাবের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাহনীর অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁর সেই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের হকিও একাধিকবার তাঁর নেতৃত্বে সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পেয়েছে। প্রায় এক দশক আগে হকি লিগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়লে ক্লাবগুলোকে একত্রিত করে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেন। তাঁর আহ্বানেই আবার মাঠে ফিরে আসে দেশের হকি।
বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনবার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। ১৯৮৫ সালে এশিয়ান হকি ফেডারেশনের সভায় ঢাকাকে এশিয়া কাপ হকির আয়োজক হিসেবে প্রস্তাব করেন তিনি। তাঁর দৃঢ় অবস্থান ও সাংগঠনিক দক্ষতায় সেই টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই আসর এখনও এশিয়া কাপ হকির অন্যতম সফল আয়োজন হিসেবে বিবেচিত।
আবদুস সাদেকের অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি আন্দ্রে নেগ্রে ঢাকায় এসে তাঁর প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের হকিকে এগিয়ে নিতে সাদেকের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন।
একটি ক্রীড়াপ্রাণ পরিবারে জন্ম নেওয়া আবদুস সাদেকের বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের খ্যাতিমান সাঁতারু। তাঁর ছোট ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানও ছিলেন একজন প্রতিভাবান হকি খেলোয়াড় এবং পূর্ব পাকিস্তান যুব দলের অধিনায়ক।
ক্রীড়াঙ্গনের এই কিংবদন্তিকে নিয়ে সম্প্রতি দেশের সোনালি প্রজন্মের পাঁচ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে এক ফ্রেমে আনার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই আয়োজনে অংশ নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন আবদুস সাদেক। তবে অসুস্থতার কারণে সময় চেয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে প্রয়াত হন জাকারিয়া পিন্টু, আর এবার চলে গেলেন আবদুস সাদেকও। ফলে সেই ঐতিহাসিক আয়োজন আর বাস্তবায়নের সুযোগ রইল না।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখা এই কিংবদন্তির বিদায়ে শোক প্রকাশ করেছেন তাঁর সতীর্থ, সহকর্মী ও ক্রীড়া সংগঠকেরা। তাঁদের মতে, আবদুস সাদেক ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সংকটের সময় সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে জানতেন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একজন ক্রীড়া সংগঠক নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরই সমাপ্তি ঘটল।
এটি সংবাদপত্রে প্রকাশযোগ্য নিউজ-ফিচার আঙ্গিকে লেখা হয়েছে, যেখানে আবেগের মাত্রা কিছুটা সংযত রেখে তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

















